ময়মনসিংহ নগরের একটি পশু চিকিৎসাকেন্দ্র এখন মিলিটারি কায়দায় পরিচালিত চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের সর্বশেষ শিকার। ঘটনার কেন্দ্রে মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালহাজুর রহমান। তার নেতৃত্বে একদল ক্যাডার চেম্বারে ঢুকে চিকিৎসক আশিকুর রহমানকে লোহার রড দিয়ে পেটানো, ক্যাশবাক্স ভেঙে তিন লাখ বিশ হাজার টাকা লুট এবং আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। অপরাধের কারণ একটাই, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দিতে চিকিৎসকের অস্বীকৃতি।
সিসিটিভি ফুটেজে যে দৃশ্য ধরা পড়েছে তা রাজনৈতিক স/ন্ত্রা/সে/র পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো। এক নারী চেম্বারে ঢুকে জুতা খুলে চিকিৎসকের গায়ে আঘাত শুরু করেন। পাশে দাঁড়ানো তালহাজুর রহমান প্রথমে মুঠোফোনে ভিডিও করেন, তারপর নিজেই চড়াও হয়ে কিল ঘুষি মারেন। অর্থাৎ ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত, ভিডিও করার উদ্দেশ্যও ছিল ভুক্তভোগীকে মানসিকভাবে আরও ভেঙে দেওয়া, যেন হামলার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়। এটি নিশ্চিতভাবেই একটি সন্ত্রাসী সংস্কৃতির প্রকাশ্য প্রদর্শনী।
ভুক্তভোগী চিকিৎসকের জানান, ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বাধীন এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানাতেই প্রথমে মানসিক চাপ, পরে সরাসরি শারীরিক হামলা। হামলার সময় সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল, যেন অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা যায়। কিন্তু একটি ক্যামেরা থেকে যাওয়ায় পুরো ঘটনা ফাঁস হয়ে গেছে। চিকিৎসককে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার স্ত্রী, চেম্বারের কর্মী ঈশান আহমেদ এবং তার স্ত্রীকেও মারধর করা হয়। এই নৃ//শং/স/তা/র পরও অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, গ্রেপ্তার তো দূরের কথা।
যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, একজন সরকারি দলের সহযোগী সংগঠনের নেতার পক্ষে এমন স/ন্ত্রা/সী কর্মকাণ্ড চালানোর সাহস আসে কোথা থেকে? রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সারাদেশে চাঁদাবাজি, দখলদারি, হামলা এবং লুটপাটের ঘটনা যেভাবে বেড়েছে, তাতে বোঝা যায় দলীয় ক্যাডারদের জন্য এখন প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ নড়ে না, আসামিরা ভয় পায় না, কারণ তারা জানে দলীয় লেবেল থাকলে আইনের হাত তাদের গায়ে লাগবে না। ময়মনসিংহের এই ঘটনা তারই সর্বশেষ উদাহরণ।
অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছিল তাদের অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে জামাই আদরে রাখা হয়েছে। এতে তার প্রভাব আরও বেড়েছে। এর অর্থ দলীয়ভাবে এই ধরনের অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। ফলে একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল সবই একাকার হয়ে গেছে। আইনের দরজায় কড়া নাড়লেও লাভ নেই, কারণ লাঠিয়ালরা এখন রাষ্ট্রেরই অংশ।
এই ঘটনায় শুধু চিকিৎসক নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুরো স্বাস্থ্যসেবা খাতের পেশাজীবীদের নিরাপত্তাবোধ। একজন পশু চিকিৎসক যদি তার চেম্বারে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে দেশের সাধারণ ব্যবসায়ী, দোকানদার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কীভাবে নিরাপদ থাকবেন? ময়মনসিংহের এই ঘটনাটি দেখে আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। যদি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালেই হামলা আর লুটপাটের শিকার হতে হয়, তাহলে এই দেশে আইনের শাসন নামক জিনিসটি আর অবশিষ্ট আছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এই স/ন্ত্রা/সী/রা এখন আর আত্মগোপনে থাকে না। তারা প্রকাশ্যে চেম্বারে ঢোকে, ভিডিও করে, রড চালায়, টাকা নিয়ে চলে যায়, আর থানায় গিয়ে উল্টো ভুক্তভোগীকে হয়রানির হুমকি দেয়। স্থানীয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে সাহস পায় না। কারণ এই ক্যাডারদের পেছনে থাকে দলীয় প্রভাব, স্থানীয় নেতৃত্বের ছত্রছায়া এবং ক্ষমতার কেন্দ্রের নীরব সমর্থন। ফলে প্রতিটি ঘটনা নতুন করে প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন এখন পুরোপুরি চাঁদাবাজি ও চরমপন্থার আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে।
