ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট একসেপ্ট না করায় শিক্ষিকার “শালীন ভিডিও” ডাউনলোড করে উস্কানিমূলক ক্যাপশন লিখে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড….
ফেসবুকে মোঃ আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ নামে এক ব্যক্তি শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল-কে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। শিক্ষিকার অভিযোগ, তিনি সেই অনুরোধ গ্রহণ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি শালীন ভিডিও অনুমতি ছাড়াই ডাউনলোড করেন এবং উস্কানিমূলক ক্যাপশন যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মোঃ আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ, যিনি “ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন” নামে একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক (এবং ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজ পরিচালনাকারী), শিক্ষিকার অনুমতি ছাড়াই ভিডিওটি প্রকাশ করেন। শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের ভাষ্য, তাঁর ব্যক্তিগত ভিডিও ব্যবহার করে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর সম্পর্কে ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে আপত্তিকর মন্তব্যও করা হয়েছে।
শিক্ষিকার আরও অভিযোগ, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করায় হিরণ তাঁর প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। তিনি ফোন করে ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন—যেমন তিনি কোথাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় কি না—জিজ্ঞাসা করে বিব্রত করার চেষ্টা করেন। পরে ভিডিও ও পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের প্রতি সংহতি ও সমর্থন জানিয়েছেন। সম্প্রতি সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া বিউটি রানী পালকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা ও সমর্থনের জোয়ার দেখা গেছে।
সূত্র: Goutam Halder Pranto -এর টাইমলাইন থেকে ছবি ও আংশিক তথ্য সংগৃহিত।
0000000000000
শাড়ির আঁচল উড়িয়ে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের বিউটি রাণী পাল
জান্নাতুল নাঈম প্রীতি
আপনারা কেউ খেয়াল করেছেন কিনা জানিনা-সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে একটা আশ্চর্য পজিটিভ পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেছে। দুদিন আগের ভাইরাল শিক্ষক বিউটি পালকে দেখেন। শাড়ির আঁচল উড়িয়ে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানের সাথে নরমাল হাঁটাচলার ভিডিও সহ্য করতে পারেনি ফেসবুকের কূপমণ্ডূকরা। কেন জানেন?
কারণ বিউটি পালের আত্মবিশ্বাস। তার মতো অসংখ্য নারী আছে যারা সাবলম্বী, যাদের পুরুষের কর্তৃত্ব দরকার নেই, ভাত কাপড়ের জন্য কারোর অধীনস্থ হওয়ার দরকার নেই। এবং এই নারীদের যমের মতো ভয় পায় কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার লোকেরা। ভাবে- মেয়েদের হাতে টাকা গেলে কি মেয়েরা বশ মানবে?
দেখবেন বোরখা হিজাব পরে অসংখ্য মেয়ে টিকটক করলেও ওদের নিয়ে কূপমণ্ডূকরা ভাবেনা। কিন্তু খোলা চুলের বিউটি পাল অথবা রুমিন ফারহানা হয়ে যায় ট্রলের বস্তু। এর কারণ কি জানেন? কারণ হলো ওই অশিক্ষিতরা জানে বিউটি পাল কিংবা রুমিন ফারহানারা সিঙ্গেল থেকে দরকার হলে মরবে কিন্তু ওদের কতৃত্ব মানবেনা!
আজ থেকে বহু বছর আগে আধুনিক ফ্যাশনের জননী কোকো শ্যানেল মেয়েদের প্যান্টে পকেট জুড়ে দিয়েছিলেন। তখনকার সমাজ জিজ্ঞেস করেছিল-পকেটওয়ালা পুরুষের মতো প্যান্ট দিয়ে মেয়েরা কি করবে?
অর্থাৎ টাকাকে ওরা পুরুষত্ব ভেবেছে! তো বিউটি পালদের এইজন্যই যমের মতো ভয় পায় কূপমণ্ডূকরা। তবে বিউটি পালের কারণে শিক্ষকরা সবাই যেমন শাড়ি পরে রিল দিয়ে প্রতিবাদ করলেন, সেটা চমৎকার!
সেম ঘটনা ঘটে গেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও। রাজীব শাহ নামের গাঁজার আসর বসানো, জিনিস কিনে এবং ধার নিয়ে টাকা না দেওয়া এক লোক রীতিমতো মসজিদ খুলে বসেছিল নতুন ধান্ধায়। সেখানে কম বয়সী এক কিশোর প্রতিবাদ করেছে, বলেছে- এইখানে মসজিদ হইলে মন্দিরও হইবো। তারপর এক হুজুর অন ক্যামেরা জিজ্ঞেস করেছে- তুমি হিন্দু না মুসলমান। ও উত্তর দিয়েছে আমি আগে মানুষ।
ঠিকই তো, যে হুজুর মাদ্রাসায় শিশুদের বলাৎকার করে, অন্যের স্ত্রী নিয়ে রিসোর্টে যায় সে কি মানুষ? তার কাছ থেকে কি আমাদের নৈতিকতা শিখতে হবে? না।
এইগুলো জরুরী, ধর্মব্যবসা আর মেয়েদের চলাফেরাকে যারা বাঁধতে চায় এরা মানবতার শত্রু। এদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন দরকার। সামাজিক আন্দোলন কোথা থেকে গড়ে উঠবে সেটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে।
আমরা যদি ভালোর সঙ্গে সহায়তা করি, তাহলে মন্দদের এইরকম হার বারবার হবে, ধর্মব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়বে।
ফলে- if you want to live in a better future ,spread love and positive changes in present 🌻
আমরা যদি না জাগি তাহলে সকাল হলেও কি লাভ হবে?
0000000000000000000
খান আসাদুজ্জামান মাসুম
বিউটি রাণী পালের ভিডিও নিয়ে সাইবার হেনস্তা: ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় জিডি
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের ফেসবুক রিল নেতিবাচকভাবে প্রচারের অভিযোগে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার বিউটি রাণী পাল নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি গানের সঙ্গে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটার দৃশ্যসংবলিত একটি রিল প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে তাকে শাড়ি পরিহিত ও পরিপাটি অবস্থায় দেখা যায়। পরে ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটি ডাউনলোড করে নেতিবাচক দৃষ্টিতে প্রচার শুরু করলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শিক্ষক নিজেই ভিডিওটি তার অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেন।
‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ পেজে প্রকাশিত ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে কৃত্রিম কণ্ঠ ব্যবহার করে সংবাদধর্মী উপস্থাপনা করা হয়েছে। ভিডিওতে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে একটি লিখিত প্রতিবেদনে সাধারণ হাঁটার দৃশ্যকে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় শুক্রবার ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ ও আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়রি করেন বিউটি রাণী পাল।
ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান জানান, “একজন শিক্ষক ভিডিও ভাইরাল নিয়ে সাধারণ ডায়রি করেছেন। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে।”
প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পাল অভিযোগ করেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের পেজ তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছে। ওই পেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আসিফ ইকবাল ইরন তাকে সাইবার বুলিং ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করেছেন। নতুন করে ‘প্রিয় ফেঞ্চুগঞ্জ’ নামে আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকেও নেতিবাচকভাবে ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ভুল স্বীকার না করেন, তাহলে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করতে বাধ্য হবেন।
00000000000000000
সিলেট জেলার চলতি বছরের সেরা শিক্ষক বিউটি পালের “আনন্দ পাঠ
“-এর এই ভিডিও নমূনা তাঁর ফেসবুক পোস্ট থেকেই নেয়া। এমন অসংখ্য ওয়ার্ম আপ ক্লাশের নমূনা ছড়িয়ে আছে ফেঞ্চুগঞ্জের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি পালের ফেসবুক আইডিতে।
সম্প্রতি বিদ্যালয় আঙ্গিনায় একটি গানের ভিডিও রিল তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করায় ”আচরণ বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না” এই মর্মে বিউটি পালের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে সরকার।

শিশুদের এমন আনন্দ নিয়ে পাঠ দান করা রীতিমত ঈর্ষণীয়। এমন শিক্ষক ছোটবেলায় আমরা পাইনি। শ্রেণিকক্ষে এমন আনন্দসহ পাঠ দান একটি অভিনব উপায় বটে।
শিশুদের মনে-প্রাণে ভালোবাসলেই কেবল এভাবে শিক্ষা দান করা সম্ভব। আমরা সবাই বিউটি পালের পক্ষে আছি। আপনিও তাঁর পক্ষে দাঁড়ান। হোক প্রতিবাদ…
লাইফ ইজ বিউটিফুল
000000000000
ফেঞ্চুগঞ্জের আলোচিত শিক্ষিকা বিউটি পালকে ঘিরে অনেক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সমালোচকদের ধন্যবাদ দিচ্ছি। কারণ, তাদের কারণেই এই শিক্ষিকার নাম প্রথম জানতে পারলাম। তাঁর কয়েকটি ক্লাসের ভিডিও দেখলাম। আর সেই ভিডিওগুলোই অনেক প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল।
ভিডিওগুলোতে দেখতে পাবেন, বিউটি পাল গান, ছড়া, ছন্দ, অঙ্গভঙ্গি আর প্রাণবন্ত উপস্থাপনার মাধ্যমে শিশুদের পাঠ দিচ্ছেন। শিশুরাও আনন্দে অংশ নিচ্ছে, নাচছে, গাইছে, হাসছে।সেইসব শিক্ষার্থীদের চোখে পড়াশোনা কোনো ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখা যাচ্ছে না , বরং তাদের কাছে এই প্রক্রিয়ায় শেখা যেন একটি আনন্দময় অভিজ্ঞতা। আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান বহুদিন ধরেই বলে আসছে, শিশুরা আনন্দের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে ভালো শেখে। খেলা, গান, গল্প এবং অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা তাদের কৌতূহল, স্মৃতিশক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। বিউটি পালের ক্লাসে সেই দর্শনেরই বাস্তব প্রয়োগ দেখা গেল।
ভিডিওগুলো দেখে ভালো লাগার পাশাপাশি এক ধরনের হিংসাও হলো। কারণ, আমাদের ছোটবেলার ক্লাস টিচারের সঙ্গে এর কতই না পার্থক্য! তখন আমাদের কাছে শিক্ষা মানেই ছিল ভয়, শাসন আর বেতের আঘাত। ভুল করলেই শাস্তি, প্রশ্ন করলেই ধমক। অথচ শিক্ষা তো কখনোই আতঙ্কের নাম হওয়ার কথা না । একজন ভালো শিক্ষক কেবল বই পড়ান না, শেখার প্রতি ভালোবাসাও তৈরি করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখতে হয় তাঁকে।
সবচেয়ে ইতিবাচক বিষয় হলো, বিউটি পালের পাশে দাঁড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাও তাঁদের নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষের ভিডিও প্রকাশ করছেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নাচ, গান, গল্প, অভিনয় ও সৃজনশীল নানা কৌশলের মাধ্যমে শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিখছে। এটি শুধু একজন শিক্ষকের প্রতি সংহতি নয়, বরং একটি শিক্ষাদর্শনের পক্ষেও অবস্থান। এটি মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা ও সংস্কৃতি যখন একসঙ্গে পথ চলে, তখন প্রতিবাদও হতে পারে মার্জিত, ইতিবাচক এবং অনুপ্রেরণাদায়ক।
এই ঘটনাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও দেখে কাউকে বিচার করা যত সহজ, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু তা হওয়া উচিত তথ্য, প্রেক্ষাপট ও যুক্তির ভিত্তিতে। কারণ একজন শিক্ষকের কাজের মূল্যায়ন তাঁর একটি মুহূর্তের ভিডিও দিয়ে নয়, বরং তাঁর শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ, অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দিয়েই হওয়া উচিত।
সত্যি বলতে, সমালোচকরা না থাকলে হয়তো বিউটি পালসহ আরও অনেক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষককে চেনাই হতো না। ভাবতাম, এই দেশে ভালো শিক্ষক যেন বিরল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, নীরবে-নিভৃতে অনেক শিক্ষক আছেন, যারা প্রতিদিন শিশুদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন, শেখাকে আনন্দে পরিণত করছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিক ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছেন।
এমন শিক্ষকরাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি। কারণ, একজন শিশুর মনে শেখার আনন্দ একবার জন্ম নিলে, সেই আনন্দই তাকে আজীবন জ্ঞান অনুসন্ধানে অনুপ্রাণিত করে।
0000000
বিউটি রানীপাল : ঝড়ের ভেতরও যে আলো জ্বলে
খাতুনে জান্নাত
কিছু মানুষ নিজের পরিচয় নিজে লেখেন না; সময় তাঁদের পরিচয় লিখে দেয়। বিউটি রানী পাল তেমনই এক নাম। তিনি কেবল একজন শিক্ষিকা নন, তিনি অক্ষরের বাগানে স্বপ্নের চারা রোপণকারী এক মমতাময়ী উদ্যান প্রতিপালক।
একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তখন তিনি শুধু পাঠদান করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। শিশুর চোখে তিনি ভরসা, অভিভাবকের মনে তিনি আশ্বাস, আর সমাজের কাছে তিনি সভ্যতার এক নীরব স্থপতি। সেই স্থপতির হাতেও কখনো কখনো সময় তুলে দেয় ভুল বোঝাবুঝির ভার, সমালোচনার কাঁটা, অপমানের পাথর। কিন্তু পাথরের আঘাতে যেমন পাহাড় ভেঙে পড়ে না, তেমনি সত্যিকারের শিক্ষকও সাময়িক ঝড়ে তাঁর আদর্শ হারান না।
জীবনের আকাশে কখনো কালো মেঘ জমে, কখনো বজ্রপাত নামে। কিন্তু সূর্য তার আলো ফিরিয়ে নেয় না। মানুষের সম্মানও তেমনই—একদিনের করতালি কিংবা একদিনের সমালোচনায় তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় না। কর্ম, সততা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অলংকার।
বিউটি পালের ঘটনাকে ঘিরে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের আরও একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়–আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে বিচার করি, নাকি একটি মুহূর্ত দিয়ে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী ঢেউ প্রায়ই বাস্তবতার গভীরতাকে আড়াল করে দেয়। অথচ সত্য অনেক বিস্তৃত, অনেক ধীর, অনেক বেশি মানবিক।
একজন শিক্ষকের সম্মান কেবল তাঁর নিজের নয়; তা একটি জাতির জ্ঞানচর্চার সম্মান। তাই বিচার হোক তথ্যের ভিত্তিতে, সমালোচনা হোক শালীনতায়, আর সহমর্মিতা হোক মানুষের প্রতি মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
সময় একদিন সব কোলাহল থামিয়ে দেয়। থেকে যায় কেবল মানুষের কাজ, তাঁর চরিত্র এবং তিনি কতটা আলো অন্যের জীবনে ছড়িয়ে গেছেন–তার ইতিহাস। যদি সেই আলো সত্যিই মানুষের পথ দেখিয়ে থাকে, তবে কোনো ঝড়ই তাকে নিভিয়ে দিতে পারে না।
আলোকে অন্ধকার সাময়িকভাবে ঢেকে রাখতে পারে, কিন্তু পরাজিত করতে পারে না।
খাতুনে জান্নাত এ লেখা টাও সংযুক্ত করেন।
বিউটি পাল আমাদের ব্যাচ ম্যাট। ২০০৪-২০০৫ ব্যাচে আমরা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হই। আমরা ছিলাম ৬০ জন। ২০১২ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে বাংলাদেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ০৮ জন। যুক্তরাষ্ট, কানাডার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ০৫ বিসিএস ক্যাডার ৭ নন ক্যাডার ০৫। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি ব্যাংক, বেসরকারি ব্যাংক মিলিয়ে সবাই দেশের সেবায় নিয়োজিত।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে অবহেলিত যে স্তর, সেটি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। সেখানে কাজ করছে দুই জন- বিউটি পাল এবং Masudul Islam Rana। তাদের মেধা ছিল যোগ্যতাও ছিল। দুজনের রেজাল্ট ফার্স্ট ক্লাস। কিন্তু তারা স্বপ্নবাজ। তাই তারা কাজ করছে সিলেট শহরের আভিজাত্য ছেড়ে, ভার্সিটির বড় বড় এসি বিল্ডিং এর ক্লাস রুম ছেড়ে, জাঁকজমকপূর্ণ লাইব্রেরীর সুযোগ সুবিধা ছেড়ে, প্রত্যন্ত গ্রামে। যেখানে শিক্ষকদের বইকেনার জন্য ২০০ টাকাও প্রণোদনা নেই। ৫০ টাকা ইন্টারনেট ভাতাও নেই। তবু শিক্ষকরা নিজ টাকা খরচ করে বাচ্চাদের পড়াচ্ছে।
মাসুদুল হক রানা চাকুরি করে কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের পাওন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আমরা একবার রানার স্কুল দেখার জন্য পাওন গ্রামে যাচ্ছিলাম। তখন ছিল অক্টোবর মাস। হাওরের আফালের সময়। বিশাল বড় বড় ঢেউ। নৌকা ডুবে আর ভাসে। সেইবার আমরা আয়তুল কুরসি পড়তে পড়তে নৌকা ডুবি থেকে বেঁচেছিলাম। তার বাড়িতে অনেক ভালো মন্দ রান্নাও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের বন্ধুদের যারা ঢাকা শহর থেকে গিয়েছিলাম তাদের পিত্ত শুকিয়ে গিয়েছিল। তারা আতংকে খাওয়া দাওয়াও করতে পারিনি। রানার কথা বললেই চলে আসে সেইদিনের ট্রমাটিক মূহূর্তগুলো।
এবার আসি আলো জ্বলমলে শহরের বিপরীতে ২০২৬ সালের রানার গ্রামে, ১২ থেকে ১৬ ঘন্টার লোডশেডিংয়ের গ্রামে। যেখানে গ্রীষ্মের গরমের চাইতে প্রবাসীদের টাকার গরম বেশি, সেইসব গ্রামে। সেইসব গ্রামে যেইখানে মানুষ নিজের কল্যাণের চাইতে অন্যের অকল্যাণ ভাবে। সেইসব গ্রামে যেখানে আপনার ভাষণ নয়, ভূষণই মূখ্য। সেইসব গ্রামে যেখানে সবাই ইহকালের চেয়ে পরকালের কথা একটু বেশিইভাবে। তবে সেইসব গ্রামে যেখানে সুদের ব্যবসা হালাল হয়েছে বহু আগেই। সেইসব গ্রামে যেখানে ধর্ম এখন আর আধ্যাত্মিকতা নয় বরং লৌকিকতা। সেইসব গ্রামে যেখানে শিক্ষকরা অনেক আগেই মাস্টর হয়েছে, অবহেলায় আর অবজ্ঞায়।
পাবলিক ভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর করা রানা আর বিউটিরা ক্লাস নিচ্ছে উপরে ফিটফাট, তবে ভিতরে ছালবাকলহীন রুমে। ফলাফল তারা ভুলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা একসময় আর্টসেল, শিরোনামহীন, মাইলসের কনসার্টে নেচেছিল, প্রতি বৈশাখে তারা নাচতো বিশ্ববিদ্যালয়ের “নোঙর” নামক সাংস্কৃতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানে। সেইসব গ্রামের সাদাকালো জীবনে বিউটি পাল এর অপরাধ নীল রংয়ের শাড়ি পরা। বিউটি পালের অপরাধ, আমাদের জরাজীর্ণ মলিন শিক্ষা ব্যবস্থায় বিউটি পাল তার সিল্কি চুল বাতাসে উড়িয়েছিল। বিউটি পাল আর মাসুদুল হক রানার অপরাধ, বিনিয়োগী শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগে অসমর্থ গ্রামের শোষিত বাচ্চাদের টুইংকেল টুইংকেল লিটিল স্টার পড়ায়, এগুলোতো পড়বে শহরের ভদ্রনোকের সন্তানেরা। গ্রামের বাচ্চারা সারাজীবন ইংরেজিতে দুর্বল থাকবে। ফেল করতে করতে কোন রকমে পাস করে ২৫ বছর বয়স হবে, বিয়ে করবে, সংসার করবে। জগতের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল কাজ- মানব সন্তান জন্ম দিবে। আমাদের একমাত্র রপ্তানি পন্য- আদম সন্তান রপ্তানি করে সরকারের কোষাগার সমৃদ্ধ করবে। GDP এগিয়ে যাবে, কিন্তু Happiness Index শূন্য হবে। স্বামী বিদেশে, বউ স্বদেশে। ফলাফল উগ্র বিকারগ্রস্থ সন্তান।
বিউটি পাল আর মাসুদুল হক রানার অপরাধ, গ্রামের সুবিধা বঞ্চিত বাচ্চাদের স্বপ্ন দেখায় দূর অজানায় হারানোর। সাহিত্যের ভাষায় আমরা যাকে বলি “এসকেপিজম”, তারা রিয়েলিটি মানতে চায় না। তারা সিস্টেমকে বদলাতে চায়। কিন্তু সমাজের চাপে একসময় তারা বদলে যায়। মাস্টার্স এর সিলেবাসে আমরা মিশেল ফুকোর “ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন” বইটি পড়েছিলাম। সেই বই পড়েছিলাম বলেই বাংলাদেশের সংস্কৃতির বর্তমান অস্থিরতায়, শিক্ষকদের উপর শতচাপ সত্ত্বেও বিউটি পাল এর মতো শিক্ষকরা নেচে গেয়ে বাচ্চাদের শিক্ষা দিতে পারছে।
স্যালুট বিউটি পাল এবং তোমার মতো শত শত স্বপ্নবাজকে।
আমি অধম নিজেও একজন শিক্ষক। তবে পাগলামি আছে, তের বছরের শিক্ষকতা জীবনে রুটিনের কোন ক্লাস আজ পর্যন্ত মিস করি নি। স্ট্রাকচারালিজম এর বিপরীতে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এলোমেলো চুল রেখেছি।। বদলাতে চাই বাংলাদেশকে।
মোঃ বদরুজ্জামান বাপ্পি
সহকারী অধ্যাপক (বিসিএস শিক্ষা
