কবির য়াহমদ
গণমাধ্যমের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতার এক উদাহরণ দেখা গেল ৫ আগস্ট।
সরকার নির্দেশ দিয়েছিল, শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্য প্রচার করা যাবে না। আর সরকারের সেই নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো আরেকবার প্রমাণ করল, তারা শতভাগ সরকার-প্রভাবিত ও সরকার-নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা ‘স্ট্যান্ডার্ড জার্নালিজম’-এর প্রকৃত চেহারা যে কতটা লাচার, তা আজ আবারও প্রমাণিত হলো।
এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে! যে বিএনপি হরহামেশাই দাবি করে তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তাদের আমলেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের এই রূপ দেখতে হবে, তা হয়তো আগে কেউ ভাবেনি।
আজকের দিনে মূলধারার গণমাধ্যমের কোনো সংবাদ ভাইরাল হয় না; বরং সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল খবরগুলো পরে গণমাধ্যমে আসতে দেখা যায়। গণমাধ্যমের খবরের বিশেষত্ব এখানে, ওগুলো ভবিষ্যতের রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার যে বিস্তৃতি, তা যে-কোনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বহু গুণ বেশি শক্তিশালী।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লিতে আজ যে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলো, সেই খবর বাংলাদেশের টিভিতে বা পত্রিকায় আসেনি। রয়টার্স এটা নিয়ে রিপোর্ট করেছেই, এমনকি তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে পুরো অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারও করেছে। পাশাপাশি সাকিব আল হাসানের পেজসহ অসংখ্য প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে সেই লাইভ মুহূর্তে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। ভারতের গণমাধ্যম এবং রয়টার্সের বাইরে বিবিসি, আলজাজিরা, গার্ডিয়ান-সহ বৈশ্বিক অনেক গণমাধ্যম এটাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এটা ব্ল্যাকআউট হলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় নিউজ না হলে কি খবর আটকে রাখা যায়? মোটেও না। বরং তথ্য আটকে রাখার এই চেষ্টার কারণে সরকার নিজেই আরও বেশি বিতর্কিত হচ্ছে। গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার কলঙ্ক স্থায়ীভাবে তাদের ওপরই চাপছে এবং ভবিষ্যতে এটি একটি স্থায়ী নেতিবাচক রেফারেন্স হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকবে। এই মতবিনিময় সভার খবর কেন আসেনি, এর উত্তর সবাই খুঁজছে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের হুঁশিয়ারি ও সরকারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে। বাস্তবতাও তাই।
এখানে আদালতের আদেশের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। আদালত বক্তব্য প্রচারে ঢালাও নিষেধাজ্ঞা দেয়নি; আদালত কেবল ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ প্রচার না করতে নির্দেশ দিয়েছিল। খোদ আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এটা পরিস্কার করেছেন। অনুষ্ঠানের প্রথম মিনিট থেকে শেষ মিনিট পর্যন্ত শুনেছি। ওখানে আর যাহোক, একটা শব্দেও ‘বিদ্বেষ’ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটা বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে ‘বিষোদ্গারমূলক বক্তব্য’ দিয়েছেন। এ ঘটনাকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহিদদের প্রতি অসম্মান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জানায়, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতার বিষয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অস্বীকার করার অভিযোগও তোলা হয়েছে। হায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণায় জুলাই যে একটা ‘বিপ্লব’ এটা তারা কোথায় পেল? সরকারি কোন নথিতে জুলাইকে ‘বিপ্লব’ বলা হয়েছে; দেখাতে পারবে?
এই অনুষ্ঠান যে আজ হতে যাচ্ছে, তা আগে থেকেই সবার জানা ছিল। সবাই এটাও জানে, সরকার অনেক চেষ্টা করেও অনুষ্ঠান আটকাতে পারেনি। অনুষ্ঠান শেষে দেশবাসী যখন দেখল দেশের কোনো গণমাধ্যমে এর ন্যূনতম কোনো খবর নেই, তখন তারা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিয়েছে ‘সরকারই কাউকে নিউজ করতে দিচ্ছে না।’ এতে সরকারের আদতে কী লাভ হলো? তারা বরং বিতর্কিতই হলো এর মাধ্যমে। গ্লোবাল কানেক্টিভিটির এই যুগে এমন সেন্সরশিপ কি আদৌ কার্যকর হতে পারে?
পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়েছিল ইংরেজিতে। তবে কৌতূহলী মানুষের চোখ সংবাদপত্রের গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে আটকে ছিল অন্য এক জায়গায়– তিনি আদৌ শারীরিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম আছেন তো? শেখ হাসিনার কণ্ঠ শুনে অন্তত তাঁকে শারীরিকভাবে সুস্থ বলেই মনে হয়েছে।
নির্বাসনে থাকা অবস্থায় এবং আগে থেকেই ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে রাখা শেখ হাসিনার হয়তো নতুন কিছু বলার ছিল না। তবে এই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে নিজের মুখে চব্বিশের পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে এই ছাব্বিশের বর্তমান পরিস্থিতি ও নিজের অবস্থান জানাতে চেয়েছিলেন। এটা তিনি করেছেন। কৌশলগত রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশের চেয়ে সাধারণ মানুষের প্রধান আগ্রহের জায়গা ছিল তাঁর শারীরিক সক্ষমতা ও অস্তিত্বের খবর পাওয়া; আজকের এই অনুষ্ঠান শেখ হাসিনার শত্রু-মিত্র-মধ্যস্থ সবার সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল।
গণমাধ্যম কোনো পক্ষ নয়। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে পছন্দ-অপছন্দ করতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমাধ্যমকে তার স্বভাবধর্ম পালন করতে হয়। এখানে ব্যক্তি ভয় পেতে পারেন, কোনোভাবে কোনোপক্ষে প্রভাবিত হতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভয় পেয়ে যাওয়া, কোনো পক্ষে হেলে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক।
