১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের গ্রেফতারে নতুন ডিক্রি; সন্তানের অপরাধে ক্ষতিপূরণ দিবে অভিভাবক
মিলানে সহিংসতা ও লুটপাটের পর মেলোনি সরকারের কঠোর পদক্ষেপ,
বিক্ষোভে সহিংস অংশগ্রহণে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ২০ হাজার ইউরো জরিমানার বিধান
ইতালিতে সহিংস বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে মিলানে, সপ্তাহান্তে ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিরতার পর বিক্ষোভকারীদের জন্য কঠোর শাস্তি, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে পুলিশের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সন্তানদের ভাঙচুরের জন্য অভিভাবকদের আর্থিকভাবে দায়ী করার বিধান রেখে নতুন নিরাপত্তা ডিক্রি অনুমোদন করেছে ইতালির মন্ত্রিসভা।
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, অনুমোদিত এই ডিক্রিতে বিক্ষোভ চলাকালে সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য নতুন অপরাধের বিধান রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মুখ ঢেকে রাখলে কিংবা তাঁর কর্মকাণ্ডে কেউ আহত হলে শাস্তি আরও বাড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মেলোনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন,
“ভাঙচুর ও চুরি কোনো প্রতিবাদ নয়; এগুলো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।”
তাঁর সরকারের বক্তব্য, রাজনৈতিক দাবি আদায়ের নামে দোকানপাট ভাঙচুর, সম্পদ লুট কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার কোনো বৈধতা থাকতে পারে না।
সন্তান ভাঙচুর করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে অভিভাবকদের
নতুন ডিক্রির সবচেয়ে আলোচিত বিধানগুলোর একটি হলো অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের দ্বারা সংঘটিত ভাঙচুর ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য অভিভাবকদের আর্থিক দায় নির্ধারণ।
সরকারের ঘোষিত নীতি হলো,
যে ক্ষতি করবে, তাকে তার মূল্য দিতে হবে; আর অপরাধী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে
ক্ষতিপূরণের দায় পড়তে পারে তার অভিভাবকের ওপর।
সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি—যেমন দোকানের কাচ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা গাড়ি—ক্ষতিগ্রস্ত হলে মালিক আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের উদ্যোগ নিতে পারবেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সন্তানের যেকোনো অপরাধের জন্য অভিভাবক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব ধরনের ফৌজদারি শাস্তি পাবেন। ঘোষিত বিধানটির মূল লক্ষ্য হলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক দায় নির্ধারণ। ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে আইনি আপত্তি জানানোর সুযোগও রয়েছে বলে ইতালির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
সরকারের যুক্তি, এই ব্যবস্থা অভিভাবকদের সন্তানদের আচরণ সম্পর্কে আরও সচেতন করবে এবং কিশোরদের সহিংসতা ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে পারিবারিক দায়িত্ববোধ বাড়াবে।
বিক্ষোভে সহিংস অংশগ্রহণে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড
নতুন ডিক্রিতে বিক্ষোভের সময় সংঘবদ্ধ সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
কোনো ব্যক্তি পাঁচ বা তার বেশি সদস্যের একটি দলের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পাথর, আতশবাজি, লাঠি বা অনুরূপ বিপজ্জনক বস্তু ব্যবহার করে জননিরাপত্তা বিপন্ন করলে নতুন অপরাধের আওতায় পড়তে পারেন। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি মুখ ঢেকে পরিচয় গোপন করলে অথবা তাঁর কর্মকাণ্ডে কেউ আহত হলে শাস্তি বাড়তে পারে। সংঘবদ্ধভাবে সম্পত্তি ধ্বংস করার ক্ষেত্রেও কঠোরতর দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে নতুন অপরাধের বিধানটি সব ধরনের বিক্ষোভ বা সরকারবিরোধী বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না। এর লক্ষ্য বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত নির্দিষ্ট সহিংস কর্মকাণ্ড, যা জননিরাপত্তাকে বিপন্ন করে। ইতালির বিচারমন্ত্রীও বলেছেন, গণতন্ত্রে ভিন্নমত ও প্রতিবাদের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ; তবে তা আইনের সীমার মধ্যে থাকতে হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিষয়ে পুলিশের ক্ষমতা বাড়ছে
নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের বিষয়ে পুলিশের প্রতিরোধমূলক ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে।
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো কিশোর অপরাধ সংঘটন না করলেও তার কাছ থেকে জননিরাপত্তার জন্য বিপদের আশঙ্কা রয়েছে—এমন প্রমাণ থাকলে পুলিশ তাকে সাময়িকভাবে আটক করতে পারবে। আগে এ ধরনের প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।
ডিক্রিতে ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সীদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের তাৎপর্য বোঝার সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে, যদি না বিপরীতটি প্রমাণিত হয়। পাশাপাশি কিশোরদের আটককেন্দ্রে ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কিশোর বিচারব্যবস্থায় বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এসব পরিবর্তনের ফলে সহিংসতায় জড়িত কিশোরদের শনাক্ত করা ও বিচারের আওতায় আনা সহজ হতে পারে। তবে শিশু অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা এবং প্রতিরোধমূলক আটকের অপব্যবহার ঠেকানোর প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।
মিলানে কী ঘটেছিল?
নতুন আইন প্রণয়নের তাৎক্ষণিক পটভূমি হলো মিলানসহ উত্তর ইতালির বিভিন্ন শহরে সপ্তাহান্তে সংঘটিত সহিংসতা ও লুটপাট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার ও রবিবারের অস্থিরতায় একদল তরুণ দোকানের জানালা ও কাচ ভাঙে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালায় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। কোথাও কোথাও সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
মিলান পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে প্রায় দুই হাজার তরুণ দাঙ্গায় অংশ নিয়েছিল। সপ্তাহান্তের সহিংসতায় প্রায় ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে ৩০ জনের বেশি ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক। দুই দিনে শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
একই সময়ে মিলানের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সহিংসতার আশঙ্কায় কিছু দোকান আগেভাগে বন্ধ রাখা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও অস্থিরতা ছড়ানোর আহ্বানসংবলিত বার্তা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।
মিলানে আরও ৫০০ সেনা মোতায়েন
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সহায়তা করতে মিলানে আরও ৫০০ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে ইতালি সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত সেনারা সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সেনারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার, স্পর্শকাতর এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং পুলিশের নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহায়তা করবেন। সামনে আরও বিক্ষোভের আশঙ্কার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য, সহিংসতা পুনরাবৃত্তি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা এবং জনজীবন ও ব্যবসাবাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা নিয়ে ক্ষোভও রয়েছে
মিলানের অস্থিরতার পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থায় অর্থায়নের ঘাটতি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার বিষয়ও উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মধ্যে একপর্যায়ে সহিংস তরুণদের একটি অংশ ঢুকে পড়ে। ফলে প্রতিবাদের মূল দাবি এবং পরবর্তী ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে এক করে দেখার বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মেলোনি অর্থনৈতিক সংকট ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করলেও বলেছেন, এসব সমস্যাকে সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
অন্যদিকে, সরকারের সমালোচকেরা মনে করেন, কঠোর শাস্তি ও পুলিশের ক্ষমতা বাড়ালেই তরুণদের অসন্তোষের মূল কারণ দূর হবে না। কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির মতো বিষয়গুলোরও সমাধান প্রয়োজন।
মেলোনি সরকারের আগের নিরাপত্তা নীতির ধারাবাহিকতা
২০২২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মেলোনি সরকার আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর নীতি গ্রহণ করে আসছে। এর আগে ২০২৩ সালে কিশোর অপরাধ দমনে আইন কঠোর করা হয় এবং ২০২৫ সালে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধের শাস্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলোনি সরকারের চার বছরে ইতালির কারাগারে বন্দির সংখ্যা ১৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা প্রায় ১০ হাজার বন্দির সমান। এই প্রবণতা নিয়ে সরকারের কঠোর নিরাপত্তা নীতির কার্যকারিতা ও মানবাধিকারগত প্রভাব সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে।
নতুন ডিক্রিটি সেই নীতিরই আরেকটি সম্প্রসারণ। সরকার একে জননিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে; সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত কঠোরতা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন কী হবে?
২০ অক্টোবর অনুমোদিত ডিক্রিটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। তবে ইতালির সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, জরুরি ডিক্রিকে স্থায়ী আইনে পরিণত করতে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন; এ জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে সংসদে এর বিধানগুলো কীভাবে পর্যালোচিত হয়, পুলিশি ক্ষমতার প্রয়োগে কী ধরনের সুরক্ষা রাখা হয় এবং অভিভাবকদের ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত দায় কীভাবে বাস্তবায়িত হয়—সেদিকে নজর থাকবে।
মেলোনি সরকারের অবস্থান হলো, প্রতিবাদের অধিকার থাকলেও ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ন্যায়বিচার এবং তরুণদের অসন্তোষের মূল কারণ মোকাবিলা করাও ইতালির সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
