তানভীর আহমেদ
১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিনগুলোর একটি। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এবং ঘনিষ্ঠজনদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। ২০২৪ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই দিবসের মর্যাদা ও ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রাষ্ট্র চাইলে কোনো দিবসকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডার থেকে একটি দিন বাদ দেওয়া আর মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, শোক ও শ্রদ্ধাকে নিষিদ্ধ করা এক কথা নয়।
আজকের প্রশ্নটি তাই শুধু আওয়ামী লীগকে নিয়ে নয়; প্রশ্নটি একজন সাধারণ নাগরিককে নিয়ে। এমন একজন মানুষ, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন, শেখ হাসিনার রাজনীতির সমর্থক নন, আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচকও হতে পারেন—কিন্তু ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডকে একটি জাতীয় ট্র্যাজেডি মনে করেন। তিনি যদি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ফুল দিতে চান, টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে চান, নীরবে দাঁড়িয়ে শোক পালন করতে চান, তাহলে সেটি কীভাবে অপরাধ হয়ে যায়?
একজন নাগরিকের শোকের ধরন রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিতে পারে না। তিনি কাঁদবেন, ফুল দেবেন, প্রার্থনা করবেন, নীরব থাকবেন, আলোচনা করবেন—এসব তাঁর ব্যক্তিগত বিবেক, বিশ্বাস ও মতপ্রকাশের পরিসরের বিষয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে ১৫ আগস্ট পালন করা হবে না—এটি একটি সরকারি সিদ্ধান্ত। কিন্তু একজন নাগরিক ব্যক্তিগতভাবে দিনটিকে স্মরণ করবেন কি না, সেটি অন্য প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভাষায় বিষয়টি আরও পরিষ্কার। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক মানুষের মতামত ধারণ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি ১২ সেপ্টেম্বর ২০১১ তারিখের সাধারণ মন্তব্য নম্বর ৩৪-এ বলেছে, রাজনৈতিক বক্তব্য, ঐতিহাসিক আলোচনা এবং জনস্বার্থের বিষয়ে মতপ্রকাশ বিশেষ সুরক্ষার দাবি রাখে। এমনকি কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন মত পোষণ করাও নিজে অপরাধ হয়ে যায় না।
একইভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ২১ অনুচ্ছেদ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি ২০২০ সালের সাধারণ মন্তব্য নম্বর ৩৭-এ শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অন্যতম মৌলিক মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। ফলে কেউ যদি অস্ত্র নিয়ে আসে, হামলা করে, অগ্নিসংযোগ করে বা অন্য কোনো অপরাধ করে, রাষ্ট্র অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু কেউ যদি শান্তিপূর্ণভাবে ফুল নিয়ে কোনো ঐতিহাসিক স্থানে যায়, শোক প্রকাশ করে কিংবা বক্তব্য দেয়, তাকে গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে একটি নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি এবং তার ব্যক্তিগত অপরাধ দেখাতে হবে।
এই কারণেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্যেকটি রাজনৈতিক চিন্তা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিষিদ্ধ করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আইন করে সীমিত বা নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু দলের একজন নেতা অপরাধ করেছেন বলে দলের প্রত্যেক সমর্থক অপরাধী হয়ে যান না। একজন ব্যক্তি হত্যা করলে তার বিচার হবে; নির্যাতনে যুক্ত থাকলে তার বিচার হবে; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তার বিচার হবে। কিন্তু অপরাধের দায় ব্যক্তির পরিবর্তে একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২৩ মে ২০২৫-এর এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলে। সংস্থাটি বলেছিল, নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিতের মতো কঠোর ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের কঠোর প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচও ২১ মে ২০২৫ বলেছিল, শেখ হাসিনা সরকারের সময় আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিরোধীদের দমন করা হয়ে থাকলে, একই ধরনের পদ্ধতি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করাও একই মৌলিক স্বাধীনতাগুলোকে লঙ্ঘন করতে পারে। তারা বিশেষভাবে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় সভা, প্রকাশনা এবং অনলাইন বক্তব্যের বিষয়টি উল্লেখ করেছিল।
এখানে জুলাই–আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। জুলাই আন্দোলনে সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন—তাঁদের প্রত্যেক হত্যার বিচার অবশ্যই হতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধানে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত ও নির্বিচার বলপ্রয়োগ এবং ব্যাপক প্রাণহানির গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্য, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট বলে বিবেচিত মানুষের ওপরও হত্যাসহ প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্র যদি এক পক্ষের হত্যাকে “বিচারযোগ্য হত্যাকাণ্ড” হিসেবে দেখে আর অন্য পক্ষের হত্যাকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্বাভাবিক ফল হিসেবে এড়িয়ে যায়, তাহলে ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষতা কোথায় থাকে?
এই প্রশ্ন আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন দায়মুক্তির ব্যবস্থা সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ “জুলাই অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ” জারি করে, যা জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য আইনগত সুরক্ষা দেয় এবং ১ জুলাই ২০২৪ থেকে পশ্চাৎপ্রযোজ্য করা হয়। অধ্যাদেশে হত্যার অভিযোগের জন্য একটি বিশেষ তদন্তের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল; অর্থাৎ প্রতিটি হত্যাকাণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্তির আওতায় পড়ে না।
কিন্তু ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি এখানেই—কোনো আন্দোলনের রাজনৈতিক লক্ষ্য যতই জনপ্রিয় হোক, সেই আন্দোলনের নামে সংঘটিত ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। নিহত ব্যক্তি পুলিশ সদস্য ছিলেন, আওয়ামী লীগ কর্মী ছিলেন, ছাত্র ছিলেন, সাধারণ নাগরিক ছিলেন—তার ভিত্তিতে হত্যার বিচার আলাদা হতে পারে না। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক ৩০ অক্টোবর ২০২৪ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ৫ আগস্টের আগে ও পরে সংঘটিত সব মানবাধিকার লঙ্ঘন ও হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রয়োজন এবং জনতার বিচার বা বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য দায়মুক্তি জাতিসংঘ সমর্থন করে না।
অতএব, রাষ্ট্র যদি জুলাই আন্দোলনে নিহত সাধারণ নাগরিকদের জন্য ন্যায়বিচার দাবি করে, সেটি অবশ্যই ন্যায়সঙ্গত দাবি। কিন্তু একই রাষ্ট্র যদি পুলিশ হত্যাকাণ্ড কিংবা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের হত্যার অভিযোগকে প্রমাণ ও তদন্তের বাইরে রাখে, অথবা কোনো রাজনৈতিক দায়মুক্তির কাঠামোর মাধ্যমে তা কার্যত অগ্রাহ্য করে, তাহলে রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। ন্যায়বিচারের কোনো দলীয় রং নেই। হত্যার শিকার মানুষের পরিচয় দেখে হত্যার গুরুত্ব নির্ধারণ করা যায় না।
একইভাবে অপরাধের বিচার আর রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার এক জিনিস নয়। যে ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডে জড়িত, তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করেননি, তাকে শুধু আওয়ামী লীগের সমর্থক, কর্মী কিংবা মতাদর্শের অনুসারী হওয়ার কারণে অপরাধী বানানো যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ সালেও নির্বিচার আটক, ব্যাপক মামলা এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত আইনি ব্যবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
রাজনৈতিক দলের বর্তমান নেতৃত্বের ভুল, অপরাধ কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতা সেই দলের প্রতিষ্ঠালগ্নের সমস্ত রাজনৈতিক ইতিহাসকে এক কলমে বাতিল করে দিতে পারে না। আওয়ামী লীগের ইতিহাস নিয়ে তীব্র সমালোচনা হতে পারে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর শাসন নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, শেখ হাসিনা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা করাটাই যদি অপরাধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা অপরাধের বিচার করছি না; আমরা ইতিহাসের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করছি।
পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভূমিকা মুছে দিতে পারেনি। বরং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই বাঙালির স্বাধীনতার রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যায়। ইতিহাসের এই শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ—একটি সময়ের রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় নয়। আজকের শাসক যে মূল্যায়ন করছেন, আগামী প্রজন্মের ইতিহাসবিদ একই মূল্যায়ন করবেন—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সক্রেটিসের ঘটনাটিই তার একটি চমৎকার উদাহরণ। এথেন্সের তৎকালীন আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের সেই রায় সক্রেটিসকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পারেনি। বরং সময় তাঁকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দার্শনিকের মর্যাদা দিয়েছে। ইতিহাসের আদালত অনেক সময় সমসাময়িক রাষ্ট্রের আদালতের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী।
তাই একজন ঐতিহাসিক নেতাকে নিয়ে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা ও সমালোচনা থাকার সুযোগই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক অর্জন নিয়ে আলোচনা হবে, তাঁর ভুল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা হবে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে কেউ সমর্থন করবেন, কেউ বিরোধিতা করবেন। কিন্তু “মুজিববাদের কবর রচনা” করা কিংবা “মুজিববাদ” নিয়ে কথা বললেই কাউকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে কারাগারে পাঠানো—এটি কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির লক্ষণ হতে পারে না। একটি মতাদর্শকে পরাজিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো যুক্তি দিয়ে তাকে পরাজিত করা, কারাগার দিয়ে নয়।
১৫ আগস্টের প্রসঙ্গে আরেকটি মানবিক বিষয় প্রায়ই রাজনৈতিক বিদ্রূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিদ্রূপ করে বলেন—“শেখ হাসিনা তাঁর বাবার জন্য কাঁদছেন।” এই কথার মধ্যে যেন তাঁর অশ্রুকেও রাজনৈতিক অপরাধের প্রমাণ বানানোর চেষ্টা থাকে। কিন্তু এখানে রাজনীতির আগে মানুষটিকে দেখতে হবে। শেখ হাসিনা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাও। ১৫ আগস্ট তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাকে হারাননি—তিনি তাঁর বাবা, মা, ভাই, আত্মীয়স্বজনসহ নিজের পরিবারের সদস্যদের একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে হারিয়েছেন।
একজন কন্যা তাঁর বাবার জন্য কতদিন কাঁদবেন, কীভাবে কাঁদবেন, কোন দিনে তাঁকে স্মরণ করবেন—এটি রাষ্ট্রের নির্ধারণ করার বিষয় নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রোলেরও বিষয় নয়। শোকের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। কান্নার কোনো সাংবিধানিক সময়সীমা নেই। একজন মানুষ তাঁর পিতার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন—সেটিকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠিতে বিচার করার আগে মনে রাখতে হবে, তিনি একই সঙ্গে একজন কন্যা।
আর হত্যাকাণ্ডটি যদি হয় এমন নৃশংস যে একটি পরিবারের শিশু পর্যন্ত রক্ষা পায়নি, তাহলে সেই হত্যার স্মৃতি একজন সন্তানের কাছে সারাজীবন বহন করা অস্বাভাবিক নয়। শেখ হাসিনা আমৃত্যু তাঁর পিতার জন্য কাঁদলেও সেটিকে প্রথমে একজন কন্যার অশ্রু হিসেবেই দেখতে হবে। সেই কান্নাকে কেউ রাজনৈতিকভাবে পছন্দ নাও করতে পারেন, তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করতেই পারেন; কিন্তু একজন কন্যার পিতার জন্য কান্নাকে অপরাধের মাপকাঠিতে মাপার কোনো মানবিক বা নাগরিক মানদণ্ড নেই।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকেও তাই শুধু “শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি” হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিশাল একটি অধ্যায়কে ছোট করে দেখা হয়। এই বাড়ি বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক সংগ্রামের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী। ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের প্রস্তুতির সঙ্গে এই স্থানটি সরাসরি যুক্ত ছিল। বাংলাদেশ সরকারের পর্যটনবিষয়ক তথ্যেও বাড়িটিকে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
সেই অর্থে ধানমন্ডি ৩২কে বলা যায় বাঙালির স্বাধীনতার রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি আতুরঘর। এটি কোনো দলের বর্তমান রাজনৈতিক কার্যালয় নয়; এটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডও এই স্থানের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দল পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্বও পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে না।
রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ করা মানে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা নয়। একটি জাদুঘর কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক প্রচারণার জায়গা হতে হবে না; বরং সেখানে তাঁর অর্জন, ব্যর্থতা, বিতর্ক, বিরোধিতা, সমালোচনা এবং ইতিহাস—সবকিছুই রাখা যেতে পারে। বরং একটি পরিণত রাষ্ট্রের উচিত বিতর্কিত ইতিহাসকে ধ্বংস না করে আরও বেশি সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসকে একপক্ষীয় রাজনৈতিক বয়ানের মাধ্যমে নয়, প্রমাণ ও দলিলের মাধ্যমে বিচার করতে পারে।
লেনিন, স্ট্যালিন, মুসোলিনি কিংবা বিশ্বের বিতর্কিত শাসকদের স্মৃতিস্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়েও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একই ধরনের বিতর্ক রয়েছে। কোনো নেতার স্মৃতিসৌধ বা সমাধি সংরক্ষণ করা তাঁর অপরাধকে অনুমোদন করা নয়। ইতিহাস সংরক্ষণ এবং রাজনৈতিক মহিমান্বিতকরণ এক জিনিস নয়। একইভাবে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণ করাও তাঁর সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অনুমোদন নয়।
বরং ৩২ নম্বরকে আরও বড় অর্থে একটি জাতীয় ঐতিহাসিক ও গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠন করা যায়। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে তাঁর সমালোচনাও। থাকবে ১৯৭১, থাকবে স্বাধীনতার সংগ্রাম, থাকবে ১৯৭২–৭৫-এর রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাস, থাকবে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, থাকবে পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস। ইতিহাসকে লুকিয়ে নয়, সম্পূর্ণভাবে দেখিয়েই একটি জাতি পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের প্রশ্নটি আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতির প্রশ্নে আটকে রাখা উচিত নয়। একজন নাগরিক ১৫ আগস্টকে শোকের দিন মনে করবেন কি না, শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা করবেন কি না, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কোনো অংশে বিশ্বাস করবেন কি না—এসব তাঁর বিবেক ও মতপ্রকাশের বিষয়। তিনি অপরাধ করলে বিচার হবে; অপরাধ না করলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে অপরাধী বানানো যাবে না।
রাষ্ট্র চাইলে ১৫ আগস্টকে আর জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করবে না। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্যালেন্ডার বদলালেই মানুষের স্মৃতি বদলায় না। সরকার কোনো দিবস বাতিল করতে পারে; কিন্তু একজন মানুষের ব্যক্তিগত শোক বাতিল করার ক্ষমতা কোনো সরকারের থাকা উচিত নয়।
“জয় বাংলা” বললেই গ্রেপ্তার কিংবা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শান্তিপূর্ণভাবে ফুল দিতে গেলেই গ্রেপ্তার—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি গভীরভাবে উদ্বেগজনক। “জয় বাংলা” শুধু কোনো দলের স্লোগান নয়; এটি বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক শক্তি জুগিয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই এই স্লোগান উচ্চারণ বা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা জানানোকে নিজেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ২১ অনুচ্ছেদ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করেছে; জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির সাধারণ মন্তব্য ৩৪ (২০১১) ও ৩৭ (২০২০) যথাক্রমে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধকে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার কঠোর পরীক্ষার অধীন করেছে।
অতএব, কোনো ব্যক্তি সহিংসতা বা নির্দিষ্ট অপরাধে যুক্ত না থাকলে শুধু “জয় বাংলা” বলার, ফুল দেওয়ার বা ঐতিহাসিক স্মৃতি ধারণের কারণে তাকে তালিকাভুক্ত বা গ্রেপ্তার করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে গুরুতরভাবে সাংঘর্ষিক হতে পারে। অপরাধের বিচার হোক ব্যক্তির কাজের ভিত্তিতে, তার কণ্ঠে উচ্চারিত একটি ঐতিহাসিক স্লোগানের ভিত্তিতে নয়।
জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা যদি হয় ক্ষমতার জবাবদিহি, তাহলে সেই জবাবদিহি সবার জন্য হতে হবে। শেখ হাসিনা সরকারের সময় সংঘটিত হত্যার বিচার হবে। নিরাপত্তা বাহিনীর বেআইনি বলপ্রয়োগের বিচার হবে। আন্দোলনকারীদের হত্যার বিচার হবে। পুলিশ হত্যার বিচারও হবে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী বা সাধারণ সমর্থকদের হত্যার বিচারও হবে। কারণ ন্যায়বিচার তখনই ন্যায়বিচার, যখন রাষ্ট্র নিহত মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় দেখে তার হত্যার মূল্য নির্ধারণ করে না।
অপরাধীর বিচার হোক। রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচার হোক। কিন্তু নাগরিকের রাজনৈতিক বিশ্বাস, ব্যক্তিগত শোক, ঐতিহাসিক স্মৃতি কিংবা বিবেককে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নয়। একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা থেকে সরানো যায়, একটি সরকারকে পতন ঘটানো যায়, একটি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা যায়—আইনের সীমার মধ্যে এসবের বিচার হতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, ব্যক্তিগত শোক এবং রাজনৈতিক চিন্তাকে জেলখানায় বন্দি করা যায় না।
১৫ আগস্টে একজন মানুষের হাতে যদি অস্ত্র না থেকে এক মুঠো ফুল থাকে, রাষ্ট্রের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—সে কী অপরাধ করেছে? তার রাজনৈতিক পরিচয় কী, সেটি নয়। আমরা কি এমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই, যেখানে সরকার বদলালে ইতিহাস বদলাবে; নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে সরকার বদলাবে, কিন্তু নাগরিকের অধিকার বদলাবে না?
লেখক: প্রধান সম্পাদক, পলিটিকা নিউজ
১৪ আগস্ট ২০২৬, লন্ডন।
