রফিক ভুইয়া
আদালতকে বললাম, ” ফাঁসি দিয়ে দেন, প্রস্তুত আছি ” একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
আজ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় যেন বাংলাদেশের গলার ফাঁস।
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ তার মৃত্যুর আগেই ভবিষ্যৎ বাণী করে গিয়েছিলেন –
” পাকিস্তান ভাঙার অপরাধে এদেশে একদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হবে।”
আজ থেকে ৩৪ বছর আগে ” হুমায়ূন আজাদের প্রবন্ধ গুচ্ছ” ও পরবর্তীতে পাকসার জমিন সাদ বাদ গ্রন্থে এই ধরণের ইঙ্গিত ছিলো। হুমায়ুন আজাদ তার ” জলপাই রঙের অন্ধকার” বইতে বলেছিলেন,
” রাজাকার হওয়া যত সহজ, কঠিন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া । মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেই কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয় না, মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য অপরিহার্য প্রগতি, মুক্তি , স্বাধীনতা, কল্যাণে অটল আপোষহীন বিশ্বাস। একবার রাজাকার মানে চিরকাল রাজাকার, কিন্তু একবার মুক্তিযোদ্ধা মানেই চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।”
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাবা জিয়াউর রহমানকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মনে করেন। শুধু তাই নয় ; তারেক মনে করেন , তার বাবা জিয়াউর রহমান হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। মুক্তিযোদ্ধার অন্তরালে বারবার বেরিয়ে এসেছে জিয়াউর রহমানের পাকিস্তানের গুপ্তচরবৃত্তির প্রসঙ্গ। এটা এতোটাই প্রশ্নবিদ্ধ যে , বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী তৎপরতা নিয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন তুলেছেন। জিয়াউর রহমান বিচারপতি সায়েমের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে রেখেছেন। যার পুরোটাই ছিল মার্কিন সিআইএ ও পাকিস্তানের আইএসআইয়ের প্রতি জিয়ার আনুগত্যের অকাট্য দলিল।
▪️ ক্ষমতার গদির জন্য জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ ও পরবর্তীতে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করা বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এটিএম হায়দারকে নৃশংসভাবে খুন করিয়েছেন।
▪️ জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার বলি হয়েছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের ১৭ জন সদস্য। রাতের আঁধারে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে জিয়াউর রহমানের অনুগত কর্ণেল ফারুক, রশিদ ও ডালিমের সেনাবাহিনী।
▪️ জিয়ার ক্ষমতালিপ্সু চরিত্রের বলি হয়ে ১৯৭৫ সালের ৩ রা নভেম্বর জেলখানার ভেতরে হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সহ জাতীয় চার নেতাকে।
▪️ ” Bangladesh: A Legacy of Blood ” বইয়ে বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৯৭৭ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাত্র দুই মাসে স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের ১,১৪৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার হত্যার প্রমাণ তুলে ধরেছেন।
▪️বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্ণেল তাহেরকে জিয়াউর রহমান মাত্র এক মিনিটের বিচারে ফাঁসি দিয়েছেন।
▪️ জাসদের প্রতিষ্ঠাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, এবং মুজিব বাহীনির প্রধানদের অন্যতম সিরাজুল আলম খানকে জিয়াউর রহমান ৫ বছর বিনা বিচারে জেলে আটকে রেখেছিলেন।
▪️৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে বিনাবিচারে পাঁচ বছর জেল খাটিয়েছেন জিয়াউর রহমান।
▪️ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র ৯ দিন পর সেনাপ্রধান হয়ে জিয়াউর রহমান সাবেক সেনাপ্রধান ও মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টরের প্রধান মেজর কেএম শফিউল্লাহকে বন্দী করে একপ্রকার গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন।
▪️ সিআইএ ও পাকিস্তানের আইএসআইয়ের তত্ত্বাবধায়নে পুতুল প্রেসিডেন্ট ১৯৭৭ সালে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজাকার সংগঠন জামায়াত শিবিরের রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছেন।শুধু তাই নয় , বাংলাদেশের ত্রিশ লক্ষ শহীদের খুনী পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়া গোলাম আযম সহ ৩৮ জন রাজাকারের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে জিয়া তাদের দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
▪️দালাল আইন বাতিল করে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সাজাপ্রাপ্ত ১১ হাজার স্বীকৃত রাজাকারকে জেলখানা থেকে ছেড়ে দিয়েছিলেন।
▪️ রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে জিয়াউর রহমান জোর করে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন।
তারেক রহমান সেই জিয়াউর রহমানের পুত্র। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের করাচীতে জন্মগ্রহণ করা তারেক তার বাবার মতো ” আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর পলিটিশিয়ান’স” এই উক্তিটি না ভুলে ১৭ বছর লন্ডনে পালিয়ে থেকে দেশে ফেরার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন , ” আই হ্যাভ এ প্লান।” আজ জাতি তার পিতার মতো একই ষড়যন্ত্র ও অন্ধকারের ছায়া দেখতে পাচ্ছে তার সন্তান তারেক জিয়ার চোখে মুখে। এজন্যই বাংলায় একটা প্রবাদ আছে –
” বাপ ভালো না হলে সন্তান কোনদিনও ভালো হয় না।”
২০২৪ সালের ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইনের অন্যতম অংশীদার ছিলেন তারেক জিয়া। যার ফলে তার পুরস্কার হিসেবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটার বিহীন নির্বাচনে আমেরিকার আঙ্গুলের ইশারায় তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছে। ইউনূস ও তারেক জিয়ার মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে ৭০০ সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি ও দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের জেল থেকে ছেড়ে দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান নূর , আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী , মোশাররফ হোসেন , হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামীলীগের মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল মজিদ হুমায়ূন সহ অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বিনাবিচারে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নির্যাতনের শিকার হয়ে ইতিমধ্যে কারাগারে বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল মজিদ হুমায়ূন ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশাররফ হোসেন সহ অনেকেই মারা গেছেন। আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনুদ্দীন খান বাদলের কবরে পর্যন্ত অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদ ও মতিয়া চৌধুরীকে দেওয়া হয়নি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী সারাজীবন একজন সৎ ও আদর্শিক নেতা হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে তার স্থান করে নিয়েছেন।১৯৭০ সাল থেকে এই পর্যন্ত তিন ছয় বার বাংলাদেশের সংসদে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান আমলে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী একজন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। আজ তাকে আবার ” শাপলা চত্বর ” এর মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠিয়েছে খুনী জিয়ার উত্তারাধিকার তারেক রহমানের সরকার। আইন ও বিচারের নামে এমন নির্লজ্জ উপহাস আর কী হতে পারে ❓
নিজের দেশ বাঁচাতে জীবনের মায়া তুচ্ছ করে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। তাঁর ঐতিহাসিক সালদা নদীর যুদ্ধ হলিউড মুভিকেও হার মানাবে। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীরা টাঙ্গাইল , মানিকগঞ্জ , জামালপুর , সিরাজগঞ্জ , ব্রাহ্মণবাড়িয়া , কুমিল্লা , চাঁদপুরকে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী মুক্ত করেছিলেন।
আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর ভাই হচ্ছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য সাহসিকতার জন্য তাকে টাঙ্গাইলের ” বাঘা সিদ্দিকী ” উপাধি দেয়া হয়েছিল। যাদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে আজ পৃথিবীর বুকে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ , তারাই আজ এই বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও অপমানিত। যে মানুষরা নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন , আজ তাদের হাতেই হাতকড়া । যাদের সাহসিকতার জন্য আমাদের দেশের সংবিধান ও পতাকা রচিত হয়েছে , আজ তারাই জেলখানায় ।এই যেন ইতিহাসের ভয়াবহতম নির্মম রসিকতা।
তৈমুর লং ও অপারেশন বারবোসা ইতিহাসের অন্যতম আরেক রসিকতা ছিল। তৈমুরের কফিনে খোদাই করে লেখা ছিল – ” যে তার লাশ খুলবে , সে তার চেয়েও ভয়ঙ্কর এক আক্রমণকারীকে ডেকে নিয়ে আসবে। ইতিহাসের সেই নির্মম রসিকতা হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছিলেন তৈমুরের চেয়েও ভয়াবহ স্বৈরশাসক জার্মানির এডলফ হিটলার। জোসেফ স্টালিন তৈমুরের যে কবর খুঁড়ে এনেছিলেন তাতেই খাল হয়ে কুমিরের রূপে এসেছিলেন ভবিষ্যতের হিটলার।আজ বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরী হয়ে আরেক হিটলারের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন তারেক রহমান। ইতিহাস বড়ই নিষ্ঠুর । জিয়াউর রহমানকে তার অপরাধের সাজা দিয়েছিলো তারই অনুগত সেনাবাহিনী। জিয়াউর রহমানের মতো ক্ষমতার অতিরিক্ত লোভ তারেক জিয়াকে বহু আগেই খুনী ও ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে তার সবচেয়ে উদাহরণ ছিল – তারেক জিয়ার নেতৃত্বে ২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড মেরে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা। সেদিন তারেকের ও মাওলানা তাজউদ্দিন এর সরবরাহকৃত গ্রেনেডে মারা গিয়েছিলেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা শহরের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় মেয়র হানিফ ।
ইতিহাসে রোবসপিয়ার এর ‘গিলোটিন ‘ তথা শিরোচ্ছেদ আর জিয়াউর রহমানের নির্বিচারে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের ফাঁসি সবচেয়ে বড় রসিকতা ছিল। রোবসফিয়ার যেভাবে শিরোচ্ছেদ করে মানুষের হত্যা করতেন , সেভাবে শিরোচ্ছেদ করা হয়েছিল তার। নির্বিচারে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের হত্যা করা জিয়াউর রহমানের মৃত্যু সেনাবাহিনীর হাতেই হয়েছিল। আজ যে রাষ্ট্রীয় আইনের অপপ্রয়োগ করে তারেক রহমান ও জামায়াতের জিন্দা অলীরা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন , একদিন এই আইনে কঠোর থেকে কঠোরতর সাজা ভোগ করতে হবে ইউনূস , তারেক ও জিন্দা অলী শফিকের।
এজন্যই বলা হয় –
” রিভেঞ্জ অফ নেচার ” ।
আমাদের ক্ষমা করে দিবেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আমরা বাঙালি ও বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের সম্মান দিতে ও রক্ষা করতে কোনটাই পারিনি 🥲
সত্য সবসময় সুন্দর।
