অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে দেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা। সর্বশেষ ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে তিন মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। এতে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে—যা অর্থনীতির জন্য নতুন করে চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ১১২ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি।
যদিও জুন প্রান্তিকে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মধ্যবর্তী সময়ে সামান্য কমলেও শেষ প্রান্তিকে আবার ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই নতুন করে ঋণ গ্রহণ বাড়ায় সামগ্রিক ঋণ বেড়েছে। তবে এই বৃদ্ধির পেছনে কাঠামোগত কারণের পাশাপাশি কিছু সাময়িক হিসাবগত প্রভাবও কাজ করেছে।
বিশেষ করে, ডিসেম্বর প্রান্তিকে আকু (ACU) পেমেন্ট স্থগিত থাকায় ওই অর্থ পরিসংখ্যানে যোগ হয়েছে। একই সঙ্গে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ—প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার—ঋণের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি কেবল পরিসংখ্যানগত নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নির্ভর করবে ঋণের ব্যবহারের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি ঋণ স্বাভাবিক হলেও এর কার্যকারিতা এখন মূল প্রশ্ন। তার ভাষায়, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত না হলে এই ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি ঋণ সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে তা পরিশোধ সক্ষমতা বাড়ায়; অন্যথায় তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করে। ফলে ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি এর ব্যবহার ও ফলাফল পর্যবেক্ষণে সরকারের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
তথ্য অনুযায়ী, মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি খাতে রয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং বেসরকারি খাতে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় উভয় খাতেই ঋণ বেড়েছে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের ঋণনির্ভরতার প্রবণতা অব্যাহত থাকারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদেশিক ঋণের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য তাৎক্ষণিক সংকট না হলেও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির বার্তা বহন করছে—বিশেষত যখন রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে।
তাই ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও জবাবদিহিতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
