সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার হযরত ছাবাল শাহর (রহ.) মাজারে বাবার সঙ্গে এসে গান গেয়েছিলেন শিল্পী পেহেলি ভৈরবী। তার গান দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে শোনেছেন।
দর্শকদের সেই ভালোবাসার রেশ নিয়েই শুক্রবার সকালে বাবার সঙ্গে বাসে করে ফিরছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু বাড়ি ফেরা হয়নি পেহেলি ভৈরবির। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
তার মৃত্যু গানের আসরের অনেক শ্রোতাকে শোকাহত করেছে। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেহেলী ভৈরবীকে স্মরণ করে তার গানের প্রশংসা করেছেন। পেহেলী ভৈরবীকে যারা চেনেন, তারাও তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।
এদিন সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক ও বেঙ্গল পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে যে নয়জন নিহত হয়েছেন তার মধ্যে পেহেলি ভৈরবী একজন।
১৭ বছর বয়সি পেহেলি ভৈরবী ভৈরব উপজেলার চন্ডিবের গ্রামের বাসিন্দা বাবুল মিয়ার মেয়ে।
গানের অনুষ্ঠানে থাকা বিশ্বনাথের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, “আমি গানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। তার বেশ কিছু ভিডিও ধারণ করেছি এবং লাইভও দিয়েছি। আমরা জানি, তার বাড়ি ভৈরবে। এর আগেও তিনি এ মাজারে এসে গান গেয়েছেন। সকালে শুনি তিনি মারা গেছেন। খুব খারাপ লাগছে শিল্পীর জন্য।”
হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা সোহল আহমদ বলেন, “প্রতিমাসে এক দিন মাজারে দোয়া মাহফিল হয়। দোয়া মাহফিল শেষে দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজনের জন্য গানের আয়োজন থাকে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ওই মেয়েটা এসেছিল গান গাওয়ার জন্য। মেয়েটার সঙ্গে তার বাবাও ছিলেন।”
তিনি বলেন, “মাজারে গান গাওয়ার শিল্পী আনা-নেওয়ার বিষয়টি দেখেন জাহাঙ্গীর মিয়া। বৃহস্পতিবার গানে আসা সব শিল্পী এক গাড়িতে করে এসেছিলেন। তারা ভোরের দিকে গাড়ি নিয়ে সিলেটে চলে যান। পরে শুনেছি মেয়েটা মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়।”
হয়রত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজার এলাকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আনিছ আহমদ বলেন, “আমার বাড়ির পাশেই মাজার, গান হলে শব্দ শুনতে পাই। বৃহস্পতিবার রাতে গানের শব্দ শুনেছি। আমি গানে যাইনি। মাজারে প্রায় সময় গান-বাজনা হয়ে থাকে।”
বৃহস্পতিবার নিজের ফেইসবুক স্ট্যাটাসে পেহেলী ভৈরবী লিখেছিলেন, “আসসালামু ওয়ালাইকুম…! সবাই কেমন আছেন আজকে ০৬/০৮/২০২৬ ইং প্রোগ্রাম এ যাবো বিশ্বনাথ, রামপাশা, বৈরাগি বাজার। হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) মাজারে। আশপাশে যারা আছেন আজকে দাওয়াত রইলো, ধন্যবাদ।”
তার মৃত্যুর পর শিল্পী মুন তার ফেইসবুকে লিখেছেন, “জীবন সত্যিই কতটা অনিশ্চিত। বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী আর আমাদের মাঝে নেই এই সংবাদটি মেনে নেওয়া সত্যিই অত্যন্ত কষ্টকর। গত রাতে সিলেটের বৈরাগী বাজারে, হযরত ছাবাল শাহ (রহ.) বাবার মাজারের অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে আজ সকালে বাড়ি ফেরার পথেই এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।
“আমরা শিল্পীরা প্রতিনিয়ত গান ও অনুষ্ঠানের জন্য দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াই। রাত-দিন, ক্লান্তি কিংবা ঝুঁকি সবকিছু ভুলে মানুষের ভালোবাসার জন্য গান করে যাই। অথচ জীবনের কোন পথচলাটি যে শেষ পথচলা হয়ে যাবে, তা আমরা কেউই জানি না। পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা পেহেলী ভৈরবীর আত্মার শান্তি দান করুন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।”
শিল্পী এসকে সুমন লিখেছেন, “হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে চমকে গেলাম পেহেলী ভৈরবী দুনিয়াতে আর নাই, না ফেরার দেশে চলে গেলেন। আপনারা সবাই ওর জন্য আশীর্বাদ করবেন।”
দুর্ঘটনায় নিহত বাকি আটজন হলেন- কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুরের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৫০), সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার চন্ডীপুরের জাহাঙ্গীরের মেয়ে ফাইজা (৩), সিলেট নগরীর সোবাহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রিতম (২২), ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৪), সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার উমনপুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আরমান (১৯), কুমিল্লা জেলার বাঙ্গুরাবাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আ. সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ (৩৯), ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সদর উপজেলার শেরপুরের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন ও কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলি থানার রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সুত্রধর (৩৭)।
শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি আনিসুর রহমান বলেন, নিহত নয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। মরদেহগুলো তাদের পরিবারের হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।
বেড়াতে এসে প্রাণ গেল সাইফুলের
সিলেটে ঘুরতে এসে বাড়ি ফেরার পথে একই দুর্ঘটনায় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার সাইফুল ইসলাম (৫৫) নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ওই উপজেলার ফারুক মিয়া ও আব্দুল লতিফ।
আহতরা বলেন, বুধবার পাঁচ বন্ধু সিলেট ভ্রমণে এসেছিলেন। ফেরার পথে তাদের মধ্যে সাইফুল, ফারুক ও লতিফ বাসে করে কুলিয়ারচরের উদ্দেশে রওনা দেন। আর জমরুত মিয়া ও রানা বিমানে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বাসটি।
ফারুক মিয়া বলেন, পাঁচ বন্ধু হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন উড়োজাহাজে করে ঢাকায় ফিরে যান। পরে তিনি ও অপর দুই বন্ধু ইউনিক পরিবহনের বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
তিনি বলেন, “দুর্ঘটনার সময় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। পরে আহত অবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ দুর্ঘটনায় আমার বন্ধু সাইফুল ইসলাম নিহত হয়েছেন। সাইফুল পেশায় একজন ঠিকাদার ছিলেন।”
আহত আব্দুল লতিফ বলেন, শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সিলেট থেকে রওনা দেয়। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওসমানীনগর এলাকায় বিপরীতমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
উপজেলা বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক জমরুত মিয়া বলেন, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সংঘর্ষে বাসের এক পাশের যাত্রীরাই বেশি হতাহত হয়েছেন।
নিহত সাইফুল ইসলামের পরিবার জানিয়েছে, তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক ছিলেন। পেশায় ঠিকাদার সাইফুল ইসলাম কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন।
চলে গেছেন সংসারের একমাত্র অবলম্বন
ঢাকার উদ্দেশে এই যাত্রাই যে প্রীতমের জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে, তা কে জানত। অথচ এই তরুণের কাঁধেই ছিল পুরো পরিবারের দায়িত্ব। বহুদিন আগে পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন তার একমাত্র ভাই। সেই শোক সামলে ছোট বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল তাকে। অভাব-অনটনের মধ্যে বৃদ্ধ মা ও বোনের দেখভাল করে আসছিলেন নিজের আয়ে।
প্রীতমের মাসতুতো বোনের জামাই কাজল ভৌমিক বলেন, “প্রীতমই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। তার আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলত বৃদ্ধ মা ও বোনের পুরো সংসার। অনেক কষ্ট আর অভাবের মধ্য দিয়েই দিন পার করছিল পরিবারটি।”
প্রীতমদের প্রতিবেশী নরেন ভট্টাচার্য্য বলেন, “নিহতের তালিকায় নামটা দেখে হৃদয় ভেঙে গেছে। সপ্তমকে কোলে-কাঁখে বড় করেছি। আমাদের পাশের বাসার ভাড়াটিয়া ছিল তারা। এই শোক কিভাবে সইবে ওর মা-বোন। খবরটা শোনার পর থেকেই অস্বস্তি আর কষ্ট লাগছে।”
