ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
সিলেট শহরে স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন কবি দিলওয়ারকে নিয়ে আড্ডা বসত। জায়গাটি ছিল সুরমা মার্কেট। একই সময়ে কবি আফজাল চৌধুরীকে দেখতাম পৌর লাইব্রেরিতে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে সুরমা মার্কেটের সেই আড্ডা ক্রমেই বড় হতে থাকে। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মানুষজন সেখানে ঢুঁ মারতেন। কেউ কেউ এক কাপ চা ভাগাভাগি করে মধ্যরাত পর্যন্ত আয়েশ করে পান করতেন, আর কথার পর কথা, তর্কের পর তর্কে রাত পার হয়ে যেত।
‘বইপত্র’ নামে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে উঠেছিল। সুভেন্দু ইমাম কিংবা আব্দুল হান্নান ভাইদের সেই লাইব্রেরিতেও আড্ডা জমত। বইয়ের তাক, চায়ের কাপ আর মানুষের কথাবার্তা—সব মিলিয়ে সেসব জায়গা ছিল একেকটি অনানুষ্ঠানিক নাগরিক বিশ্ববিদ্যালয়।
সেসব আড্ডার ইনার সার্কেলের মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না। উড়নচণ্ডী স্বভাব আর নানা ক্ষেত্রের দৌড়ঝাঁপের ফাঁকে আমার যাতায়াত ছিল কালেভদ্রে, কখনো প্রয়োজনের তাগিদে। তাই আড্ডার ভেতরের ইতিহাসে আমার নাম থাকার কথা নয়; বরং দূর থেকে তার আলোটুকু দেখেছি।
পশ্চিমের সমাজে পাব, বারে মানুষ আড্ডা দেয়। আমাদের প্রবাসী সমাজে মানুষ দেশ ছেড়ে গেলেও অনেক সময় আড্ডার ঠিকানা খোঁজে মসজিদ-মন্দিরে। কিন্তু নাগরিক জীবনে নিছক আড্ডাও বড় প্রয়োজনের জিনিস। একটি নাগরিক সমাজ এমনিতেই ঋদ্ধ হয় না। মানুষে মানুষে অবিরাম মেলামেশা, মতের আদান-প্রদান, তর্ক-বিতর্ক, হাসি-ঠাট্টা আর কখনো নিছক সময় নষ্ট করার মধ্য দিয়েও একটি শহরের মনন তৈরি হয়। আড্ডা আসলে শহরের অদৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয়।
এবার সিলেটে এসে তেমনই একটি আড্ডার দেখা পেলাম সাংবাদিক অপূর্ব শর্মার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘অভ্র প্রকাশন’-এ।
আমার বন্ধু ড. আব্দুল ফতেহ ফাত্তাহ একসময় অধ্যক্ষ ছিলেন। ছাত্রাবস্থা থেকেই ফাত্তাহ নিজেকে সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন বিদগ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সাধনায় ছিলেন। কম বয়সেই চুল সাদা করেছেন—দেখলে মনে হয়, পুরনো দিনের বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার প্রস্তুতি তিনি বেশ আগেই সম্পন্ন করে রেখেছেন! একটু সামনে ঝুঁকে হাঁটেন, একটু সামনে ঝুঁকে বসেন—সব মিলিয়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবীর যেন একেবারে খাঁটি অবয়ব।
অভ্র প্রকাশনে গিয়ে দেখি, ফাত্তাহ আগেই উপস্থিত। সঙ্গে লেখক, গবেষক ও অনুবাদক মিহিরকান্তি চৌধুরী এবং প্রখ্যাত রবীন্দ্রগবেষক অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ। এমনিতেই শিক্ষকদের দেখলে আমার ভেতরে এক ধরনের পুরোনো ছাত্রভীতি জেগে ওঠে। তাঁদের সামনে বসলে মনে হয়—ঠিকমতো বসেছি তো? ভঙ্গিটা ঠিক আছে তো?
শিক্ষকদের সামনে আরেকটি নিয়মও অলিখিতভাবে মেনে চলতে হয়—তাঁরা বলবেন, আমরা শুনব।
কিন্তু সেদিন অদ্ভুত ব্যতিক্রম ঘটল। আমাকে অবাক করে দিয়ে তাঁরা অনেকটাই আমাকে শুনলেন। শিক্ষক-গবেষকদের মতো মানুষ আমার মতো একজনকে সময় দিয়ে শুনছেন—এ আমার জন্য বিরল সম্মান। তার চেয়েও বড় কথা, এটি আমার প্রতি তাঁদের বিরল ভালোবাসা।
সিলেট শহরে একসময় অনেক নারী লেখক ও কবি ছিলেন। তাঁদের নিজেদেরও ছিল প্রাণবন্ত সংগঠন ও সাহিত্যিক পরিসর। সেই ধারার দুই কবি বোনও সেদিন এসে যোগ দিলেন আড্ডায়। কথার পরিধি বাড়ল, স্মৃতির দরজা খুলল, আর একসময় মনে হলো—শহরটি তার পুরোনো কোনো হারানো উঠোনকে যেন আবার খুঁজে পেয়ে পুরো আয়োজনটিকে নিজের স্বভাবসুলভ বিনয় ও আন্তরিক আপ্যায়নে প্রাণবন্ত করে রাখলেন অপূর্ব শর্মা। বিদায়বেলায় উপহারও দিলেন—বন্ধুর লেখা কবিতার বই, আমার নিজের লেখার সংকলন, কবি বোনদের বই। বইয়ের চেয়েও বড় ছিল উপহারের ভেতরের মমতা।
অভ্র প্রকাশনকে ঘিরে সিলেট শহরে যে আড্ডাটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, সেটি শুধু কয়েকজন লেখক-সাংবাদিকের মিলনস্থল হয়ে না উঠুক—হয়ে উঠুক শহরের মননের একটি উন্মুক্ত উঠোন। যেখানে বয়সের দেয়াল থাকবে না, মতের অমিল থাকবে, তর্ক থাকবে, হাসি থাকবে, নতুন বই থাকবে, পুরোনো স্মৃতি থাকবে; থাকবে নতুন প্রজন্মের জন্যও একটি চেয়ার।
যে শহরে আড্ডা মরে যায়, সেখানে আসলে ধীরে ধীরে নাগরিক মননও শুকিয়ে যায়। আর যে শহর তার আড্ডাকে বাঁচিয়ে রাখে—সে শহর কখনো পুরোপুরি অন্ধকার হয় না।
