দেশত্যাগের পর প্রথমবারের মতো বিশদ পরিসরে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সরকার উৎখাতের ঘটনাকে ‘সুসংগঠিত অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন।
সিএনএন-নিউজ১৮-এর মনোজ গুপ্তকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারেরর নামে পরিচালিত একটি ষড়যন্ত্র, যার পেছনে উগ্রবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী জড়িত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের মদদে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
শেখ হাসিনা তাঁর শাসনকালের সাফল্যের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, পশ্চিমা হস্তক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ এড়িয়ে গেছেন এবং আতিথেয়তার জন্য ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তিনি সেনাবাহিনীতে সংশয়, বিদেশি চাপ এবং বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি নিয়েও কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকার পর্ব
প্রশ্ন: দেশ ছাড়ার পেছনে ঠিক কী ধরনের গোয়েন্দা তথ্য বা হুমকির ইঙ্গিত পেয়েছিলেন আপনি? এটা কি আসলেই কোনো সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা ছিল, নাকি প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, নাকি আপনার নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর নীরব সম্মতিতে একটি পরিকল্পিত ও “জোরপূর্বক দেশত্যাগ” এর ঘটনা ছিল?
শেখ হাসিনা: আগস্টের শুরুতেই একসময়কার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভগুলো আইনশৃঙ্খলাহীন এক অরাজক অবস্থায় পরিণত হয়। বিক্ষোভের নেতৃত্বে দেখা যায় সহিংস উগ্রগোষ্ঠীদের। শুরুতে এটি ছিল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন, কিন্তু পরে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেয়। ষড়যন্ত্রের পরিধি কত বড় ছিল, তা আমরা পরে বুঝতে পারি। যখন ড. ইউনূস গত বছরের সহিংসতার সব অপরাধীদের দায়মুক্তি দেন এবং আমার গঠিত তদন্ত কমিটি বাতিল করেন, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়—আমার সরকারকে উৎখাতের একটি পরিকল্পনা আগে থেকেই তৈরি ছিল।
তখন দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত ছিল টিকে থাকার প্রশ্ন। আমি যেতে চাইনি, কিন্তু আমাকে জানিয়ে দেওয়া হয়—থাকলে শুধু আমার জীবন নয়, আমার চারপাশের- পরিবার, স্বজন, দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দের প্রাণহানির ঘটনা ঘটাতে প্রস্তুত উগ্রবাদীরা।
প্রশ্ন: সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আপনার দেশত্যাগে কতটা ভূমিকা রেখেছিলেন? আপনি কি মনে করেন, তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করেছিলেন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপে, নাকি রক্তপাত এড়াতে ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকায় ছিলেন?
শেখ হাসিনা: সেনাবাহিনী তখন এক অসম্ভব পরিস্থিতিতে ছিল। একদিকে সাংবিধানিক সরকারকে রক্ষা করতে হচ্ছিল, অন্যদিকে ছিল উন্মত্ত সহিংস জনতা। আমরা মূলত আলোচনা করেছি কীভাবে আইনশৃঙ্খলার পূর্ণ ভাঙন রোধ করা যায় এবং আমার পরিবার, কর্মী এবং ঢাকার সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কোনো বাইরের চাপ বা প্রভাব তখন সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছিল কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।
প্রশ্ন: আপনি কি তখন জানতেন যে, আপনার দেশ ছাড়ার পর “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছদ্মবেশে” নতুন ক্ষমতা কাঠামো বসানোর পরিকল্পনা ছিল? থাকলে, কারা ছিল এই পরিকল্পনার মধ্যস্থতাকারী?
শেখ হাসিনা: তখন আমি কোনো সমন্বিত পরিকল্পনার বিষয়ে জানতাম না। আমি শুধু দেশ ও জনগণের নিরাপত্তা নিয়েই চিন্তিত ছিলাম। ৫ই আগস্টের ঘটনার পরই বুঝতে পারি, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত অভ্যুত্থান ছিল। যেভাবে ইউনূস দ্রুত ক্ষমতা দখল করলেন, অপরাধীদের তাৎক্ষণিক দায়মুক্তি দিলেন এবং বিচারিক তদন্ত কমিটি ভেঙে দিলেন—এসবই ইঙ্গিত দেয় যে সবকিছু আগে থেকেই সাজানো ছিল। মনে হয়, ইউনূস নিজেই বা যারা তাঁকে বসিয়েছে, তারা অনেক আগেই ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি নিয়েছিল।
প্রশ্ন: আপনি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কীভাবে দেখেন? তারা কি শুধু রাজনৈতিক সংস্কারের বার্তা দিচ্ছিল, নাকি “গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা”র নামে আপনাকে সরাতে চাওয়া সামরিক ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করছিল?
শেখ হাসিনা: যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো সরকারের সঙ্গে আমাদের সবসময়ই ভালো সম্পর্ক ছিল। তাই আমি মনে করি না, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। ড. ইউনূস অর্থনীতিবিদ হিসেবে তার কাজের মাধ্যমে পশ্চিমে অনেক প্রভাবশালী সমর্থক পেয়েছিলেন। কিন্তু যারা তার প্রশংসা করতেন, তারা তার অর্থনৈতিক তত্ত্বকেই ভুল করে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রমাণ ভেবেছিলেন। এখন সেই ভুল ধারণা দূর হচ্ছে। তারা দেখতে পাচ্ছেন, ইউনূস আসলে একজন অনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান—যিনি তার মন্ত্রিসভায় উগ্রপন্থীদের বসিয়েছেন, বাংলাদেশের সংবিধান ভেঙেছেন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় নীরবতা পালন করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যার সঙ্গে আমার ঊষ্ণ সম্পর্ক আছে, প্রকাশ্যেই ইউনূসের প্রতি তার অনাগ্রহ ব্যক্ত করেছেন।
প্রশ্ন: আপনার শেষ সময়ে চীন কি কোনো পরামর্শ দিয়েছিল বা নীরব সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছিল? বাংলাদেশের বর্তমান সামরিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি চীনের অবস্থান আপনি কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক আমরা সবসময়ই বাণিজ্য ও নিরাপত্তার স্বার্থে গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে প্রতিবেশীদের আমাদের প্রতি আস্থা থাকতে হয়। কিন্তু অনির্বাচিত ইউনূস সরকার ক্ষমতায় থাকায় এবং অস্থিতিশীল বৈদেশিক ও বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করায় সেই আস্থা এখন হুমকির মুখে। আমার আশা, একটি বৈধ, জনগণের প্রতিনিধি সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবারও একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে তার অবস্থান ফিরে পাবে।
প্রশ্ন: আপনার দেশত্যাগের পর ভারতীয় সংস্থা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব আপনাকে কীভাবে দেখছে—একজন কৌশলগত অংশীদার হিসেবে, নাকি নতুন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বোঝা হিসেবে?
শেখ হাসিনা: ভারত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু। আমি ভারতীয় জনগণের আতিথেয়তার জন্য আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে ভারত চায় ঢাকায় একটি স্থিতিশীল, বৈধ ও গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হোক, যা জনগণের সমর্থনে পরিচালিত হবে। ইউনূসের সঙ্গে দিল্লির টানাপোড়েনের কারণ আমি নই। সেটি তার উগ্রপন্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষাদানে ব্যর্থতা এবং তার প্রশাসনের ভারতবিরোধী বক্তব্যের ফল। এসবই এক অনভিজ্ঞ নেতার আচরণ, যিনি আমাদের অংশীদারিত্বের মূল্য বোঝেন না। আমি কৃতজ্ঞ ভারত সরকারের ধৈর্যশীল অবস্থানের জন্য—তারা অপেক্ষা করছে এমন একজন নেতার জন্য, যিনি যথাযথ ক্ষমতা ও দক্ষতা নিয়ে বাংলাদেশকে আবার স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
প্রশ্ন: আপনি কি আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরার কথা ভাবছেন, নাকি আওয়ামী লীগের প্রবাসী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলে প্রভাব ও বৈধতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন?
শেখ হাসিনা: আমি সারা জীবন বাংলাদেশকে উন্নত করার জন্য কাজ করেছি। আমাদের ১৫ বছরের শাসনামলে আমরা বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত করেছি, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিয়েছি, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ফলপ্রসূ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়েছি এবং লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছি।
তবে আওয়ামী লীগ কখনোই শুধু আমার বা আমার পরিবারের দল নয়। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মাটিতে গভীরভাবে প্রোথিত একটি সংগঠন। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী যারা, তাদেরকে আওয়ামী লীগের কথা শুনতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য প্রয়োজন সংবিধানসম্মত শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া—স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে।
প্রশ্ন: আপনি মনে করেন, ড. ইউনূস এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্পে কতটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখছেন? তিনি কি পশ্চিমা শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি “নাগরিক প্রতিনিধি” নাকি কেবল আওয়ামী লীগবিরোধী বৃহত্তর জোটের প্রতীক?
শেখ হাসিনা: এটা গোপন নয় যে, ইউনূস আগে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রভাবশালী মহলে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন—তার আগের অর্থনৈতিক কাজের জন্য। কিন্তু তিনি কোনো গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রতীক নন, কিংবা তার পক্ষে কোনো বড় জনসমর্থনও নেই। তিনি একজন অনির্বাচিত ব্যক্তি, যিনি এখন এমন একটি দলকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চাইছেন—যে দলটি অতীতে নয়বার নির্বাচিত হয়েছে, এবং যে দলটিকে দেশের কোটি কোটি মানুষ সমর্থন করে।
যদি পশ্চিমারা মনে করে, ইউনূস তাদের “নিজস্ব প্রতিনিধি”, তাহলে তারা প্রতারিত হচ্ছে। বাস্তবে, তিনি তার প্রশাসনের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিমাত্র—যারা প্রতিশোধপরায়ণ, সাম্প্রদায়িক ও সামাজিকভাবে পশ্চাৎমুখী নীতি বাস্তবায়ন করছে।
প্রশ্ন: আপনি ভারতের কাছ থেকে কি কোনো সুনির্দিষ্ট সহায়তা আশা করছেন—রাজনৈতিক আশ্রয়, আন্তর্জাতিক পরিসরে কূটনৈতিক তদবির, নাকি বাংলাদেশের ভেতরে আওয়ামীপন্থী পরিবেশ পুনর্গঠনে গোপন সহায়তা?
শেখ হাসিনা: ভারত ইতিমধ্যেই আশ্রয় ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়টি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। আওয়ামী লীগের বাংলাদেশে নতুন করে সংগঠন গড়ার প্রয়োজন নেই—কারণ এই দলের এখনও কোটি কোটি সাধারণ মানুষের সমর্থন রয়েছে। আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক গভীর এবং ঐতিহাসিক, যা সহজে বদলাবে না। আমরা ভারতের কাছে শুধু এইটুকুই চাই—সে যেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পাশে থাকে, যারা নিজেদের সরকার নিজেরাই বেছে নিতে চায় এবং ইউনূস প্রশাসনের বৈরিতাকে উপেক্ষা করে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে।
প্রশ্ন: আপনার মতে, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো বিদেশি টানাপোড়েনের (যুক্তরাষ্ট্র-চীন) ভেতর পড়ে কোনো সামরিক-ইসলামপন্থী শাসনব্যবস্থার দিকে যেতে না দেওয়ার জন্য ভারত ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ কী হতে পারে?
শেখ হাসিনা: আমি আগেও বলেছি—আমার আশঙ্কা, ইউনূস আসলে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরপন্থী উগ্রবাদী জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রিত এক সরকারের প্রতিনিধি মাত্র। আমি ভারতের বন্ধুদের অনুরোধ করব, তারা যেন ইউনূসের ওপর চাপ বজায় রাখে, যাতে তিনি স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বাধ্য হয় এবং দেশের কোটি কোটি মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে না পারেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ হলো—জনগণের সম্মতিতে নির্বাচিত একটি বৈধ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। সেটিই আমাদের দেশকে ভবিষ্যতে অবনতিশীল শাসনব্যবস্থা থেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
