ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের শপথকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সারাদিনজুড়ে দেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা ও নতুন মেরুকরণ। একদিকে সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন; অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে শুরু হয়েছে নতুন এক খেলাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ২৫ মার্চ কালরাতে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধ, ঐ রাতেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, ১৭ এপ্রিল সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় এবং ১৯৭২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন—এই প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক পরম্পরার অংশ। সংবিধান কোনো বিচ্ছিন্ন দলিল নয়, এটি রক্ত, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক দর্শনের ফসল। সংবিধানের চারটি মূলনীতি রাষ্ট্রনির্মাতাদের দর্শন ও জনগণের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
সংবিধান অনুযায়ী সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সংশোধন করা সম্ভব হলেও রাষ্ট্রের মূলনীতি পরিবর্তনযোগ্য নয়—এমনটাই মত সংবিধান বিশ্লেষকদের। মূলনীতি সুরক্ষার জন্যই সংবিধানে ৭(খ) ধারা বলবৎ রয়েছে। তবে জুলাই সনদে এই ৭(খ) ধারা বাতিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পরিবর্তনের পথ খুলে যায়। একই সঙ্গে ৭(ক) ধারা বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে, যার ফলে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে আর অবৈধ হিসেবে গণ্য না করার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি একটি গণভোট আয়োজন করা হয়। কিন্তু সংবিধানে গণভোট আয়োজনের কোনো সুস্পষ্ট বিধান না থাকায় এর বৈধতা নিয়েই শুরু হয়েছে বড় বিতর্ক। গণভোটকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করা হলেও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানবহির্ভূত বা সংবিধানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে—এমন কোনো আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতিরও নেই।
এই প্রেক্ষাপটেই মঙ্গলবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। শপথ পরবর্তী সময়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বিরোধীদলীয় উপনেতা হন ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং বিরোধীদলীয় হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পান নাহিদ ইসলাম। মঙ্গলবার বিকেলে ১১ দলীয় জোটের সভা শেষে এসব তথ্য সাংবাদিকদের জানান ডা. শফিকুর রহমান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ও গণভোটের রায়কে সম্মান জানানো সবার দায়িত্ব। সে কারণেই আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নিয়েছি।’ একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি শপথ না নিয়ে জুলাইয়ের চেতনা ও গণভোটের রায়কে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করেছে। তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলার পরও শপথ না নেওয়াকে তিনি দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন।
বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম আরও কড়া ভাষায় বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নিয়ে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।’ বিএনপির দেওয়া ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় দাবি করে তিনি বলেন, এর ফলে দেশে একটি আইনি ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে।
এর আগে সকালে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ঘোষণা দেন, বিএনপির সংসদ সদস্যরা যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেন, তবে জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরাও কোনো শপথ নেবেন না। তাদের যুক্তি ছিল—সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন। তবে নাটকীয়ভাবে দুপুর ১২টা ২৩ মিনিটে জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন এবং দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের জন্য নির্ধারিত ফরম থাকলেও বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য এই পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হননি। পাশাপাশি সংবিধানে এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়, তবে আগে সেটিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি কে শপথ পাঠ করাবেন এবং শপথের বিধান কী হবে—তা সংবিধানে নির্ধারণ করতে হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংবিধানে যে শপথের বিধান নেই, সে শপথ বিএনপি নেবে না। দলীয় চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকেই এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে এই গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ফল বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ জনস্বার্থে এ রিট করেন। রিটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে বিচারপতি ফাতেমা নজীবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হতে পারে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলেও সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোট ঘিরে বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপির দ্বন্দ্ব রাজনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিএনপি যেখানে সংবিধান মেনে চলার অবস্থান নিয়েছে, সেখানে জামায়াত ও এনসিপি বলছে—এটি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বেইমানি। আদালতের রায় এবং সংসদের ভেতরে-বাইরের রাজনৈতিক কৌশলই এখন নির্ধারণ করবে, এই নতুন খেলায় শেষ পর্যন্ত কার চাল কাজে আসে।
