আফজাল হোসেন
বন্ধুত্ব আগাছার মতো এখানে ওখানে জন্মায় না। উপযুক্ত জমি লাগে। একজন নিবেদিত প্রাণ মানুষ লাগে। যে মানুষ কৃষকের মতো সর্বদা চমৎকারভাবে বন্ধুত্বের বৃদ্ধি ঘটছে কি না খেয়াল রাখে। শুধু খেয়াল রাখা নয়, উপযুক্ত যত্নদান করে যেনো বন্ধুত্ব, সম্পর্ক বিশেষ হয়ে উঠতে পারে।
বন্ধুত্ব, সম্পর্ক বুনোফুলের মতো যেখানে সেখানে জন্মে হেসে থাকে না বা অনাদরে, নিভৃতে কয়েকদিন ফুটে থেকে অগোচরেই শুকিয়ে ঝরে যায় না। সুন্দর সম্পর্কের জন্ম ও গড়ে তোলার জন্য যত্ন নিতে পারা যায় এমন পরিধি ও পরিবেশের দরকার হয়।
অনেক ক’টা বন্ধুদল ছিল আমার। গ্রামে যাদের সাথে খেলে পড়ে বড় হয়েছি, তারা গ্রামেই রয়ে গিয়েছিল। ঢাকায় আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ধীরে ধীরে আর একটা বন্ধুদল গড়ে ওঠে। সেটা গড়ে ওঠে ধীরে। আর্ট কলেজ অন্য কলেজগুলোর মতো নয়। সেখানে চর্চা, অনুশীলনের রীতিনীতি অনেক আলাদা। সে আলাদা পদ্ধতি বন্ধুত্বের ভিত্তি তৈরি করে দিতে সাহায্য করেছিল।
আমাদের কলেজে কাজ শেখার পদ্ধতিগুলোর মধ্যে একটা ছিল ছবি আঁকার জন্য ছোট ছোটো দল হয়ে বাইরে যাওয়া। কয়েকজন মিলে প্রকৃতি ও জীবনকে নিকট থেকে দেখার চর্চা ও অনুশীলন করা। এই দলে ভাগ হওয়া, হতে চাওয়ার মধ্যে কে কাকে পছন্দ করছে বা কার সাথে কারা একসাথে কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে তার একটা ইঙ্গিত মেলে। ছোট একটা দল হওয়া তারপর একে অপরকে চিনতে বুঝতে চাওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নতুন বন্ধু, বন্ধুদল।
গ্রাম থেকে শহরে এসে কিছু নতুন বন্ধু পাওয়া জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা। তা মন প্রাণ খুলে দিতে সাহায্য করে। আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। মনে আছে, তখন আব্বা আম্মা চিঠি লিখতেন সে চিঠির প্রায় শেষের দিকে প্রশ্ন থাকতো, ওখানে কি দু একজনের সাথে তোমার বন্ধুত্ব হয়েছে?
বন্ধুত্ব কার সাথে কখন কিভাবে হবে, হয়ে যায় কেউ পূর্ব থেকে অনুমান করতে পারে বলতে পারে না। বন্ধুত্ব অনেকদিন সময় নিয়ে হয়ে যেতে পারে আবার কারো কারো সাথে হুট করেও হয়ে যায়।
একসঙ্গে অনেকগুলো মানুষ ওঠে বসে, চলে বলে তাতেই সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায় না। একসাথে ওঠা বসা, চলতে বলতে পারা একটা উপলক্ষ্য, সুযোগ তৈরি করে দেয়। সে সুযোগে বন্ধুত্ব
তৈরি হতে পারে, নাও হতে পারে।
আর্ট কলেজে অনেকে একসাথে ভর্তি হয়েছি, এক ক্লাসে পড়ি তার জন্য সবাই সবার বন্ধু হয়ে যায়নি। রোজ যারা বামে ডাইনে বসে, তারাও বন্ধু হয়ে যায় না। এসব কয়েকটি উপলক্ষ্য মাত্র। সুযোগ তৈরি হলো কিন্তু সেটাই আসল নয়। মনের সায় পেতে হয়। মানে মন কলকাঠি না নাড়লে পাশের মানুষ থেকে যায় পাশের মানুষ, বন্ধু হয়ে ওঠে না।
দুপুরের বিরতিতে যে যার মতো শ্রেণীকক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। সে সময়টাতে দুজন, তিন বা চারজনের দল হতে চাওয়াকে, ক্যান্টিনে অথবা কোথাও বসতে গিয়ে কেউ কাউকে খুঁজছে বা ডাকছে, এসো একসাথে বসি। এমন ডাক পেলে সেটাই বন্ধু হওয়ার আহ্বান ধরে নেয়া যায়।
একজন আরেকজনকে ডাকছে, পাশে বসতে বলছে, অদেখা মনটাকে বুঝতে পারছে কেউ, এসব বন্ধুত্বের সুর তোলা। পাশের জনের ভুলগুলো বড়ো করে যারা ধরছে না, যারা প্রশ্রয় দিচ্ছে, অবসরে খুঁজছে, ডাকছে, ডেকে পাশে বসতে বলছে তারা বিশেষ মানুষে পরিণত হয়ে যায়। অবসরে যাদের কথা মনে হয়, তারা মনে জায়গা করে নেয়া মানুষ।
কলেজের গন্ডি পেরিয়ে নতুন আর একদল বন্ধু তৈরি হলো ঢাকা থিয়েটারে যুক্ত হয়ে। যিনি আমাকে আগ্রহে নাটকের সাথে যুক্ত করে নিলেন তাঁর তখন দেশজোডা খ্যাতি। স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা কমান্ডার নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।
হাল্কা পাতলা, দীর্ঘদেহী একজন মানুষ তিনি। প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়, অত্যন্ত প্রত্যয়ী মানুষ, যার চলা বলা, ভাবনা, স্বপ্ন, দর্শন সবই অনুপ্রেরণাদায়ক। তরুণ বয়স ও ভাবনাকে সহজে কব্জা করতে পারে এমন ব্যক্তিত্ব ও মানুষ তিনি।
আর এক ব্যক্তিত্ব রফিকুল হক, দাদুভাই। মনে হতো জাদু জানা মানুষ, তিনি জাদুকর।
একদল তরুণ, ঢাকা শহরের, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকে, সবাইকে তিনি সামনাসামনি না দেখে চিনতে পারতেন। কর্ম দেখে মানুষ চিনেছিলেন। তিনি ছিলেন পূর্বদেশ পত্রিকার শিশু কিশোরদের সাহিত্য পৃষ্ঠার সম্পাদনার দায়িত্বে। বসতেন দেশের অন্যতম সেরা এক প্রতিষ্ঠানে। দেশ সেরা তিনটি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো সেই অবজারভার ভবন থেকে।
বিখ্যাত সেই ভবন থেকে প্রকাশিত হতো অত্যন্ত জনপ্রিয় সিনেমা বিষয়ক সাপ্তাহিক, চিত্রালী। প্রকাশিত হতো জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক, অবজারভার এবং বাংলা দৈনিক, পূর্বদেশ। পূর্বদেশের শিশু কিশোর, তরুণদের সাহিত্য চর্চার সাপ্তাহিক পৃষ্ঠার নাম চাঁদের হাট। সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা মানুষটা ভাবতে পারতেন, ভালো চাকরি করছি, জীবন আরাম আয়েশে কাটানো যায়, কাটাই।
এ জগতে, এ দেশের অনেকেরই তেমনভাবে জীবন কাটে। মানুষ যার যার ইচ্ছামত জীবন কাটাতে চায়। অনেক মানুষ মনে করে, জীবন শুধু নিজের জন্য নয়। দাদুভাই, রফিকুল হক ছিলেন সাধারণ দেখতে এক অসাধারণ মানুষ। সেসময়ে তিনি এবং তাঁর মতো অনেক মানুষই মনে করতেন, জীবন একবারের জন্য, সে জীবন অর্থবহ হওয়া উচিৎ।
যে মানুষ অর্থবহ জীবন চান, চাইবেন তিনি নিজের ভাবনা মতো কোনো বিশেষ ভূমিকা নেন। সেই ভূমিকাতে আমরা বিভিন্ন স্থান থেকে, নানা নাম পরিচয়ের তরুণ একটা ছাতার নিচে এক হতে পারি। হয়ে যাই। আমাদের মধ্যে কেউ ছবি আঁকে, কেউ ছবি তোলে। অনেক লেখে ছড়া, কবিতা, লেখে গল্প বা ভ্রমনকাহিনী সবার আলাদা আলাদা নাম আছে। সেই আলাদা নামগুলোর একটা নতুন পরিচয় তৈরি হয়ে গেলো। পরিচয়, আমরা চাঁদের হাট।
১৯৭০ এ গ্রাম থেকে এই শহরে আসা। ১৯৭৫ এর মধ্যে আমার তিনটি পরিচয় তৈরি হলো। নয় মাস কেটে যায় মুক্তিযুদ্ধে। আবার ঢাকায় ফিরে সব আগের মতো ছিলো না। যুদ্ধ, স্বাধীনতা, পতাকা নতুন উদ্যম, উৎসাহের যোগান দিয়েছিল। বোধহয় সে কারণেই মনে নতুন কিছু করার বাসনা তীব্র হয়ে ওঠে।
সে বাসনা ও চেষ্টার কারণে অতি অল্পসময়ের মধ্যে কর্ম ও ভাবনার পরিধি দ্রুত বিস্তৃত হয়। গড়ে ওঠে একাধিক পরিচয়। আফজাল ছবি আঁকে, আর্ট কলেজের ছাত্র, সে একজন তরুণ অভিনেতা, দেশের বিখ্যাত নাটকের দল ঢাকা থিয়েটারে অভিনয় করে এবং যুক্ত হলো গৌরবের আরো একটা পরিচয়, আফজাল চাঁদের হাটের।
জীবন এক দীর্ঘ ভ্রমনযাত্রা। সেই সূদুর সাতক্ষীরার পারুলিয়া গ্রাম থেকে যাত্রা শুরু। ঢাকার আর্ট কলেজে এসে থামি। তা আসলে থেমে যাওয়া ছিল না। একটা স্টেশনে নেমে পড়া। নেমে গিয়ে আর এক যাত্রার জন্য গাড়ির অপেক্ষা করা। সময় আসে। স্টেশনে এসে দাঁড়ায় চাঁদের হাটে যাওয়ার গাড়ি।
পরবর্তী স্টেশন ঢাকা থিয়েটার। আর্ট কলেজ, ঢাকা থিয়েটার, চাঁদের হাট। একজীবনে এতগুলো স্টেশনে নামতে, ঘুরতে, নিজের করে তুলতে পারা পরম সৌভাগ্য।
জানতাম না, আরো বাকি আছে। জানা ছিল না, হুইসেল বাজিয়ে নতুন একটা গাড়ি আসছে। সাগর, ফরিদুর রেজা সাগর সে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাবে সম্পূর্ণ নতুন, আনন্দময়, উত্তেজনাপূর্ণ আর এক স্টেশনে। যে স্টেশনের নাম খাবার দাবার।
