ইউনূস আমলের কথিত ট্রাইব্যুনালের রায় মাথায় নিয়ে ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন ঝুঁকির বিষয়টি জেনেও তিনি দেশে ফিরতে বদ্ধপরিকর।
জাপানের বার্তা সংস্থা কিয়োডো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, “আমি বাংলাদেশে ফিরব, আদালতেরও মুখোমুখি হবো।”
এর আগে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা জানিয়ে দিয়েছিলেন, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করেছেন। তবে শুধু তিনি একা নন, জীবনের নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতারাও তাঁর সঙ্গে দেশে ফিরে আদালত-মামলার মুখোমুখি হবেন।
এবার জাপানের কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা বলেন, “তারা আমাকে কারাগারে পাঠাতে পারে। এমনকি আমাকে ফাঁসিতেও ঝোলানোর চেষ্টা করতে পারে। আমি সেই ঝুঁকির কথা জানি।”
সরকারবিরোধী হামলা-সংঘাতের মুখে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট দেশত্যাগের পর গত প্রায় দুই বছর ধরে ভারতেই রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিচালিত ফরমায়েশি বিচারে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনালে দাঙ্গা দমনে কঠোরতার নির্দেশ দানের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন বরাবরই। রাষ্ট্রের সম্পদ এবং জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক নির্দেশনা পালন করেছে, উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনালের সকল অভিযোগের সুস্পষ্ট জবাব দিয়েছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে।
কিয়োডো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মৃত্যুদণ্ডের ওই রায়কে তিনি ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলেছেন।
এদিকে, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারত সরকারের কাছে কয়েকবার প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লি ঢাকার আবেদন পেয়েছে এবং আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আলোকে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তবে এও জানিয়েছে, শেখ হাসিনা দিল্লিতে বন্দি হিসেবে নন, বরং সম্মানিত অতিথি হিসেবে অবস্থান করছেন।
চলতি মাসের শুরুতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গে গত ১৪ই জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করবে।
২০২৪-এর জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে অগাস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কোটা আন্দোলনের নাম করে সরকারর পতনের উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যাপক সহিংসতা হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওই সময়ে ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, নিহতদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও সরকারি হিসেবে দাবি করা হয়েছে এই সংখ্যা ৮৪৩ জন।
আবার বিভিন্ন সময় নিহতদের অনেকের ফিরে আসারও খবর মিলেছে, হতাহতদের অনেকেই বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত-নিহত হয়েছে বলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা এসব হত্যার নির্দেশ দিয়েছে বলে দাবি করেছে ইউনূস সরকার ও বিএনপি সরকার। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শেখ হাসিনা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আন্দোলনটি ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রভাবিত’ ছিল; যা খোদ ড. ইউনূস নিজেই স্বীকার করেছেন তার বিভিন্ন বক্তব্যে।
কিয়োডো নিউজকে শেখ হাসিনা বলেন, “স্বাধীন বিদেশি ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা যদি প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ এবং কোন অস্ত্র বা গুলি থেকে তা হয়েছে, তা পরীক্ষা করেন, তাহলে এখনো সত্য উদঘাটন করা সম্ভব।”
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং জাপানের মত যেসব দেশ আমাদের উন্নয়নযাত্রায় আস্থা, সম্পদ ও বন্ধুত্বের বিনিয়োগ করেছে, তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “দেশের প্রয়োজন ক্ষত নিরাময়। তবে পুনর্মিলনের অর্থ কখনোই দায়মুক্তি হতে পারে না। অপরাধের জন্য দায়ীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।”
বাংলাদেশে এখন শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ, ফলে গত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি।
এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, “আগামী এক দশক পুনরুদ্ধার ও নবায়নের দশক হতে পারে, তবে তা তখনই সম্ভব, যখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হবে।”
