২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংস রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়ার পর আজ পূর্ণ দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকারকে অপসারণ করা হয়েছিল “গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন”, “প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন” এবং “অর্থনৈতিক মুক্তি”র প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু আজ সেই স্বঘোষিত আন্দোলনের তথাকথিত বিজয়ের প্রকৃত চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নগ্নভাবে দৃশ্যমান।
এটি কোনো গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ ছিল না; বরং এটি ছিলো জাতীয় বিশ্বাসভঙ্গের এক মর্মান্তিক অধ্যায়। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের একাংশের কাছে যাকে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণজাগরণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, বাস্তবে তা দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণহীন গণপিটুনি ও উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতার কাছে ছেড়ে দিয়েছে, এবং একটি সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রের মৌলিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিয়েছে।
একসময় যে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক বিস্ময়, শিল্পোন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং ধর্মনিরপেক্ষ স্থিতিশীলতার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা করা হতো, আজ সেই দেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। গত চব্বিশ মাসে একটি আধুনিক, সার্বভৌম রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় প্রতিটি মৌলিক ভিত্তিই ধারাবাহিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে; লাগামহীন অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও বিনিয়োগকারীদের দেশত্যাগে শিল্পখাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; আদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের নামে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করা হয়েছে; আর দেশের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় পরিচয়কে পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশকে মুক্ত করেনি; বরং একসময় সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলা একটি দেশকে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
১. অর্থনৈতিক বিপর্যয়: প্রবৃদ্ধির ধীরগতি থেকে কাঠামোগত সংকট
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট কতটা গভীর, তা বুঝতে হলে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করাই যথেষ্ট। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগে, মহামারি-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ গড়ে ৬.৫ শতাংশের বেশি বার্ষিক জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছিল এবং ধারাবাহিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিল। কিন্তু আজ সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা থমকে গেছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা, মূলধনের দেশত্যাগ এবং কার্যকর অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে অচলাবস্থা – এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে অর্থনীতির গতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।
বিক্ষোভ, ধর্মঘট এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার পর জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২.২২ শতাংশে, আর শিল্প উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে ০.২৮ শতাংশ। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (FY2025) সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.৭ শতাংশ, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ও জুলাই-পূর্ব প্রবৃদ্ধির ধারার তুলনায় অনেক নিচে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি যোগান দেয় এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস, জুলাই ২০২৪-পরবর্তী পরিস্থিতিতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই ঘটনার পর আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলগুলোতে মাসের পর মাস সমন্বিত ধর্মঘট, অগ্নিসংযোগ এবং দণ্ডমুক্তির সুযোগে সক্রিয় অপরাধী চক্রগুলোর চাঁদাবাজির ঘটনা চলতে থাকে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের শীর্ষ ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর অনেকেই তাদের বড় বড় ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ায় সরিয়ে নেয়। এর ফল হিসেবে ৪৫০টিরও বেশি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, আর এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের জীবনে; তাদের মধ্যে কয়েক লাখ কর্মী কর্মহীন হয়ে দারিদ্র্যের মুখে পড়েছেন।
শিল্পখাতের এই বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক খাতের গভীর সংকট। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দ্বি-অঙ্কে পৌঁছে সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে কার্যত নিঃশেষ করে দিয়েছে এবং জীবনযাত্রার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীল প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় এবং সরকারি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সংকটজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সময়ে, সম্পত্তির অধিকার ও আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দুর্বল হয়ে পড়েছে, এমন ধারণা থেকে দেশীয় উদ্যোক্তা ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাজার ছেড়ে সরে যেতে শুরু করেন, ফলে মূলধন পাচার বা ক্যাপিটাল ফ্লাইট ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
২. উচ্চশিক্ষার বিপর্যয়: ক্যাম্পাসে শুদ্ধি অভিযান এবং হারিয়ে যাওয়া এক প্রজন্ম
অর্থনৈতিক বিপর্যয় যেখানে বাংলাদেশের বস্তুগত ভিত্তিকে আঘাত করেছে, সেখানে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙন দেশটির ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। একসময় জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে আদর্শিক সংঘাতের ময়দানে পরিণত হয়েছে, যেখানে সশস্ত্র ছাত্র গোষ্ঠীর প্রভাব ক্রমশ বেড়েছে।
সরকার পতনের পর সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ব্যাপক একাডেমিক শুদ্ধি অভিযানের সূচনা হয়। উপাচার্য, বিভাগীয় প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ গবেষকদের অনেককে জোরপূর্বক পদচ্যুত করা হয়; কেউ হয়রানি ও অপমানের শিকার হন, আবার কেউ শারীরিক নিপীড়নের অভিযোগও তোলেন। বহু দশকের গবেষণা, শিক্ষাদান ও একাডেমিক অবদানকে এক ঝটকায় উপেক্ষা করা হয়; নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতার পরিবর্তে আদর্শিক আনুগত্যই প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
তথাকথিত সংস্কারের নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র থেকে রাজনৈতিক ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং আদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের অঙ্গনে পরিণত হয়।
টানা দুই শিক্ষাবর্ষ ধরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। একাডেমিক ক্যালেন্ডার বারবার ব্যাহত হয়েছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাসের পর মাস বন্ধ ছিল এবং গবেষণা অনুদান স্থগিত হয়ে যায়। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি ঘটে। একই সঙ্গে অনেক শিক্ষক বিদেশে চলে যান বা নিরাপত্তার আশঙ্কায় আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়মিত চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক নজরদারির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
৩. আইন-শৃঙ্খলার ভাঙন: গণপিটুনি ও জনতার বিচারের যুগ
জুলাই-পরবর্তী সময়ে সাধারণ নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে জননিরাপত্তার অবনতি এবং জনতার বিচার বা মব জাস্টিস-এর ক্রমবর্ধমান বিস্তার। ওই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, অনেক পুলিশ সদস্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন, এবং সামগ্রিকভাবে বেসামরিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা ও মনোবল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই শূন্যতায় খুব দ্রুতই প্রচলিত আইনব্যবস্থার জায়গা দখল করে নেয় স্বঘোষিত জনতার বিচার। গত দুই বছরে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন শত শত প্রকাশ্য গণপিটুনি, রাজপথে গঠিত ক্যাঙ্গারু কোর্ট এবং নির্বিচার মারধরের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। ছাত্র আন্দোলনের কমিটির পরিচয়ে পরিচালিত অপরাধী চক্রগুলো পরিবহন কেন্দ্র, পৌর বাজার এবং বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত নিরাপত্তার নামে চাঁদা আদায় করতে থাকে।
এই আইনহীন পরিবেশ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের সূচনা করে। দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘবদ্ধ জনতা পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক সংগঠক, কমিউনিটি নেতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের খুঁজে বের করে গণহত্যামূলক হামলা চালায়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং ভাঙচুর চালানো হয়, যার ফলে পুরো মহল্লা পুড়ে যায় এবং পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের এই ভাঙন শুধু রাজপথেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে কারাগারের ভেতরেও। আটককেন্দ্রগুলোতে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের অভিযোগ বাড়তে থাকে। তারা নির্মম শারীরিক নির্যাতন, চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং বিচারবহির্ভূত প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার শিকার হন। অন্যদিকে, রাজপথে জনতার সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের হত্যা করা হয় এবং তাদের মরদেহ বিকৃত করা হয়। এমনকি হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ গোপন করতে এবং পরিবারের সদস্যদের মরদেহ উদ্ধার ঠেকাতে লাশ নদী, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই সম্পূর্ণ ভাঙন উগ্রবাদের উদ্বেগজনক বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থী সংগঠন ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে পুনরায় তাদের কার্যক্রম সংগঠিত করে, ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ইসলামি উগ্রপন্থীদের একটি ক্রমবর্ধমান কেন্দ্র হিসেবে রূপ নিতে থাকে। সশস্ত্র মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রকাশ্যেই তৎপরতা চালাতে শুরু করে, ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের অক্ষমতা, কিংবা অনিচ্ছা, এমন একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে যেখানে আদালতের পরিবর্তে জনতাই বিচার করছে। এটি এমন একটি আন্দোলনের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু তার পরিবর্তে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
৩. সংখ্যালঘুদের অধিকার: প্রাতিষ্ঠানিক অনিরাপত্তা ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা
জুলাই-পরবর্তী ব্যবস্থার সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতিগুলোর একটি হলো ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন। বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক অঙ্গীকার – যার অধীনে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় তুলনামূলক নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করত, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা এবং সংখ্যালঘু পরিষদগুলো ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, হত্যা এবং যৌন সহিংসতাসহ শত শত থেকে হাজার হাজার ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। একটি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ৫০৫টি ঘটনার রেকর্ড করেছে। সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঘিরে ঘটনার সংখ্যা ৩,০০০-এরও বেশি।
রাষ্ট্রের অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা, কিংবা অনিচ্ছা, এমন একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে যেখানে আদালতের পরিবর্তে জনতাই বিচার করছে। এটি এমন একটি আন্দোলনের প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে ভেঙে দিয়েছিল, কিন্তু তার পরিবর্তে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।
৪. সংখ্যালঘুদের অধিকার: প্রাতিষ্ঠানিক অনিরাপত্তা ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা
জুলাই-পরবর্তী ব্যবস্থার সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতিগুলোর একটি হলো ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন। বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক অঙ্গীকার, যার অধীনে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় তুলনামূলক নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করত, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা এবং সংখ্যালঘু পরিষদগুলোর নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভূমি দখল, হত্যা এবং যৌন সহিংসতাসহ শত শত থেকে হাজার হাজার ঘটনার রেকর্ড রয়েছে। একটি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা শুধু ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই দেশের বিভিন্ন জেলায় ৫০৫টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। সামগ্রিক হিসাবে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঘটনার সংখ্যা ৩,০০০ ছাড়িয়েছে।
যদিও কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রেই এসব ঘটনাকে “অসাম্প্রদায়িক” অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, কিন্তু বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং উপাসনালয়ের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলার ধারাবাহিকতা ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। দায়মুক্তির সংস্কৃতি বহাল রয়েছে; তদন্ত ধীরগতির এবং জবাবদিহি সীমিত। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতিও বেড়েছে। একটি সহনশীল সমাজ হিসেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে আন্দোলন ন্যায়বিচারের পক্ষে থাকার দাবি করেছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের আরও বেশি অনিরাপত্তার মুখে ঠেলে দিয়েছে, আর তাদের সুরক্ষা দেওয়ার রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা স্পষ্ট করেছে।
৫. কোটি মানুষের ভোটাধিকার হরণ: প্রধান বিরোধী দল নিষিদ্ধ
ক্ষমতা সুসংহত করার এক মরিয়া ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টায়, জুলাই-পরবর্তী প্রশাসন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূল চেতনাতেই এক ভয়াবহ আঘাত হানে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে; যে দলটি জাতির প্রতিষ্ঠাতা রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
যে দলটি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাকে মুছে ফেলা কোনো রাজনৈতিক সংস্কার নয়; এটি বহুদলীয় গণতন্ত্রকে নির্মমভাবে হত্যা করার শামিল। একটি মাত্র প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে রাতারাতি কোটি কোটি নাগরিককে রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়হীন করে দেওয়া হয়; তাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের অধিকার পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করা হয়। এই শুদ্ধি অভিযানের মানবিক মূল্যও ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। তৃণমূলের সংগঠক, আজীবন কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ কর্মজীবী পরিবারগুলো এখন গণগ্রেপ্তার, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং অবিরাম আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে হয়রানির আতঙ্কে জীবন কাটাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্পষ্ট এবং উপেক্ষিত সতর্কবার্তা দিয়েছে, বড় রাজনৈতিক আন্দোলন বা দলকে নিষিদ্ধ করা কর্তৃত্ববাদী স্বৈরতন্ত্রের সুস্পষ্ট লক্ষণ। গভীর ঐতিহাসিক শিকড়সম্পন্ন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির কণ্ঠরোধ শান্তি আনে না; বরং গণতান্ত্রিক আশাকে ধ্বংস করে, রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে ভূগর্ভে ঠেলে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অস্থিতিশীলতার এক দুঃখজনক চক্রকে নিশ্চিত করে।
৬. বিতর্কিত নির্বাচন: বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচনবিহীন আঠারো মাসের শাসনের পর গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী প্রশাসন ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন আয়োজন করে, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রকৃত রাজনৈতিক পছন্দের সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে, এই প্রহসনমূলক নির্বাচন ছিল “জেন জি” নবায়নের আড়ালে ক্ষমতা দখলকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত এক আয়োজন।
ইউনূস-সমর্থিত নির্বাচন কমিশন যেখানে ভোটার উপস্থিতির হার ৫৯.৪ শতাংশ বলে প্রচার করে, সেখানে ঢাকাজুড়ে ফাঁকা ভোটকেন্দ্র এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। প্রকৃত ভোটার উপস্থিতির হার ১০ থেকে ১৩ শতাংশের মধ্যে ছিল বলে ধারণা করা হয়। গ্রামীণ জেলাগুলোতে পরিস্থিতি আরও অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যেমন রাজশাহীতে গণভোটের ফলাফলে অসম্ভব ২৪৪ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়। সংখ্যাকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর জন্য প্রশাসন সংসদীয় নির্বাচনের ভোটের সঙ্গে “জুলাই জাতীয় সনদ”-এর গণভোটের ভোট একত্রে গণনা করে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রাখা এবং দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে কারাবন্দি বা নির্বাসনে পাঠানোর ফলে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত একপেশে হয়ে পড়ে। এর ফলে বিএনপি এবং তাদের ডানপন্থী মিত্র জামায়াতে ইসলামীর জন্য নির্বাচনটি প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের পথে পরিণত হয়। রাজপথে সহিংসতার অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক সুস্থতার লক্ষণ ছিল না; বরং তা ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এক নির্বাচনের অস্বাভাবিক নীরবতা। বিরোধী দল, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন গণতন্ত্রের চর্চা নয়; বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া, যা থেকে গঠিত সরকার দেশীয় বৈধতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, উভয়ই হারায়।
৭. বিচারব্যবস্থা: রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত ও দুর্বলীকৃত
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ভাঙন একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বিচারের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ও অভিজ্ঞ বিচারকদের জনতার সহিংসতার হুমকির মুখে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় এবং তাদের স্থলে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বসানো হয়। সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়ায় বিচার পরিচালনার জন্য মৌলিক আইনি সুরক্ষাগুলোও কার্যত পরিত্যক্ত হয়েছে।
গণহারে দায়ের করা মামলাগুলো ভিন্নমত দমনের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। একটি মাত্র পুলিশ মামলায় শত শত নামধারী ব্যক্তির পাশাপাশি হাজার হাজার “অজ্ঞাতনামা আসামি”কে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যার ফলে কর্তৃপক্ষের জন্য ইচ্ছামতো নাগরিকদের গ্রেপ্তার বা হয়রানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা, সাংবাদিক এবং ব্যবসায়িক পেশাজীবীদের জামিন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এবং আদালতে ধারাবাহিক হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, অথচ বিচারকরা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
৮. ইতিহাস বিকৃতি: বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করতে অতীতের রাজনীতিকরণ
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে অন্তর্বর্তী প্রশাসন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে দেশের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারও পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার নির্ধারক সংগ্রাম এবং সেই ইতিহাসের স্মারকগুলোকে পরিকল্পিত ইতিহাস বিকৃতি ও রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে।
এই আদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের সবচেয়ে বেদনাদায়ক উদাহরণ ধানমন্ডি ৩২-এ অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন-জাদুঘরে দেখা যায়। জাতির মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকী কেন্দ্রটিকে অবমাননা করা হয় এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বুলডোজার ও ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ভেঙে ফেলা হয়, যা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনেই পরিচালিত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক দিন আগেই এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি ভাঙচুর করে, আর সেখানে উপস্থিত সেনাসদস্যরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে পরে সরে যান, যা রাষ্ট্রীয় সমর্থনের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ধানমন্ডি ৩২-এ যা শুরু হয়েছিল, তা দ্রুতই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূল প্রতীকগুলোর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে পরিচালিত এক সমন্বিত অভিযানে রূপ নেয়।
ভাষা আন্দোলনের ঐতিহ্য ধ্বংস: নারায়ণগঞ্জে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক সূতিকাগার এবং জাতীয় ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে পরিচিত বাইতুল আমান ভবন বুলডোজার দিয়ে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনার পরও প্রশাসন নীরব ছিল।
ম্যুরাল ও ভাস্কর্য পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস: নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টসহ দেশের বিভিন্ন জনপরিসরে শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল, আবক্ষ ভাস্কর্য এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ভাস্কর্য ভারী নির্মাণযন্ত্র ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ভাঙচুর ও ধ্বংস করা হয়। এতে বিএনপি-সমর্থিত কর্মীরা তদারকির ভূমিকা পালন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অগ্নিসংযোগ ও সম্পদ মুছে ফেলার অভিযান: নোয়াখালী, রাজশাহী, পাবনা, কুমিল্লা এবং জামালপুরসহ বিভিন্ন জেলায় সমন্বিতভাবে সংগঠিত দল ও জনতা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা, যেমন ওবায়দুল কাদের ও শাহরিয়ার আলমের পৈতৃক বাড়ি ও সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
এই ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে ইতিহাসের দৃশ্যমান স্মৃতি মুছে ফেলা, ১৯৭১ সালের উত্তরাধিকার ভেঙে দেওয়া এবং জাতীয় ইতিহাস নতুনভাবে রচনা করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে দুর্বল করে উগ্র রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য জায়গা তৈরি করা এবং প্রজাতন্ত্রের বহুত্ববাদী চরিত্রকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মূল অপরাধ: দায়িত্বহীন একটি আন্দোলন
জুলাই আন্দোলনের সমর্থকেরা দাবি করেন, এই আন্দোলন কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। কিন্তু উপস্থাপিত তথ্য ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে, অসাংবিধানিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসেছে অব্যবস্থাপনা, প্রতিশোধের রাজনীতি এবং অসম্পূর্ণ সংস্কার। প্রাণহানি ঘটেছে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সংখ্যালঘুরা আতঙ্কের মধ্যে পড়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসেছে এবং গণতন্ত্রের পরিসর সংকুচিত হয়েছে।
এটাই এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা, এটি নিজের নৈতিক শক্তিকেই অপচয় করেছে। গত দুই বছরে বাংলাদেশ ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সর্বব্যাপী অনিরাপত্তা, সামাজিক বিভাজন এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা ক্ষয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোমান্টিক বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা এবং জবাবদিহি দাবি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
বাংলাদেশ নবজাগরণের যোগ্য ছিল। কিন্তু সে পেয়েছে ধ্বংসস্তূপ। বিশ্বের উচিত এ বাস্তবতা থেকে মুখ না লুকিয়ে বরং সত্যকে লালনের প্রচেষ্টাকে সহযোগিতা করা। ( আওয়ামীলীগ পেইজ থেকে।)
