মো. মহসিনুল হক
আজ ২২ শ্রাবণ। আজ থেকে ৮৫ বছর আগে এই দিনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেদিন থেকে বাঙালির হৃদয়ে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তা আজও চলমান।
প্রতিটি বাইশে শ্রাবণে আমরা নতুন করে ফিরে তাকাই তাঁর জীবনের দিকে। শুধু কবি-সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ নন, খুঁজে দেখি সেই রবীন্দ্রনাথকেও যিনি জমিদার হয়েও চোখ মেলে দেখেছেন বাংলার প্রান্তিক কৃষকের হাহাকার। আর সেই হাহাকার ঘোচাতে নিজের কলমের পাশাপাশি হাত লাগিয়েছেন মাটিতেও।
আজ আমরা স্মরণ করবো এমন এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যিনি ছিলেন প্রকৃত পক্ষেই কৃষিচিন্তক, পল্লী-পুনর্গঠক আর কৃষকের প্রকৃত বন্ধু।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান হিসেবে রবীন্দ্রনাথের জন্মগত পরিচয় ছিল জমিদার পুত্র। কিন্তু নিজের সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি ছিল একেবারে ভিন্ন। তিনি নিজেই বলতেন- জন্মগত পেশা জমিদারি হলেও তাঁর স্বভাবগত পেশা ছিল ‘আসমানদারী’। অর্থাৎ খাতাপত্র আর খাজনার হিসেবের চেয়ে তাঁর মন পড়ে থাকত সুদূর আকাশের দিকে। সৃষ্টির দিকে। অথচ ভাগ্যের পরিহাসে সেই আসমানদারী মনের মানুষটিকেই নেমে আসতে হয়েছিল একেবারে মাটির কাছে। শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরে জমিদারি তদারকির সূত্রে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বাংলার পল্লিপ্রকৃতি। আর দেখেছিলেন শোষিত-বঞ্চিত কৃষককুলের রুক্ষ এবং শীর্ণ জীবন। এই দেখাই তাঁকে বদলে দিয়েছিল চিরকালের মতো।
১৮৯৪ সালে ইন্দিরা দেবীকে লেখা ছিন্নপত্রাবলীর একটি চিঠিতে নওগাঁর পতিসরের কৃষকদের দেখে ব্যথিত হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘চাষিদের দেখলে তাঁর গভীর করুণা হয়— যেন তারা বিধাতার রাজ্য থেকে একরকম ত্যাজ্যপুত্রই হয়ে জন্মেছে, শৈশবের পর যেন তাদের আর কোনো বৃদ্ধিই ঘটেনি, শুধু মাটির দিকে চেয়ে বেঁচে থাকাটাই যেন তাদের নিয়তি।’
এই গভীর বেদনাই পরবর্তীতে আশ্রয় নিয়েছিল তাঁর অমর কবিতা ‘দুই বিঘা জমি’-তে। উপেনের জমি হারানোর সেই করুণ আর্তনাদ আসলে একার উপেনের নয়! তৎকালীন সমগ্র বাংলার কৃষক সমাজের প্রতিচ্ছবি। জমিদারি খাতা-কলমের আড়ালে যে কবিমন কাঁদত তারই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ এই কবিতা।
সেকালের বাংলায় উচ্চবিত্ত জমিদার পরিবারের রীতিই ছিল ছেলেকে বিলেতে পাঠিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ানো। রবীন্দ্রনাথের বড়দা দ্বিজেন্দ্রনাথ অবশ্য বিলেতযাত্রায় রাজি হননি। কিন্তু দ্বিতীয় দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার হয়ে আইসিএস পাশ করে বিচারক হয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথকেও ব্যারিস্টার বানাতে বিলেতে পাঠিয়েছিলেন। যদিও রবীন্দ্রনাথ ব্যারিস্টারি শেষ না করেই দেশে ফিরে এসেছিলেন শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতির বিপুল জ্ঞান নিয়ে।
কিন্তু নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথের বেলায় রবীন্দ্রনাথ বেছে নিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ। ব্যারিস্টারি নয়- তিনি ছেলেকে পাঠালেন কৃষিবিদ্যা শিখতে। সেকালে অভিজাত বাঙালি পরিবারের কোনো সন্তান বিদেশে গিয়ে কৃষিবিদ্যা পড়েছেন এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া ছিল দুষ্কর। ঠাকুর পরিবারের কেউ কখনো কৃষিজীবী ছিলেননা।কৃষিকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা কোনো অভিজাত পরিবারই ভাবত না। তাই একমাত্র পুত্রকে কৃষিবিদ্যা পড়তে বিদেশে পাঠানোর এই সিদ্ধান্ত ছিল নিছক আবেগ নয়। এটা ছিল রবীন্দ্রনাথের সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনার অংশ। ১৯০৬ সালের এপ্রিল মাসে রথীন্দ্রনাথ যাত্রা করলেন আমেরিকায়। সঙ্গী হলেন পিতৃবন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের পুত্র সন্তোষচন্দ্র মজুমদার। রথীন্দ্রনাথ পড়বেন কৃষিবিদ্যা। সন্তোষ পড়বেন পশুপালনবিদ্যা। দুজনের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেছিল ঠাকুর এস্টেট। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন রথীন্দ্রনাথ। পরে ছোট মেয়ে মীরা দেবীর বিবাহের পাত্র নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিবিদ্যায় পড়তে পাঠালেন রবীন্দ্রনাথ। যাতে দেশে ফিরে জামাতা ও পুত্র একসঙ্গে গ্রামোন্নয়নের কাজে যোগ দিতে পারেন। বিলেতে কৃষি শিখতে যাওয়া সন্তানকে লেখা রবীন্দ্রনাথের সেই চিঠিটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মর্মস্পর্শী দলিল হয়ে আছে আজও—”তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্নগ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ— ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাস কিছু পরিমাণেও যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলেই ক্ষতিপূরণ হলে মনে সান্ত্বনা পাবো। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা, এবং এই চাষিরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের এই ঋণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল— নিজেদের সাংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে।” — [চিঠিপত্র, ২য় খণ্ড]
এই একটি চিঠিতেই ধরা পড়ে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনদর্শন। বিলাসিতা নয়, দায়বদ্ধতা। ভোগ নয়, ঋণশোধ। তিনি সন্তানকে শেখাচ্ছেন শিক্ষার মূল্য যে চাষি নিজে অভুক্ত থেকে চুকিয়েছে। তার প্রতিদান দেওয়াই জীবনের প্রথম কর্তব্য। আমেরিকা থেকে কৃষিবিদ্যায় ডিগ্রি নিয়ে ইউরোপের গবেষণাগার ঘুরে ১৯০৯ সালে দেশে ফিরলেন রথীন্দ্রনাথ। এরপর ১৯০৯ সালের ১৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথ ছেলেকে নিয়ে জলপথে রওনা হলেন শিলাইদহের উদ্দেশ্যে এবং সেখান থেকে গেলেন নওগাঁর পতিসরে।
পিতৃস্মৃতিতে রথীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন সেই ভ্রমণের কথা। হাউসবোটে কেবল বাবা আর তিনি। দুজনে মিলে ভেসে চলেছেন চেনা নদীর বুকে। বহু বছরের প্রবাসজীবন শেষে ফিরে আসা ছেলের সঙ্গে যেন হৃদয়ের সব স্নেহ উজাড় করে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। প্রতি সন্ধ্যায় ডেকে বসে চলত আলাপ-আলোচনা। রথীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন কিছুটা মুখচোরা স্বভাবের। কেতাবি বিদ্যা আওড়াতেন সদ্য কলেজ-পাশ যুবকের মতোই। আর বাবা ধৈর্য ধরে তা শুনতেন। মাঝেমধ্যে নিজে বলতেন দেশের প্রজাসাধারণের আর্থ-সামাজিক দুরবস্থা আর তার প্রতিকারের কথা। এই ভ্রমণই যেন ছিল পিতা থেকে পুত্রের হাতে একটি স্বপ্ন হস্তান্তরের যাত্রা।এরপর রথীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করে রবীন্দ্রনাথ হাত দিলেন এক যুগান্তকারী কৃষি সংস্কারে। শিলাইদহের কুঠিবাড়ির পাশে খাস জমিতে গড়ে উঠল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আদর্শ কৃষি খামার।
ট্রাক্টর ও যন্ত্রপাতির প্রবর্তন: আমেরিকা থেকে চাষাবাদের যন্ত্রপাতি আনিয়ে বাংলার মাটিতে প্রথমদিকের ট্রাক্টর (কলের লাঙল) দিয়ে চাষের পরীক্ষা শুরু করেন রথীন্দ্রনাথ। চাষিদের মধ্যে সেই ট্রাক্টর ভাড়া নেওয়ার আগ্রহেরও অন্ত ছিল না।
শস্য বৈচিত্র্য ও শস্যক্রম (Rotation): শুধু ধান-পাটের উপর নির্ভরতা কমিয়ে আলু, টমেটো, আনারস, কলা, পাটনাই মটর ও খেসারি ডাল চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয় কৃষকদের। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত মৌসুম অনুসারে একই জমিতে একাধিক ফসলের আবর্তন চালু করে কৃষকের আয় ও মাটির উর্বরতা দুটোই বাড়ানোর চেষ্টা হয়।
মৃত্তিকা পরীক্ষা ও জৈব সার: শিলাইদহের মাটিতে কী কী পুষ্টি উপাদানের অভাব তা জানতে একটি ছোট রাসায়নিক গবেষণাগারও গড়ে তোলেন রথীন্দ্রনাথ। জেলেদের কাছ থেকে উদ্বৃত্ত ইলিশ মাছ কিনে মাটিতে পুঁতে রেখে তৈরি করা হয় উৎকৃষ্ট জৈব সার। যা পরে চাষিদের শেখানো হয়।
অনুর্বর জমির পুনরুদ্ধার: নওগাঁর পতিসরের এঁটেল মাটি শুকনো মৌসুমে কঠিন হয়ে যাওয়া জমির সমস্যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ভেবেছেন। চিঠিতে গ্রামকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন পতিত জমিতে খেসারি ডাল, আনারস, কলা, খেজুরের মতো গাছ লাগানোর জন্য।
১৯০৮ সালে জমিদারি কর্মীকে লেখা একটি চিঠিতে কবি বলেন—
“প্রজাদের বাস্তুবাড়ি, খেতের আইল প্রভৃতি স্থানে আনারস, কলা, খেজুর প্রভৃতি ফলের গাছ লাগাইবার জন্য তাহাদের উৎসাহিত করিও… আলুর চাষ প্রচলিত করিতে পারিলে বিশেষ লাভের হইবে।”
শুধু ফসল নয় তিনি ভেবেছিলেন কুটির শিল্পের কথাও। বর্ষা মৌসুমে বেকার হয়ে পড়া কৃষকদের জন্য বয়ন শিল্প, মৃৎশিল্প (Pottery), ছাতা তৈরি শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথাও তিনি চিঠিতে বারবার উল্লেখ করেছেন। ১৯১১ সালে শিলাইদহে বেড়াতে আসা মার্কিন পর্যটক Myron H. Phelps রথীন্দ্রনাথের এই কৃষি খামার দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন যে, তাঁরা সত্যিকারের একটি ভালো খামার গড়ে তুলতে পেরেছেন। যা ছিল রবীন্দ্রনাথ-রথীন্দ্রনাথের পরিশ্রমের এক অনন্য স্বীকৃতি।
ফসল ঘরে ওঠার আগেই যেন কৃষক মহাজনের ঋণের জালে আটকে না পড়ে সেই লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ নওগাঁর পতিসরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক’। কৃষককে স্বাবলম্বী করে তোলাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
এখানেই রবীন্দ্রনাথের ত্যাগের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর প্রাপ্ত অর্থ (প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা, তৎকালীন হিসেবে বিপুল অঙ্ক) তিনি ব্যক্তিগত ভোগে ব্যয় না করে জমা দিয়েছিলেন এই কৃষি ব্যাংকের মূলধন হিসেবে। বিশ্বজয়ী সম্মাননার অর্থও যে প্রান্তিক কৃষকের কল্যাণে ব্যয় হতে পারে এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
‘উপেক্ষিত পল্লী’ (১৯০৭) ও ‘সমবায় নীতি’ (১৯২৮) প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন—
“কৃষিই আমাদের দেশের জীবিকার প্রধান উপায়। অথচ এই কৃষির দিকেই আমাদের সবচেয়ে অবহেলা। একা একা যে কৃষক নিঃস্ব, তারা সমবায়ের শক্তিতে একত্র হলে আর দুর্বল থাকে না।”
১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের পাশে সুরুলে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শ্রীনিকেতন’। এটি ছিল রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন দর্শনের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন। লিওনার্ড এলমহার্স্ট, কালীমোহন ঘোষ ও রথীন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কৃষি গবেষণা, গবাদিপশু পালন, কুটির শিল্প ও পল্লীস্বাস্থ্য সেবাকে একই সূত্রে বেঁধে ফেলেন।
জামাতা নগেন্দ্রনাথকে লেখা এক চিঠিতে (১৯১০) রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়নের সামগ্রিক পরিকল্পনার একটি ঝলক পাওয়া যায়—
“দেশের নিম্নশ্রেণীর লোকদের উন্নতি বিধান করাই এখন যথার্থ আমাদের কাজ… চাষাদের সঙ্গে co-operation-এ চাষ করা, ব্যাংক করা, ওদের স্বাস্থ্যকর বাসস্থান স্থাপন করা, ঋণমোচন করা, ছেলেদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বৃদ্ধ বয়সের সংস্থান করে দেওয়া, রাস্তা করা, বাঁধ বেঁধে দেওয়া, জলকষ্ট দূর করা, পরস্পরকে পরস্পরের সহায়তা সূত্রে আবদ্ধ করা— এমন কত কাজ, তার সীমা নেই।”
এই একটি চিঠিই যেন আজকের সমন্বিত গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনার (Integrated Rural Development) এক শতাব্দী পুরনো রূপরেখা।
জীবনের শেষ পর্বে ১৯৩০ সালে সোভিয়েত রাশিয়া ভ্রমণকালে সেখানকার যৌথ খামার ব্যবস্থা দেখে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে তিনি লেখেন—
“আমি ভেবেছিলুম এদের যৌথচাষের ক্ষেত্রগুলো বুঝি এক একটা এস্টেট। দেখলুম তা নয়, সমগ্র দেশটাই যেন যৌথ খামার… আমাদের দেশে চাষী জমি ধরে বসে থাকে জাঁকিয়ে, কিন্তু ফল পায় না। সমবায় পদ্ধতিতে ছাড়া এ দুর্দশা কাটাবার অন্য উপায় নেই।”
নিজের দেশের কৃষকের দুর্দশার সঙ্গে তুলনা করে সমবায়ভিত্তিক কৃষিকেই তিনি একমাত্র সমাধান বলে চিহ্নিত করেছিলেন আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে।
জমিদার-পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথ কৃষক-প্রজার দুঃখকে দেখেছিলেন নিজের দুঃখ বলে। ২রা পৌষ ১৩১৮ সালে লেখা তাঁর উইলে উত্তরাধিকারী রথীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন- ‘জমিদারির আয় নিজের ভোগে না লাগিয়ে যেন প্রজাদের হিতার্থেই তা নিযুক্ত করা হয়’ – এই উপদেশ তিনি বারবার দিয়েছেন পুত্রকে।
‘দুই বিঘা জমি’ রচনার সময় উপেনের যে বেদনা তাঁর কলমে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল তা নিছক কাব্যিক কল্পনা নয়! তা ছিল বছরের পর বছর ধরে কাছ থেকে দেখা এক বাস্তবতার প্রতিফলন। জমিদারের মন নিয়ে এই সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে না। এই দূরদর্শী মানবিকতা ছিল সম্পূর্ণ রবীন্দ্রনাথেরই নিজস্ব সৃষ্টি।
আজকের এই বাইশে শ্রাবণে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে শুধু তাঁর গান বা কবিতা স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়। স্মরণ করা প্রয়োজন তাঁর সেই দূরদর্শী রূপটিও। যিনি মাটির কাছাকাছি থেকে দেখেছিলেন বাংলার কৃষকের প্রকৃত সংকট। এই সংকটই তাঁকে নিজের ‘সৃষ্টিশীল প্রতিভা’ ও ‘বৈষয়িক সম্পদ’ দুটোই নিয়োজিত করেছিলেন সেই সংকট মোচনে।
রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন যে দেশের মূল ভিত্তি কৃষি সেই দেশের প্রকৃত সভ্যতার উন্নতি নির্ভর করে কৃষকের মুখের হাসির ওপরই। মহাজনের শোষণমুক্ত, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমবায়ভিত্তিক কৃষির যে স্বপ্ন তিনি শতবর্ষ আগে দেখেছিলেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনা আমাদের কৃষিনীতির জন্য এক অমূল্য পাথেয়। তাঁর এই মানবিক দিকটি না জানলে রবীন্দ্রনাথকে জানা অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
আজ তাঁর প্রয়াণের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করি সেই কবিকে যাঁর কলমে যেমন ফুটে উঠেছিল প্রকৃতির সৌন্দর্য তেমনি ফুটে উঠেছিল প্রান্তিক মানুষের বেদনাও। তাঁরই একটি ছোট কবিতা ‘অকৃতজ্ঞ’ দিয়ে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য শেষ করি—
“ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করে, ধ্বনি কাছে ঋণী সে যে পাছে ধরা পড়ে।”
তথ্যসূত্র:
‘রবিজীবনী’ — প্রশান্তকুমার পাল
‘রবীন্দ্রজীবন কথা’— প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
‘রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন’ — সমীর সেনগুপ্ত
‘রবীন্দ্রনাথ এই বাংলায়’— আহমদ রফিক
‘রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র’ — সৌমেন্দ্রনাথ সরকার
‘চিঠিপত্র (২য় খণ্ড)’ — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
