জাতিসংঘের বক্তব্য- শাহরিয়ার কবিরের আটক বেআইনি, দ্রুত মুক্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি
জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন আরবিট্রারি ডিটেনশন’ (ডব্লিউজিএডি) তাদের ১০৩তম অধিবেশনের সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরের আটক সম্পূর্ণভাবে বেআইনি এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাপক শাহরিয়ার কবিরকে গত বছরের ১৭ই সেপ্টেম্বর আটক করেছে।
জাতিসংঘের সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশ সরকার ন্যায়বিচার ও সঠিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ
প্যারাগ্রাফ 65, 73, 74 ও 85: শাহরিয়ার কবিরের স্বাধীনতা হরণকে বেআইনি বলা হয়েছে। এটি চারটি শ্রেণিতে পড়ে:
আইনগত ভিত্তি ছাড়া আটক
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন
ন্যায়বিচারের অধিকার লঙ্ঘন
বৈষম্যমূলক মামলা ও হয়রানি
প্যারাগ্রাফ 51: ইউনূস সরকার যে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনেছে, তা শুধুমাত্র তাঁর একটি টিভি টকশোকে ভিত্তি করে। সেখানে নাকি তিনি সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছেন। জাতিসংঘ বলেছে, শুধু টেলিভিশনে কথা বলাকে এমন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়। সরকারও কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি যে তাঁর বক্তব্যে সহিংসতা ঘটেছে।
প্যারাগ্রাফ 54: রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা ব্যবহার করে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। ফলে তাঁর গ্রেপ্তার এবং আটক রাখার কোনো আইনি ভিত্তি নেই।
প্যারাগ্রাফ 69: তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে—যা মানবাধিকার সনদের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের হস্তক্ষেপের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
প্যারাগ্রাফ 77: তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যূনতম অধিকারগুলো দেওয়া হয়নি।
আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত ছিল
আত্মপক্ষ প্রস্তুতির সময় দেওয়া হয়নি
বিচার বিলম্বিত হয়েছে
জামিন প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে
১১ মাসেরও বেশি সময় বিচার শুরু না করে তাঁকে আটক রাখা আন্তর্জাতিক নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
প্যারাগ্রাফ 79: তাঁর প্রতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখার জন্য জাতিসংঘ এই মামলাটি নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদকের কাছে পাঠিয়েছে। সরকার পরিস্থিতি ঠিক করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্যারাগ্রাফ 80: আদালতে হাজির করার সময় তাঁকে উগ্র জনতার হাত থেকে রক্ষা করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর কাজ এবং মতামতের কারণে এমন হামলার আশঙ্কা ছিল, যা মোকাবিলা করা পুলিশের দায়িত্ব ছিল।
প্যারাগ্রাফ 82: আটক রাখাকে বৈষম্যমূলক বলার জন্য প্রয়োজনীয় সূচকগুলো এই মামলায় পাওয়া গেছে। পূর্বে হয়রানি, একই মতাদর্শের অন্যান্য মানুষের ওপর চাপ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট ছিল।
প্যারাগ্রাফ 84: শান্তিপূর্ণভাবে অধিকার চর্চার ফলেই তাঁকে আটক করা হয়েছে। রাজনৈতিক মতের কারণে আটক রাখাকে বৈষম্য হিসেবে গণ্য করা হয়—আর সরকার এই অভিযোগ খণ্ডাতে পারেনি।
জাতিসংঘের সুপারিশ
শাহরিয়ার কবিরকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
তাঁকে ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় প্রতিকার দিতে হবে।
ইচ্ছাকৃতভাবে বেআইনি আটক করার ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত করতে হবে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
জাতিসংঘ শাহরিয়ার কবিরের অবনতিশীল স্বাস্থ্যের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে এবং বলেছে, যাকে আটক রাখা হবে তাকে মানবিক আচরণ ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা রক্ষার জরুরি প্রয়োজনকে সামনে এনে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি এই সুপারিশ বাস্তবায়ন মনিটর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
