ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৫-এ বাংলাদেশের অবস্থান আরও অবনতি হয়েছে। ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫০তম স্থানে রয়েছে, যা বিশ্বের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ১৩তম অবস্থান নির্দেশ করে। স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪ পয়েন্ট পেয়েছে দেশটি, যা আগের বছরের ২৩ থেকে মাত্র এক পয়েন্ট বেড়েছে। এতে বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য প্রকাশ করে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ যে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করেছিল, তা ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘হারানো সুযোগে’ পরিণত হয়েছে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির স্থায়িত্ব, রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ, দলীয়করণ ও স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বরং অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি আরও বেড়েছে।”
দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে (আফগানিস্তানের পর), এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩২ দেশের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিম্ন। বিশ্বের গড় স্কোর ৪২ হলেও বাংলাদেশ ১৮ পয়েন্ট পিছিয়ে। এমনকি কর্তৃত্ববাদী শাসনের দেশগুলোর গড় স্কোরের চেয়েও ৫ পয়েন্ট কম এবং ‘বন্ধ সিভিক স্পেস’ থাকা দেশগুলোর গড়ের চেয়ে ৬ পয়েন্ট নিচে রয়েছে বাংলাদেশ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন,
“ইউনূস সরকার রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীন ও কার্যকর করার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি, উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বরং দুদকের জবাবদিহিতা কমানোর মতো কিছু অর্ডিন্যান্স জারি করা হয়েছে।”
এই পরিস্থিতি বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি-জামায়াত আমলের (২০০১-২০০৬) দুর্নীতির চিত্রের সাথে বেশ মিলে যাচ্ছে। সেই সময়েও দুর্নীতি ছিল চরমে, এবং বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষে ছিল। বর্তমানে ইউনূস সরকারের অধীনে ‘সংস্কার ও সুশাসনের’ বড় বড় বক্তব্য সত্ত্বেও দুর্নীতির মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকে বলছেন—দুর্নীতিতে দেশ বিএনপি আমলের অবস্থায় ফিরে গেছে বা তার চেয়েও খারাপ হয়েছে।
২০১২-২০২৫ পর্যন্ত গড় স্কোর ২৬ এবং দুর্নীতিগ্রস্থ দেশের তালিকাত অবস্থান ৩৩ থেকে ১৭তম অবস্থানের মধ্যে ঊথানামা করেছে। ২০২৫-এ ইউনুসের শাসনামলে তা ২৪-এ নেমেছে। টিআইবির বিশ্লেষণে দেখা যায়, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ কয়েকটি দেশ ডিজিটাল ব্যবস্থা ও কঠোর বিচারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অগ্রগতি দেখিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতি অনিবার্য নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে পরিবর্তন সম্ভব।”
তিনি আগামী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দুদককে স্বাধীন করা, সম্পদ বিবরণী বাধ্যতামূলক করা, অর্থ পাচার রোধে আইন সংস্কার, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দুর্নীতির এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।
