ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও দক্ষিণ-মধ্য এশিয়া বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর গত রোববার (৩০ আগস্ট) তাঁর এক্স পোস্টে জানান, এই সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আরও একটি অসাধারণ চুক্তি হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ আরও বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই পোস্ট প্রকাশের পরপরই দেশজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টক শো ও গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে — বিশেষত এমন এক সময়ে যখন দেশ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অর্থনৈতিক চাপ ও সারের সংকটে জর্জরিত।
প্রেক্ষাপট: এমনিতেই ২৫টি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি
উল্লেখ্য, নতুন এই ঘোষণার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক-বাণিজ্য আলোচনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার মধ্যে ১৪টি কেনার চূড়ান্ত চুক্তি গত ১ মে সই হয়, যাতে ব্যয় হবে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বাণিজ্য চুক্তি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ক্রয়-প্রতিশ্রুতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর শর্তেরই অংশ। এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে আরও বোয়িং কেনার ঘোষণা আসায় সমালোচকদের প্রশ্ন — একের পর এক এত বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি আদৌ দেশের প্রকৃত চাহিদার নিরিখে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখার তাগিদে।
প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
সমালোচনার জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো চাপে পড়ে নয়, প্রয়োজন থেকেই বাংলাদেশ বোয়িং কিনছে। তাঁর ভাষ্যে, সরকার বাংলাদেশকে একটি “এভিয়েশন হাব” হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, আর সে জন্য বিমানের ৭০ থেকে ৮০টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রীর এই “প্রয়োজন” তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতার কয়েকটি ফাঁক স্পষ্ট হয়ে ওঠে —
প্রথমত, সময়ের মিল নিয়ে প্রশ্ন। বোয়িং কেনার প্রতিটি নতুন ঘোষণাই এসেছে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিবৃতি বা সফরের ঠিক পরপর — সার্জিও গোরের ঢাকা সফরের এক মাসের মাথায় নতুন চুক্তির খবর আসা তারই একটি উদাহরণ। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিমান কেনার এই প্রতিশ্রুতি মূলত বাণিজ্য ঘাটতি সমন্বয়ের শর্ত হিসেবেই চুক্তির নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, বহরের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে নয়। ফলে “চাপ নেই” দাবিটি নথিগত বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সাযুজ্যপূর্ণ নয়।
দ্বিতীয়ত, ব্যয়-অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। দেশ যখন দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে, বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিশ্চিত এবং জ্বালানি খাতকে অর্থনীতির নতুন সংকট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, ঠিক তখন কয়েক বিলিয়ন ডলারের নতুন উড়োজাহাজ ক্রয়-প্রতিশ্রুতি দেওয়া রাজস্ব-অগ্রাধিকার নিয়ে স্বাভাবিক প্রশ্ন তোলে। “এভিয়েশন হাব” গড়ার লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হতে পারে, কিন্তু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার সঙ্গে তার অগ্রাধিকার-সমন্বয় ব্যাখ্যা করা হয়নি।
তৃতীয়ত, “৭০-৮০টি বিমানের প্রয়োজন” দাবিটি একটি লক্ষ্যমাত্রা মাত্র — এর পেছনে কোনো নির্দিষ্ট রুট-সম্প্রসারণ পরিকল্পনা, যাত্রী-চাহিদার পূর্বাভাস বা আর্থিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ প্রকাশ্যে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে সংখ্যাটি প্রকৃত পরিকল্পনার ফসল, নাকি ক্রয়-প্রতিশ্রুতিকে যৌক্তিক রূপ দেওয়ার একটি পশ্চাৎ-যুক্তি (post-hoc justification), তা স্পষ্ট নয়।
যে সময়ে ও যেভাবে একের পর এক বড় অঙ্কের ক্রয়-প্রতিশ্রুতি আসছে, তার সঙ্গে বাণিজ্য-চুক্তির শর্তগত বাধ্যবাধকতা এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য ঘোষণার সময়-সমাপতন মিলিয়ে দেখলে “কোনো চাপ নেই” দাবিটি পুরোপুরি নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণিত হয় না। প্রশ্নটি তাই থেকেই যায় — অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা জনসমক্ষে কতটা উপস্থাপিত হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে জনআস্থা।
