এক বস্তা সারের জন্য আজ কৃষককে ভোররাত থেকে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। সরবরাহ থাকার পরও সার না পাওয়ার অভিযোগ, ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, কালোবাজারি আর প্রশাসনিক হয়রানি—কৃষকের এই দুর্ভোগ আমাদের ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়কে আবারও মনে করিয়ে দেয়। ১৯৯১–৯৫ এবং ২০০১–০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলেও সারসংকট, মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্নীতির অভিযোগে কৃষকদের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল। বিশেষ করে ২০০১–০৬ মেয়াদে সার নিয়ে অব্যবস্থাপনা ও কালোবাজারির অভিযোগ কৃষকের ক্ষোভকে তীব্র করে তোলে।
১৯৯৪–৯৫ সালের সংকটের ভয়াবহতা ছিল আরও নির্মম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরিয়া উৎপাদন কমে যাওয়া, চাহিদা ভুলভাবে নিরূপণ এবং অতিরিক্ত সার রপ্তানির কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ইউরিয়া রপ্তানি বেড়েছিল ৫২ শতাংশ।
 ১৯৯৫ সালের মার্চে সারের দাবিতে বিক্ষোভরত কৃষকদের ওপর পুলিশের গুলিতে অন্তত ১২ জন নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম UPI। সরকারি দামে ৫০ কেজি সারের বস্তা যেখানে ২৩০ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে বাজারে দাম উঠেছিল ৮০০ টাকায়।
২০০১–০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলেও সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রথম আলো-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের একটি গ্রন্থে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ডিলার নিয়োগ, সার মজুত করে রাখা এবং নির্ধারিত এলাকায় সরবরাহ না করে বেশি দামে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ উঠে আসে।
২০০৬ সালে ইউরিয়ার মজুত তলানিতে পৌঁছানো এবং সারের দাবিতে কৃষকদের দেশজুড়ে বিক্ষোভের কথাও সমসাময়িক প্রতিবেদনে উঠে আসে। আজকের কৃষকের দুর্ভোগ তাই শুধু এক বস্তা সারের সংকট নয়—এটি অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রশ্নও। কৃষককে সার পাওয়ার জন্য রাত জাগতে হবে কেন? উৎপাদনের মৌসুমে সার না পেয়ে তাঁর ফসল নষ্ট হবে কেন? ডিলার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগের বোঝা সাধারণ কৃষকই বা বইবেন কেন? কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্য জোগান আসে; অথচ সেই কৃষককেই যদি সার পাওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, তবে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।
