দেশজুড়ে গ্যাসের হাহাকার। রাজধানীর বাসিন্দা মাসুদ হাসান এক সপ্তাহ ধরে ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছেন। সিএনজি স্টেশনে চালকদের ঘাম গায়েই শুকিয়ে গেছে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে। সিরামিক, টেক্সটাইল, ইস্পাত কারখানার চাকা থেমে থেমে চলছে। অথচ এই বিএনপি-জামাত জোটই তো বলেছিল, তারা ক্ষমতায় এলেই নাকি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ম্যাজিকের মতো!
তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তার মুখেই শুনুন, একটা এলএনজি কার্গো দেরিতে আসায় প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়, এই একটা কার্গোর ওপর পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ কেন এমন স্পর্শকাতরভাবে ঝুলে থাকবে? ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা কি এক রাতের কার্গো বিলম্বে ধরা পড়ে?
মনে পড়ে যায় ২০০১-০৬ সালের সেই বিভীষিকাময় সময়ের কথা। তখনও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের লোডশেডিং, শিল্পে মন্দা আর দুর্নীতির মহোৎসব ছিল বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সিগনেচার। ইতিহাস কি আবারও নিজেকে রিপিট করছে?
সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠনের নেতা বলছেন, গ্যাসের প্রেশার এত কম যে গাড়িতে গ্যাস নিতেই ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। অথচ প্রতি ঘনমিটার বিক্রিতে মালিকের লাভ মাত্র আট টাকা, যার ছয় টাকাই যায় বিদ্যুৎ বিলে। তাহলে বাকি দুই টাকা দিয়ে কর্মচারীর বেতন দেবেন কী করে? এটা ব্যবসা না রীতিমতো আত্মহত্যার মিশন।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পরিষ্কার বলেছেন, যে কারখানাগুলো এখনও চালু আছে সেগুলোই যদি গ্যাস সংকটে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে বন্ধ কারখানা চালুর স্বপ্ন দেখা অর্থহীন।
সাভারের চিত্র আরও ভয়াবহ। দুই মাস ধরে বাসাবাড়িতে গ্যাস নেই। মানুষ লাকড়ির চুলা আর ইন্ডাকশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। নিয়মিত গ্যাস বিল দিয়েও সেবা পাচ্ছেন না তারা। ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিতাসের আঞ্চলিক অফিস ঘেরাও করতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ মানুষ।
সরকারের দায়িত্বশীলদের উদ্দেশে প্রশ্ন, ২০২৬ সালে এসে আবারও কেন ২০০১-এর সিনেমার রিপিট টেলিকাস্ট দেখতে হবে আমাদের? দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন সাড়ে ২৫০০ থেকে ১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে ছয় বছরে। এটা শুধুই প্রাকৃতিক কারণ নাকি চরম অদক্ষতা আর দূরদর্শিতার অভাব?
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি ঠিকই বলেছেন, এখন জরুরি হলো চলমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা, নতুন বিনিয়োগ নয়। কিন্তু এই কথা কি শোনার মতো কান আছে ক্ষমতার শীর্ষ মহলে?
জ্বালানি সংকটে যখন নাভিশ্বাস ওঠে সাধারণ মানুষের, তখন তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই একই দল তো বিশ বছর আগেও একই রকম পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। তারা কি আদৌ কিছু শিখেছে? নাকি ক্ষমতা তাদের কাছে শুধুই লুটপাটের হাতিয়ার?
বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী, সহনশীল। কিন্তু সেই সহ্যশক্তির একটা সীমা আছে। যখন ঘরে ঘরে চুলা জ্বলে না, রাস্তায় গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, কারখানার চাকা থেমে যায় – তখন জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে। জ্বালানি সংকট কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটা সুশাসনের অনুপস্থিতির সরাসরি প্রতিফলন।
