পায়রা আর রামপাল, দেশের দুটো সবচেয়ে বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটো মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে দুই হাজার চারশো মেগাওয়াট বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এই দুটো কেন্দ্র এখন কয়লা আমদানি করতে পারছে না। কারণটা প্রযুক্তিগত না, প্রাকৃতিক দুর্যোগও না। কারণ হলো সরল হিসেব, গত আগস্ট থেকে এই দুই কেন্দ্রের ভর্তুকির টাকা পাঠানো হয়নি। জমে উঠেছে চার হাজার সাতশো ছাব্বিশ কোটি টাকার বকেয়া।
এই ব্যর্থতার দায় কার, সেটা নিয়ে বিতর্কের খুব একটা সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বিদেশি অর্থায়নে, জঙ্গি সংগঠনগুলোর মাঠ পর্যায়ের সক্রিয়তায় আর সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থনে দেশের নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। ক্ষুদ্রঋণের সুদের ব্যবসায়ী হিসেবে যার পরিচিতি, তিনি হঠাৎ করেই হয়ে গেলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান। এই অস্বাভাবিক ক্ষমতা দখলের পর দেশ পরিচালনায় যে নৈরাজ্য শুরু হয়েছিল, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট তারই একটা দৃশ্যমান ফলাফল।
ইউনূস সরকার গত দেড় বছরে বিদ্যুৎ খাতে কার্যত কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়নি। রামপাল আর পায়রার ট্যারিফ রেট অনুমোদনের বিষয়টা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল মাসের পর মাস। কেন? সরকারি চিঠিতেই স্বীকার করা হয়েছে যে বিদেশি ঋণদাতাদের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়াটা সময়মতো সম্পন্ন করা উচিত ছিল, সেটা করা হয়নি। ফলে মন্ত্রিসভার ক্রয় কমিটিতে প্রস্তাবটাই পাঠানো যায়নি। এই গাফিলতি নিছক প্রশাসনিক অদক্ষতা কিনা, নাকি ইচ্ছাকৃত, সেই প্রশ্নটা এখন অনেকের মাথায়।
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে পরিষ্কার বলা হয়েছে, টাকা না পেলে এই গরমে দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের লোডশেডিং হবে। রমজান চলছে। সেচ মৌসুম শুরু হচ্ছে। কৃষকের মাঠে পানি লাগবে। শহরে মানুষ ঘরে বসে কাজ করে। হাসপাতাল চলে, কারখানা চলে, সবকিছু বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে যদি দুই হাজার মেগাওয়াট গ্রিড থেকে বাদ যায়, তার প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে সেটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।
ইউনূস গং দেড় বছর দেশটাকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদের মতো ব্যবহার করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পছন্দের লোক বসানো হয়েছে, বিভিন্ন খাত থেকে নিয়মিত অর্থ সরানো হয়েছে, আর যে প্রকল্পগুলো দেশের মানুষের জন্য আলো আর বিদ্যুৎ নিশ্চিত করছিল, সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে সংকটে ফেলা হয়েছে। কারণ এই প্রকল্পগুলো আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধক রাখা হয়েছিল।
এখন ইউনূস নেই। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ক্ষতিটা তো হয়ে গেছে। চার হাজার সাতশো কোটি টাকার বকেয়া রেখে গেছে। এই টাকা এখন নতুন সরকারকে জোগাড় করতে হবে, নয়তো গরমের শুরুতেই দেশ অন্ধকারে ডুববে। একটা অবৈধ সরকারের দেড় বছরের অব্যবস্থাপনার মূল্য শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেছে ইরান যুদ্ধের কারণে, কাতার তার এলএনজি প্ল্যান্ট বন্ধ করে দিয়েছে বোমা হামলার পর, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এমনিতেই তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এই মুহূর্তে দেশের নিজস্ব কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র দুটো যদি শুধু টাকার অভাবে বসে থাকে, তাহলে এর চেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই ব্যর্থতার মুখ একটাই, মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার দেড় বছরের লুটপাট আর অপশাসন।
