হরমুজ আলী
খবরটি বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মোটেই বড়ো কোনো খবর নয়। কিন্তু, ঐ যে ‘সিঁদুরে মেঘ দেখার’ একটা ভয় তো আছেই।
ঘটনাটি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের। যুক্তরাজ্য প্রবাসী শওকত আলী তার বাচ্চার জন্মদিন উপলক্ষে নিজ বাড়িতে একটা বাউল গানের আসর বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন, প্রচারও হয়েছিলো কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আপত্তির মুখে স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে মেয়েদের প্রীতি ফুটবল খেলাও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
আমাদের বৃহত্তর সিলেটের, সুনামগঞ্জ তো বটেই, রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রগতিশীলতার বিচারে অন্যতম প্রাগ্রসর উপজেলা হচ্ছে দিরাই। এখানে যেমন জাতীয় নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতো রাজনৈতিক নেতার জন্ম হয়েছে, কমরেড হেনা দাসের মতো ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রীও এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন। বৃহত্তর সিলেটের অন্যতম শ্রদ্ধেয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা, সারাজীবন ন্যাপের রাজনীতি করে শেষ জীবনে এসে বিএনপি থেকে এমপি হয়ে মৃত্যুবরণ করা গোলজার আহমেদ এর জন্ম হয়েছে এই হাতিয়া গ্রামেই। বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম মহীরুহ আব্দুস সামাদ আজাদ পার্শ্ববর্তী জগন্নাথপুরে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর রাজনীতির একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে দিরাই কেন্দ্রিক, এখান থেকে তিনি সংসদ সদস্যও হয়েছেন। কমরেড বরুণ রায়ের (প্রসূন কান্তি রায়) মতো দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদ পার্শ্ববর্তী জামালগঞ্জে জন্মগ্রহণ করলেও দিরাই ছিলো তাঁর অন্যতম কর্মস্থল। অন্যদিকে শাহ আবদুল করিম এর মতো বাউল সম্রাটের জন্ম এই হাতিয়ার পার্শ্ববর্তী ধল গ্রামে, বিশিষ্ট বাউল শিল্পী শফিকুন নূরও এই দিরাই এরই সন্তান।
এই দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকার কারণ আর কিছু নয়, একটা প্রগতিশীল জনপদ দেখতে-দেখতে কীভাবে প্রতিক্রিয়াশীলতার অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, সেই কষ্টবোধ। এছাড়া তো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল, আক্রমণ, অপমান বিনাবাধায় চলছে দিরাই-শাল্লায়।
আমার ভয়, প্রতিবারের মতো আগামী ফাল্গুনের ১ তারিখে শুরু হবে ধল মেলা, যা করিম শাহের জন্মস্থান ধল গ্রামে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। এই ধরনের মেলায় চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতির সকল উপাদানই থাকে। বাউলগান তো অতি অবশ্যই এর প্রধান অনুষঙ্গ। হাতিয়ায় যা ঘটে গেলো – এটা ধল মেলা বন্ধের কোনো প্রাক রিহার্সাল নয়তো! না-হলে স্বস্তি পাবো। বাটপার ইউনুসের রেখে যাওয়া আর একই দর্শনে চলা বিএনপি-জামাতের জামানায় কিছুই যে অসম্ভব না, তা-তো দেখতেই পাচ্ছি।
লন্ডন, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
