বিশেষ রিপোর্ট
একাত্তরের আলবদর সৈয়দ আলী আহমেদ লন্ডনে একটি কাণ্ড ঘটিয়েছেন। লন্ডনের সনামধন্য সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বাধীনতা দিবসের ৩০ মার্চ সোমবার অনুষ্ঠানে হাজির হন। সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন তরুণ। সঙেগ্ থাকা ঐ তরুণরা অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে সংগঠনের দায়িত্বশীল কয়েকজনের সাথে কথা বলেন। তারা বলেন, আমাদের সঙ্গে যিনি এসেছেন,তিন িএকজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নলে,লেখক মানুষ। তাকে একটু সম্মান দিয়ে অতিথি করলে ভালো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে সংগঠনের ঐ দায়িত্বশীলরা বলেন, ঠিক আছে, দেখা যাবে। অনুষ্ঠান শুরু হলে উপস্থাপিকা সৈয়দ আলী আহমেদকে অতিথির আসনে ডেকে নেন।


তিনি বক্তৃতো দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে সম্মান জানিয়ে বলেন, জিয়াউর রহমান হরেন স্বাধীনতার ঘোষক এবং তিনি ২৫ মার্চ রাত্রে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতাদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ করেন কয়েকজন। এমন কি তাকে অনুরোধ করা হয় ইতিহাস বিকৃতি না করার জন্য। উপস্থাপিকা তাকে বারণ করে বক্তব্যদান থেকে বিরত করান।
সবশেষে তিনি আরেক কাণ্ড করেন। তার সাথে থাকা তরুণরা অনুষ্ঠান শেষে তাদের ব্যাগ থেকে ফুলের তোড়া বের করেন এবং ফটো সেশনের সময় ফুলের তোড়া দান করা হচ্ছে এমন পোজ নিয়ে ছবি তুলেন।
এই ছিল এই অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা। এই ব্যাপারে সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের নেতাদের সাথে কথা বলে জানতে চাওয়া হলে তারা তাকে চিনেন না বলে জানান। তবে জনৈক নবীন এক সদস্যের অনুরোধে তাকে অতিথি করার কথা জানান।তার বির্তকিত বক্তব্য সম্পর্কে বলেন, আমরা প্রতিবাদ করেছি এবং তাকে বির্তিকত কথা বলা বারণ করেছি। চেনাজানা নয়, এমন ব্যক্তিকে অতিথি করার জন্য ভুল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন কর্মকর্তারা। প্রশ্ন ছিল, একজন তালিকাভুক্ত আল বদর স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি হয় কিভাবে?গুপ্ত আল বদর হিসাবে তার এধরণের সুযোগ তৈরী করে নেওয়া নতুন নয়।
সৈয়দ আলী আহমেদ একজন চালাক বা চতুর মানুষ।তিনি লোকজন ধরে প্রায় সময়ই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের অতিথি হওয়ার সুযোগ নেন।তিনির যোগ্যতা, একজন শিক্ষাবিদ। কর্মজীবনে ক্যান্টেনমেন্ট এলাকার স্কুল এন্ড কলেজগুলোতে শিক্ষকতা করেছেন।জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি আর্মির এডুকেশন কোরে শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন, প্রিন্সিপাল পর্যন্ত পদায়ন হয়ে অবসর নেন।
কিন্তু তার অতীত ইতিহাস কী!
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সৈয়দ আলী আহমেদ ছিলেন আল বদর, শান্তি কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সিলেটে পাক আর্মির সাথে ইন্টাপ্রিটার হিসাবে কাজ করা ব্যক্তি। সিলেট জেলা বর্তমান সিলেট বিভাগের ইসলামী ছাত্র সংঘের জেলা নেতা হওয়ায় সৈয়দ আলী আহমেদ এসব সুযোগ পান। তবে তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় সিলেট চলে আসেন। তিনি জগন্নাথপুর থানা শান্তিকমিটির সদস্য ও থানার পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জ মহকুমা শান্তিকমিটির প্রতিনিধি সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। জগন্নাথপুর শান্তিকমিটির তালিকায় লিপিবদ্ধ আছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেট ‘মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগ্রন্থ- রণাঙ্গন ‘৭১’। এ বইয়ের জগন্নাথপুর অধ্যায়ে এ তথ্য রয়েছে।এছাড়া সাংবাদিক আল আজাদ সম্পাদিত ‘সুনামগঞ্জের রাজাকার ও দালাল’ বইয়ে রয়েছে রাজাকার হিসাবে তার নাম।
একাধারে আল বদর ছিলেন। তিনি সিলেট বিমান বন্দরের নিকটস্থ তৎকালিন মডেল স্কুলে স্থাপিত পাক আর্মি ক্যাম্প ও আল বদর ট্রেনিং সেন্টারে আল বদর বাহিনির ট্রেনিং নেন এবং সিলেটের বিভিন্ন স্থানে কর্যক্রম অব্যাহত রাখেন একাত্তরের পুরো ৯ মাস। তিনি সিলেট শহরে ‘বান্দব রেস্টুরেন্ট’ দখল করে শান্তিকমিটির যে অফিস হয়েছিল, সেটিতে তার আনাগোনা ছিল নিয়মিত। এবং শান্তিকমিটির হয়ে আর্মির বিভিন্ন অপারেশনে ইন্টারপ্রিটার হিসাবে কাজ করেছেন। শোনা যা, বালাগঞ্জের আদিত্যপুর, বুরুঙ্গা গণহত্যা ও শ্রীরামশি গণহত্যার সময় ইন্টারপ্রিটারের কাজে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরে তিনি চট্টগ্রামে পালিয়ে যান।দেশ শান্ত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ নেন।
