★দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো কেবল সাধারণ দুর্নীতির গল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্র, কূটনৈতিক প্রটোকল এবং পুরনো রাজনৈতিক সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের এক সুপরিকল্পিত ‘ক্রস-বর্ডার মানি লন্ডারিং’ বা আন্তঃদেশীয় অর্থ পাচারের ব্লু-প্রিন্ট।
★দুদকে জমা পড়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী অত্যন্ত গোপনে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের ‘কাস্টোডিয়ান’ বা পাহারাদার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও দুর্নীতিবাজ অভিজাত শ্রেণির (Elites) মধ্যে অর্থের বিনিময়ে একটি অদৃশ্য সমঝোতা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই চুক্তির অংশ হিসেবেই নসরুল হামিদের ওই সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং নিরাপদ রুট ব্যবহার করে ৪ হাজার কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়।
তিন দেশে অর্থ পাচারের ভৌগোলিক বিস্তৃতি
রিজওয়ানা হাসানের অর্থ পাচারের রুট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ইকোনমিক জোনকে বেছে নিয়েছেন:
১. যুক্তরাষ্ট্র (মেগা লন্ডারিং): নসরুল হামিদের সম্পদের ৪ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি, রিজওয়ানা হাসান নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে আরও প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং এবং শেল কোম্পানির (ভুয়া কোম্পানি) মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান।
২. দুবাই (পারিবারিক নেটওয়ার্ক): অর্থ পাচারের অন্যতম নিরাপদ স্বর্গরাজ্য দুবাইকে তিনি ব্যবহার করেছেন তার আপন বোনের মাধ্যমে। বোনের নামে রাতারাতি খোলা বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিনিয়োগ করা হয়েছে। পারিবারিক সদস্যকে ব্যবহার করা মানি লন্ডারিংয়ের একটি ক্লাসিক মেথড, যাতে নিজের নাম সরাসরি সামনে না আসে।
৩. আজারবাইজান (কূটনৈতিক প্রটোকলের অপব্যবহার): দুর্নীতির ইতিহাসে সবচেয়ে অভিনব ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের নভেম্বরে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (COP29) তিনি যান বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে। রাষ্ট্রীয় খরচে এবং ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে তিনি জলবায়ু রক্ষার কথা বলতে গিয়ে বাস্তবে নিজের আখের গুছিয়েছেন। কূটনৈতিক সুবিধার (Diplomatic immunity) আড়ালে তিনি বাকুতে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন এবং সেখানে থাকা তার আত্মীয়-স্বজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন।
পরিবেশ রক্ষার নামে ‘শ্যাডো স্টেট’ ও ১০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ
দুদকে জমা পড়া আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে একটি হলো—পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ[2]। ইসিএ (Ecologically Critical Area) ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু তহবিলের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বাজেটকে সুকৌশলে ওভার-ইনভয়েসিং (অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো) ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, ‘পরিবেশ রক্ষা’র আইনি ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জমি অবৈধভাবে দখলের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রমাণ করে ক্ষমতা হাতে পেয়ে তিনি রীতিমতো একটি ‘শ্যাডো স্টেট’ বা ছায়ামুক্তারিতে পরিণত হয়েছিলেন। সুত্র : আজকের কন্ঠ
