দিলু নাসের
দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, তাঁকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য তিনি আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে বিশ্বের মানুষকে অবহিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, গত দুই বছর তিনি নীরব থাকলেও দেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, অনেক অভিযোগ ও তথ্য প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু তাঁর বক্তব্য জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তিনি পাননি। তাই তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। (খবর রয়টার্স)
এরপর তিনি ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলনের প্রসঙ্গে বলেন, তাঁর সরকারের পতন ছিল একটি “পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র”। তাঁর দাবি, আন্দোলনের আড়ালে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনা, পুলিশ সদস্য ও সাধারণ মানুষও হামলার শিকার হয়। তিনি বলেন, সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেছিল এবং ঘটনাগুলোর প্রকৃত সত্য আন্তর্জাতিকভাবে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি। ( রয়টার্স)
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে যে বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, সত্য উদ্ঘাটনের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
বক্তব্যের এই অংশে তিনি দাবি করেন, তিনি কখনও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি; বরং তাঁর সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের ঘটনাবলির পূর্ণাঙ্গ সত্য একদিন প্রকাশ পাবে।
শেখ হাসিনা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে, বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত অস্থিরতার কারণে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, অনেকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা হয়েছে এবং ভিন্নমতের মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। তিনি এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগ সম্পর্কে তিনি বলেন, দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর মতে, একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং বলেন, জনগণের রায়ে রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নয়।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি। তাঁর দাবি, বাংলাদেশে একটি অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হওয়া প্রয়োজন, যাতে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের মত প্রকাশ ও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
এই অংশে তিনি আরও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তিনি অস্বীকার করেন এবং সেগুলোকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে মনে করেন।
দেশে ফেরার ঘোষণা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রশ্নোত্তরের সারসংক্ষেপ
সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি আরও কঠোর পরিণতিরও মুখোমুখি হতে পারেন—তবুও তিনি দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের দেশের মাটিতেই তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চান। (রয়টার্স )
তিনি আরও বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে বিচারিক প্রক্রিয়া চলছে, তা তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে মনে করেন। তাঁর দাবি, যদি তাঁকে আদালতে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তিনি অভিযোগগুলোর জবাব দেবেন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা রাখেন।
(রয়টার্স )
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের ভাগ্য জনগণই নির্ধারণ করবে। তাঁর মতে, যদি জনগণ দলটিকে প্রত্যাখ্যান করে, সেটি ভোটের মাধ্যমে হওয়া উচিত; প্রশাসনিক বা আইনি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়। তিনি দলের নেতা-কর্মীদের ধৈর্য ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি বজায় রাখার আহ্বান জানান।( রয়টার্স )
প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকেরা তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত, চলমান মামলাগুলো, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে শেখ হাসিনা পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে থাকার জন্যই ফিরতে চান এবং যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক, তা মোকাবিলা করবেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিচারিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের আহ্বানও জানান।
(রয়টার্স)
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান এবং আশা প্রকাশ করেন যে ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক সংকট সংলাপ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হবে। রয়টার্স
