আনোয়ার শাহজাহান
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ এবং ব্যবসায়িক কাজে যাওয়ার সুবাদে নিজে গাড়ি চালানোর সুযোগ হয়েছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের রাস্তায় গাড়ি চালিয়েছি। প্রতিটি দেশের সড়কব্যবস্থা, চালকদের আচরণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে কিছু না কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে একটি বিষয় আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় খুব স্পষ্ট—বাংলাদেশের মতো কষ্টদায়ক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এমন ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা অন্য কোনো দেশে পাইনি।
বাংলাদেশে গাড়ি চালানো অনেক সময় শুধু একটি গাড়ি চালানোর বিষয় নয়; এটি হয়ে দাঁড়ায় ধৈর্য, সতর্কতা ও ভাগ্যের পরীক্ষা।
আপনি হয়তো নিজের লেন মেনে ধীরে গাড়ি চালাচ্ছেন। কিন্তু সামনে থেকে হঠাৎ একটি গাড়ি চলে আসতে পারে। পাশ দিয়ে কোনো মোটরসাইকেল ঢুকে যেতে পারে। পেছন থেকে একের পর এক হর্ন বাজতে পারে। কেউ কোনো সংকেত ছাড়াই গাড়ি ঘুরিয়ে দিতে পারে। আবার পথচারীও হঠাৎ রাস্তা পার হতে পারেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—অনেক চালকের কাছে দ্রুত পৌঁছানোই যেন দক্ষতার পরিচয়। কে আগে যাবে, কে আগে ওভারটেক করবে, কে বেশি গতিতে চালাবে—রাস্তায় অনেক সময় এমন একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা দেখা যায়।
অথচ একটি গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের পেছনে শুধু একজন চালক বসে থাকেন না; তার হাতে থাকে যাত্রী, পথচারী এবং আশপাশের অসংখ্য মানুষের জীবন।
#লাইসেন্স_যেন_টাকা_দিয়ে_কেনা_কাগজ_না_হয়
পৃথিবীর অনেক দেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, লিখিত পরীক্ষা ও বাস্তব গাড়ি চালানোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। বাংলাদেশেও নিয়ম রয়েছে, তবে লাইসেন্স প্রদান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অর্থ বা তদবিরের মাধ্যমে অদক্ষ কেউ যেন লাইসেন্স না পান, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
লাইসেন্স দেওয়ার পাশাপাশি চালকদের কর্মকাণ্ডও নজরদারিতে রাখতে হবে। অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং ও বারবার ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানা, লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত এবং গুরুতর অপরাধে লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা থাকা উচিত।
প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্পিড ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
#শুধু_চালক_নয়, #রাস্তার_ব্যবস্থাপনাও_গুরুত্বপূর্ণ
সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালককে দায়ী করলে সমস্যার পুরো সমাধান হবে না। সিলেটের বিভিন্ন সড়কে অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপরিকল্পিত ইউটার্ন, অপর্যাপ্ত আলো ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ রয়েছে।
যেসব স্থানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটে, সেগুলোকে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা বা ব্ল্যাক স্পট হিসেবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও পর্যাপ্ত সড়কবাতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
#আইন_সবার_জন্য_সমান_হোক
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গাড়ির মালিক বা চালক যত প্রভাবশালীই হোন, আইন ভঙ্গ করলে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
সবশেষে আমাদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। দক্ষ চালক তিনি নন, যিনি সবচেয়ে দ্রুত গাড়ি চালান; দক্ষ চালক হলেন তিনি, যিনি নিরাপদে নিজে এবং অন্যদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেন।
একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি গাড়ির ক্ষতি নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন মায়ের বুক এবং একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ।
তাই সড়কে গতি নয়, নিরাপত্তাই হোক আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।
লেখক: সম্পাদক, আমাদের প্রতিদিন, লন্ডন।
