সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করে এমন মানবাধিকার সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধে ইউনূস সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অশনি সংকেত।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হওয়া সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীরের অবিলম্বে মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংগঠনটি বলেছে, মতপ্রকাশের কারণে ব্যক্তিদের নিশানা করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা।
গত ১৮ই ডিসেম্বর, বুধবার অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি বছরের মে মাসে অন্তর্র্বতী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে এই আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ তালিকায় সাংবাদিক মনজুরুল আলম পান্নার নামও রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহারের বিষয়টিকে লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আনিস আলমগীরকে গ্রেপ্তার ও পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়ার ঘটনায় দেশে-বিদেশে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। দেশের সাংবাদিক সংগঠন, সম্পাদক পরিষদ, পেন বাংলাদেশ ও কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এটিকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত হিসেবে আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে তার নিঃশর্ত মুক্তি ও হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
সংগঠনগুলোর মতে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে আটকে রাখা এবং পরে মামলা দেওয়া অতীতের দমন-পীড়নের স্মৃতি জাগায়।
গত ১৫ই ডিসেম্বর ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত আনিস আলমগীরকে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে শনিবার তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
জুলাই রেভ্যুলেশনারি অ্যালায়েন্সের কেন্দ্রীয় সংগঠক আরিয়ান আহমেদ উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করেন, আনিস আলমগীর টেলিভিশন টকশো ও সামাজিক মাধ্যমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছেন। মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, এসব বক্তব্যের ফলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা উৎসাহিত হয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে আদালতে আনিস আলমগীর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি একজন সাংবাদিক হিসেবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছেন মাত্র। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কথা বলেননি এবং তার বক্তব্য ও টকশোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ফাঁসানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমি হালুয়া-রুটির ভাগীদার নই,’ এবং অভিযোগ করেন, তাকে হয়তো সরকারের অনুসারী বানাতে এমন প্রতিহিংসামূলক মামলা দেওয়া হয়েছে।
আনিস আলমগীরের পাশাপাশি জাতীয় প্রেসক্লাবের পাঁচবারের সভাপতি সাংবাদিক শওকত মাহমুদও বর্তমানে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কারাগারে রয়েছেন। রমনা থানার এক মামলায় আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেন। মামলায় তার বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। আদালতে শওকত মাহমুদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
এছাড়া গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দৈনিক কালবেলার উপজেলা প্রতিনিধি মেহেদী হাসানকেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। এভাবে সারাদেশে এই আইনের অপব্যবহার করছে সরকার আর সাংবাদিকদের টুটি চেপে ধরেছে।
আইনজীবীদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন মূলত জঙ্গিবাদ ও সহিংস সন্ত্রাস দমনের জন্য প্রণীত। মতপ্রকাশ বা সাংবাদিকতার কারণে এই আইনে মামলা করা আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং উগ্রবাদ দমন। আইনটি ২০১২ ও ২০১৩ সালে সংশোধিত হয়। সংশোধনী অনুযায়ী, সন্ত্রাসী কর্মকা-ে মৃত্যুর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ-। সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য ও ডিজিটাল প্রমাণ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এ আইনের অধীনে অপরাধগুলো আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
