অনিন্দ্য জয়
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বড় একটা অংশ এখন সাংবাদিকতা করে না, তারা দেশের একশ্রেণীর নির্বোধ জনগোষ্ঠীর আবেগের ব্যবসা করে। তথ্য যাচাই করে সংবাদ পরিবেশনের বদলে তারা এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে, যা একশ্রেণীর নির্বোধ জনগোষ্ঠী দেখতে চায়। আর এই প্রবণতার সবচেয়ে হাস্যকর প্রকাশ দেখা যায় ভারতকে নিয়ে করা রাজনৈতিক সংবাদে।
ভারতের কোনো এক প্রান্তে আন্দোলন হলেই কিছু তথাকথিত সাংবাদিকের কল্পনায় বিপ্লব ঘটে যায়। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হয়েছে? ব্যস! এবার ভারতের পালা। ভারতে কোথাও কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছে? ব্যস! এবার নরেন্দ্র মোদি শেষ! বাংলাদেশের তথাকথিত সাংবাদিকরা তখন শিরোনাম দেয়– “মোদি সরকারের পতন আসন্ন”, “মোদি গদিচ্যুত”, “ভারতে বাংলাদেশ মডেল” ইত্যাদি। অর্থাৎ খবর নয়, ভিউ ব্যবসা করাটাই এদের মূল ধান্দা।
একশ্রেণীর নির্বোধ জনগোষ্ঠী এসব দেখে উল্লাসে লাফাতে থাকে। তারা ভাবে– বাংলাদেশে যেভাবে একটি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, ভারতে ঠিক একইভাবে নরেন্দ্র মোদি ও তার সরকারও কয়েকটি আন্দোলন, কয়েকটি স্লোগান এবং কয়েকটি ভাইরাল ভিডিওতে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এই ধারণা শুধু রাজনৈতিক অজ্ঞতার প্রমাণ নয়; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে ভয়াবহ অজ্ঞতারও প্রমাণ।
ভারত আর বাংলাদেশ এক নয়। ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক কাঠামো, দলীয় সংগঠন, নির্বাচনব্যবস্থা এবং বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক খুবই শক্তিশালী। ভারতের গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তনের প্রধান পথ হলো নির্বাচন। আন্দোলন সরকারকে চাপ দিতে পারে, নীতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে, মন্ত্রীর পদত্যাগ ঘটাতে পারে, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার বৈধ পরিবর্তন হয় সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায়। এখানেই বাংলাদেশের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য। বাংলাদেশে যা ঘটেছে, সেটাকে ভারতের ওপর কপি-পেস্ট করার চেষ্টা মূলত রাজনৈতিক অজ্ঞতার চূড়ান্ত নমুনা।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির বাইরে থাকা শক্তিগুলোও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে। কখনও সামরিক অভ্যুত্থান, কখনও সামরিক সমর্থিত সরকার, কখনও অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তর, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে সামরিক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ভূমিকার ইতিহাস বাংলাদেশে আছে। ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী সামগ্রিকভাবে বেসামরিক সরকারের অধীনে থেকেছে এবং সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক সরকার গঠনের পথে যায়নি। দক্ষিণ এশিয়ার একই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বহন করেও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের বিকাশ একরকম হয়নি, এটাই ভারতের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই পার্থক্যটা না বুঝে যারা ভারতকে বাংলাদেশের আয়নায় দেখে; তারা ভারতকে বোঝে না, বাংলাদেশকেও বোঝে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো ভারতের আকার ও বহুত্ব। ২৮টি রাজ্য, ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং প্রায় ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশকে একটি মাত্র আন্দোলন দিয়ে নাড়া দেওয়া যায়, কিন্তু সরকারের পতন ঘটানো যায় না। ভারতের রাজনীতি এককেন্দ্রিক নয়। দিল্লির রাজনীতি, উত্তর প্রদেশের রাজনীতি, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, তামিলনাড়ুর রাজনীতি, মহারাষ্ট্রের রাজনীতি প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব রাজনৈতিক সমাজ, দল, স্বার্থ ও সংগঠন আছে।
ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর সংগঠনও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল, আঞ্চলিক দল, রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি সব মিলিয়ে সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার বহু কেন্দ্র রয়েছে। ফলে রাজপথের আন্দোলনকে নির্বাচনী রাজনীতিতে রূপান্তর করতে হলে শুধু স্লোগান যথেষ্ট নয়; সংগঠন, ভোটব্যাংক, নেতৃত্ব, প্রার্থী, নির্বাচনী কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি জনসমর্থন প্রয়োজন।
বাংলাদেশের একশ্রেণীর নির্বোধ জনগোষ্ঠী এই পার্থক্যটি বুঝতে চায় না। এদের সমস্যা হলো এরা রাজনীতি বোঝে না, কিন্তু রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে ভালোবাসে। এরা রাষ্ট্রব্যবস্থা বোঝে না, কিন্তু রাষ্ট্রের পতন ঘোষণা করে। এরা ভারতের ইতিহাস জানে না, ভারতের সংবিধান জানে না, ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো জানে না, কিন্তু ভারতের সরকার কখন পতন ঘটবে, সেটা প্রতিদিন জানিয়ে দেয়। এটা একধরণের রাজনৈতিক ফ্যান্টাসি। আর এই ফ্যান্টাসিকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি জোগায় অপসাংবাদিকতা।
কিছু গণমাধ্যম জানে– একশ্রেণীর নির্বোধ জনগোষ্ঠী কোনো তথ্য চায় না, তারা নিজেদের বিশ্বাসের নিশ্চয়তা চায়। তাই এমন শিরোনাম তৈরি করে, যা বাস্তবতার চেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ। এই ধরনের প্রচারণা শুধু বাংলাদেশের মানুষকে ভুল বোঝায় না; আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন সংবাদ পরিবেশন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে হাস্যকর করে তুলছে।
