আসন্ন ত্রায়োদশ সংসদ নির্বাচনে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধি আওয়ামীলীগকে ছাড়া নির্বাচন সফল হবে না এবং আওয়ামীলীগবিহীন এ নির্বাচনকে একটি ‘মঞ্চস্থ নাটক’ বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও উপদেষ্টা এবং ‘কার্যত মুখপাত্র’ হয়ে উঠা সজীব ওয়াজেদ জয়।
মঙ্গলবার কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার সিরিজ “Bangladesh: A Democratic Test”-এর দ্বিতীয় পর্বে প্রচারিত স্বাক্ষাৎকারে তিনি দলের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্যে এ চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন।
আসন্ন ত্রায়োদশ সংসদ নির্বাচনকে জয় ‘মঞ্চস্থ নাটক’ বলে বর্ণনা করেন এবং বয়কটের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন “যদি আপনি এখন কী ঘটছে তা দেখেন, এই একই পর্যবেক্ষকরা কেন কিছু বলছেন না? প্রধান দল (আওয়ামীলীগ) এর নির্বাচন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন অনলাইনে পোস্টাল ব্যালট, শত শত পোস্টাল ব্যালট ভর্তি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।”
ওয়াশিংটন ডিসি’তে আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈনের নেওয়া এ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগের ভূমিকা, দলের নিষিদ্ধকরণ, নির্বাচন বয়কট, দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও দলটির ভবিষ্যত এ নেতাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার প্রয়াশ চালিয়েছেন।
জুলাই গণ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগের অবস্থান স্পষ্ট করলেন জয়
আওয়ামী লীগ কী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থী- এ সম্পর্কে জয় বলেন, “আমি অনলাইনে বারবার স্বীকার করেছি যে, আওয়ামী লীগ আন্দোলনকে ভুলভাবে সামলেছে। আমাদের সরকার আন্দোলনকে ভুলভাবে সামলেছে।”
শেখ হাসিনার নির্দেশে হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করেছে- সাংবাদিক জৈনে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কোন হত্যাকাণ্ডই আমার মা নির্দেশ দেননি। যদি আমার মা আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে চাইতেন, তাহলে তিনি এখনও ক্ষমতায় থাকতেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরিস্থিতি খুব সহিংস ছিল এবং কিছু পুলিশ অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। সরকার তখন অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করেছে এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। শেখ হাসিনা আবু সাঈদের পরিবারের সাথে দেখা করে তার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন’।
শেখ হাসিনার অডিও ক্লিপ ও ইউএন প্রতিবেদন প্রসঙ্গ
অডিও ক্লিপ নিয়ে তিনি বলেন, “আল জাজিরা ও বিবিসি ক্লিপ প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে অন্য কোন ফোন রেকর্ডিং জুড়ে দিয়েছে। রেকর্ডিং আছে—আমার মায়ের বক্তব্য, হ্যাঁ, বারবার, এবং আমার কাছে, সেদিন আমাদের কথোপকথন ছিল: তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল করছে। আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রধানমন্ত্রীর রক্ষীরা তাকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু যদি তা হয়, তাহলে শত শত মানুষ মারা যাবে। আমার মা বলেছিলেন, তিনি চান না তাদের রক্ত হাতে লেগে থাকুক। সেই সময়, শত শত পুলিশ অফিসার নিহত হয়েছিল। আমাদের শত শত কর্মীও নিহত হয়েছিল। কিন্তু এই সরকার বিক্ষোভকারীদের হত্যার জন্য দায়মুক্তি দিয়েছে।”
ইউএন রিপোর্টকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন “এই রিপোর্টে সরকার পতনের পরের (৫ই আগস্টের পরের) হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত। সরকার পতনের পর নিহত ৫০০ জনের কী হবে? তাদের কে হত্যা করেছে? কেন সমর্থক ছিল—কে তাদের হত্যা করেছে? আবার, সম্মানের সাথে বলতে গেলে, আপনি ১৪০০ জনের সংখ্যা সম্পর্কে কথা বলছেন। দেখুন, ন্যায়বিচার সমান হওয়া উচিত। একতরফা বিচার আপনার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা কাউকে দায়মুক্তি দেইনি। আমরা সবার জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছিলাম।
আওয়ামীলীগের নিষিদ্ধকরন প্রসঙ্গে জয়
আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধকরণ প্রসঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয় এটিকে ‘অগণতান্ত্রিক’ এবং ‘অবৈধ’ হিসাবে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
রাজনৈতিক দলকে নিষেধাজ্ঞা খারাপ প্রক্রিয়া কিন্তু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ ছিল- এ মন্তব্যের জবাবে সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘এটা সত্য অভিযোগ, কিন্তু আপনি ফ্যাক্টগুলো দেখুন। প্রথমত, আমরা কখনো কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করিনি। তৃতীয় পক্ষের করা আপিলের মাধ্যমে আদালত এ রায় দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, জামায়াতের সংবিধান আমাদের সংবিধানের সাথে সংঘর্ষিক’।
‘হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ সরকার কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি’ বলে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন জয়।
আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনসহ প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের অভিযোগ করেছিল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এমনকী নির্বাচনও অবাধ, সুষ্ঠু ছিলনা- এমন প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘না, না, আমি সব শুনেছি। দেখুন, যদি আপনি ২০১৮ নির্বাচনের আগে দেখেন, আমাদের দলীয় জরিপ, আমেরিকান জনমত জরিপ দেখিয়েছে, আওয়ামী লীগ ভূমিধ্বস জয় পাবে। আমরা একটা ক্লিন নির্বাচন চেয়েছিলাম কারণ জানতাম যে, আমরা জিততাম। আমাদের দলের জন্য জরিপ আমি নিজে চালাই। আমরা ৩০০ টির মধ্যে ১৬০টি নির্বাচনী এলাকা জরিপ করেছি, সেখানে আমরা ৩০ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলাম। তাই একদম কোনো কারণ ছিল না অনিয়ম করার’।
‘আমাদের কেউ অনিয়ম চায়নি, প্রশাসনে লোক ছিল যারা নিজেরাই এটা করেছে। আমার মা এবং আমি দলের পক্ষ থেকে, আমরা ক্ষিপ্ত ছিলাম’ বলে সেসময় পরিস্থিতি কথা স্মরণ করিয়েছিলেন সজীব ওয়াজেদ।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ নির্বাচনে বিরোধীদল ছিল না, এখানে কোনো কারচুপিও হয়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে নির্বাচন আমাদের বিরোধীদল বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল’।
বিরোধীদল বয়কট করেছে নির্বাচনী পরিবেশ অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না, ইসি দখল করা এমন অভিযোগ তুলে- এ প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন আমাদের সরকার দ্বারা নয় বরং একটি কমিটি সেটা ঠিক করেছিল। যদি এখন আপনি দেখেন কী হচ্ছে, কেন এই একই পর্যবেক্ষকরা কিছু বলছেন না? প্রধান রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে নির্বাচন হচ্ছে। অনলাইনে এখন প্রমাণ আসছে শত শত পোস্টাল ব্যালট পাওয়া যাচ্ছে….’।
আপনি বলেছেন আমরা আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হতে দেব না, এ কারণে যদি সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘আমাদের প্রতিবাদে ক্র্যাকডাউন করে, তাহলে সেটা সহিংসতায় পরিণত হবে। আমি সতর্ক করছি। যখন আপনি কাউকে কোণঠাসা করেন, আর কী হবে? আমরা সহিংসতা চাই না। আমরা প্রতিবাদ করতেও অনুমতি পাচ্ছি না। আওয়ামী লীগ এখন কী সহিংসতা করছে ?”
তবে আওয়ামী লীগ তো হুমকি দিচ্ছে নির্বাচন প্রতিহত করার- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ সেটা আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি কাউকে কোণঠাসা করেন, আপনি তাদের কোনো জায়গা না দেয় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তখন তারা কী করবে?’’
আওয়ামী লীগ তাদের প্রতিবাদকারীদের বলতে পারে কোন অবস্থাতেই সহিংসতায় জড়ানো যাবে না– আল-জাজিরা এমন প্রশ্নের জবাবে সজিব ওয়াজেদ বলেন, ‘গত জুলাইয়ের প্রতিবাদ থেকে আমাদের শত শত কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ৩০ জনের বেশি নেতাকে জেলের মধ্যে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের একজন হিন্দু নেতাকেও গত সপ্তাহে জেলে হেফাজতে হত্যা করা হয়েছে’।
‘আপনি কাউকে বলপূর্বক দমন করবেন, আপনি তাদের অন্য কোনো জায়গা দেবেন না, তখন তারা কী করবে?’ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন সজীব ওয়াজেদ জয়।
আপনার দৃষ্টিভঙ্গিতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার যোগ্য এমন প্রশ্ন করলে সজীব ওয়াজেদ পাল্টা বলেন, ‘আমি সহিংসতার হুমকি দেইনি। আমি বলেছি যে যদি আপনি প্রতিবাদগুলোকে দমন করেন, অবশ্যই সহিংসতা হবে। আমরা কাউকে আক্রমণ করতে বলিনি’।
দূর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে
দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে জয় বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা। কোনো অবৈধ সম্পত্তি নেই। এটাই আমার একমাত্র বাড়ি। আমি এই বছরের শুরুতে মার্কিন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলাম এবং পেয়েছি। এখন, যদি আমার কাছে গোপন সম্পদ, সমস্ত অবৈধ সম্পত্তি থাকত, তাহলে আমি কীভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পেতাম? এফবিআই আমাকে তদন্ত করত। কোথায়? অভিযোগ তোলা সহজ। তারা একটি ব্যবসার নামও বলতে পারেনি, এমন একটি উদাহরণও যেখানে আমার পরিবার কোনও কর্পোরেট মামলায় জড়িত।”
তিনি যোগ করেন “কিন্তু যেকোনো দেশে, দুর্নীতি ১০০% নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। আমরা চেষ্টা করেছি—অনেক লোককে বিচারের আওতায় আনার। কিন্তু আবার, আমার মা উন্নয়নের দিকে মনোনিবেশ করেছিলেন। ”
সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী (জাভেদ) এর ৩৬০ বাড়ির অভিযোগ নিয়ে বলেন, “তার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনেক সম্পত্তির মালিক।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় প্রসঙ্গে জয়
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার ও রায় প্রসঙ্গে বলনে “আপনি এখন আপনার মায়ের দোষী সাব্যস্ত করার কথা বলছেন। আজ বাংলাদেশে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে সাজা দেওয়া হচ্ছে, তাই না? যা একটি প্রহসন ছিল। আমার মাকে তার নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। তাই আইন পরিবর্তন করা হয়েছিল, যা এই শাসনব্যবস্থাও, যাতে সংসদ ছাড়া সেই বিচার সম্ভব হয়। আপনি আইন পরিবর্তন করতে পারবেন না। ”
আওয়ামীলীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে যা বললেন জয়
শেষে জয় বলেন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আছে—এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বৃহত্তম দল, ৪০-৫০% ভোটারের সমর্থন।
শেখ হাসিনার অবসর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ উনি প্রবিন। আমার মায়ের বয়স হয়েছে। জীবনের একটি পর্যায়ে এসে প্রত্যেকেরই বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। বর্তমান মেয়াদের পরেই অবসর নেওয়ার বিষয়ে তাঁর নিজের আগ্রহ ছিল। সম্ভবত তিঁনি আর রাজনীতিতে ফিরবেন না। আওয়ামী লীগ একটি প্রাচিন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। দলটি ব্যক্তির ঊর্ধ্বে একটি প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যতেও তার রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বাস্তবতা হলো, কেউই চিরস্থায়ী নন। নেতৃত্ব বদলায়, সময় এগিয়ে যায়—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।”
আওয়ামীলীগ সরকারের ভুলভ্রান্তি প্রসঙ্গে জয়
দেখুন, ১৭ বছর – আমাদের সরকার কি ভুল করেছে? আমাদের সরকারের লোকেরা বাড়াবাড়ি করেছে? হ্যাঁ, তাই না। আমি নিজেও তাদের অনেকের উপর খুশি ছিলাম না। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি তারা আমাদের সরকারের লোক ছিল যাদের জবাবদিহি করা উচিত ছিল যারা তা করেনি। এটা কি সম্ভব নয় – আবার, না, কারণ গত দেড় বছরের দিকে তাকান। তারা কি করেছে? পরিস্থিতি অনেক, অনেক খারাপ। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা নেই। সন্ত্রাসীরা তাল মিলিয়ে চলছে। আর আছে কারচুপি – সম্পূর্ণ কারচুপি করা, প্রহসনমূলক নির্বাচন।
