আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সারা বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল ধারার সৎ ও আপোসহীন সাংবাদিকরা আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি শারিরিক, মানসিক নির্যাতনসহ অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারান্তরীন আছেন। মিডিয়া হাউসগুলো দখল করা হয়েছে। চাকুরিচ্যুত করা হয়েছে অসংখ্য সাংবাকিদদের। শারিরিক, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন সাংবাদিকরা। এর আগে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার গত বছর সাংবাদিকদের জন্য সারাবিশ্বের সবচেয়ে ঝূকিপূর্ণ অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ঘোষনা করেছিল।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদের পাশাপাশি তাদের হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধের দাবি জানালেও এসবে পাত্তা দিচ্ছেইনা ড.ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এবার আবারো আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাধীন সংস্থা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে ইউনূস সরকারের সময়ে কারান্তরীণ সাংবাদিকদের মুক্তি ও তাদের কাজে ফেরার সুযোগ দানের জরুরি ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে অংশ নেওয়া দেড় হাজারেরও বেশি সাংবাদিক বাংলাদেশের কারান্তরীন সাংবাদিকদের মুক্তি ও তাদের নিরাপত্তার দাবিতে সংহতি জানিয়েছেন বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস (১০ ডিসেম্বর) উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে এক বিশেষ চিঠি পাঠিয়ে সিপিজে এই জোরালো দাবি জানায়।
চিঠিতে হত্যা মামলায় আটক চার সাংবাদিকের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করে সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, এ সকল মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এবং অভিযোগগুলোতে ‘বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের ঘাটতি’ রয়েছে। সিপিজের দাবি, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার আসলে সংবাদ প্রচার ও রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা।
চিঠিতে কাশিমপুর কারাগারের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। পরিবারের মাধ্যমে পাওয়া বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলা হয় সাংবাদিকদের ৩৬ বর্গফুটের একটি ছোট কক্ষে লোহার শিকের দরজার পেছনে থাকতে হচ্ছে; শীত ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি রয়েছে; গদি ছাড়া কংক্রিটের মেঝেতে ঘুমাতে হয়; এবং যে খাবার দেওয়া হয় তা কম ও নিম্নমানের।
সিপিজে জানায়, কারাবন্দি কয়েকজন সাংবাদিক ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো গুরুতর অসুস্থতায় ভুগলেও কারাগারে নিয়মিত চিকিৎসকের উপস্থিতি নেই। পরিবার থেকে ওষুধ পাঠানো ছাড়া চিকিৎসার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
চিঠিতে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে দ্য ডেইলি স্টার-কে দেওয়া ড. ইউনূসের একটি সাক্ষাৎকারেরও উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে পূর্ববর্তী সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি হত্যা মামলা দিয়েছিল; তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সে ধারা বন্ধ করে মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছে।
তবে সিপিজে বলছে, গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরও চার সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত নতুন করে হত্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং তাদের বারবার জামিন নাকচ করা হয়েছে। এমনকি তাদের আইনজীবী জেড আই খান পান্নাকেও একটি হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত, এবং দেশটি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)-এর সদস্য, যেখানে একই অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে সিপিজে সব কারাবন্দি সাংবাদিককে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানায় এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সব রাজনৈতিক দলকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্মান করার আহ্বান জানায়। এছাড়া, চলতি বছর মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম কনফারেন্সে অংশ নেওয়া দেড় হাজারেরও বেশি সাংবাদিক এই আহ্বানে সংহতি জানিয়েছেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
