ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের আকাশসম প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় বসা ইউনূস সরকারের হাতে উল্টো অর্থনীতির যে বেহাল দশা হয়েছে, তা ক্রমশ সামনে আসছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে দেশজ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫০ কোটির বেশি টাকা। এতে নতুন ঋণ গ্রহণের গতি কিছুটা শ্লথ হওয়ার ইঙ্গিত মিললেও, বাড়তে থাকা মোট ঋণের চাপ রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মোট দেশজ ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের অক্টোবর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এই সময়ে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৫০.৬ কোটি টাকা।
বর্ষভিত্তিক হিসাবেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৪ সালের অক্টোবর শেষে দেশজ ঋণ ছিল ৯ লাখ ৪১ হাজার ৫৮১.৭ কোটি টাকা, যা এক বছরে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
মোট ঋণের মধ্যে ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯১৪.৬ কোটি টাকা এসেছে ব্যাংক খাত থেকে এবং ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে। অর্থাৎ দেশজ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্রনির্ভর ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য।
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, গত ছয়-সাত বছরে সঞ্চিত ঋণের প্রেক্ষাপটে ঋণ-রাজস্ব অনুপাত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, রাজস্ব আদায় না বাড়লে ক্রমবর্ধমান দেশজ ঋণ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়বে।
ব্যাংকিং খাত থেকেও সতর্কতার সুর শোনা যাচ্ছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মতো ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে নেওয়া ঋণের মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে, ফলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এসব দায় যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করতে শক্তিশালী রাজস্ব আহরণ জরুরি।
তবে তিনি এটিকে তাৎক্ষণিক সংকট হিসেবে দেখছেন না; বরং বাজেটের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় হওয়া দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে সতর্ক করেন।
তবে সাম্প্রতিক প্রবাহে নতুন ঋণ নেওয়ার গতি কমার ইঙ্গিত মিলেছে। অর্থবছর ২০২৫-২৬ এর প্রথম চার মাসে সরকার নিয়েছে ১৪ হাজার ৮২০ কোটি টাকা ঋণ, যা আগের বছরের একই সময়ে নেওয়া ৩৯ হাজার ২১৮ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় তিন গুণ কম।
ব্যাংক অর্থায়নেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থবছর ২০২৬-এর জুলাই-অক্টোবর সময়ে নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকা।
অক্টোবর মাসে সরকার ব্যাংক থেকে ১২ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা ঋণ নিলেও ৩ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে, ফলে নিট বৃদ্ধি হয়েছে ৯ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।
জাতীয় সঞ্চয় স্কিম থেকেও সংগ্রহ কমেছে। অর্থবছর ২০২৬-এর জুলাই-অক্টোবর সময়ে নিট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ৫ হাজার ১০৮ কোটি টাকার তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
সব মিলিয়ে চিত্রটি একদিকে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির, অন্যদিকে নতুন ঋণ গ্রহণের গতি কমার। অর্থনীতিবিদদের মতে, সামনে বড় প্রশ্ন একটাই—রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কি বাড়তে থাকা দেশজ ঋণের ভার সামাল দিতে পারবে?
