বিশেষ প্রতিবেদন
লন্ডন,১৫ এপ্রিল: সাহিত্যের প্লাটফরম ‘কবিকণ্ঠ’-এর আয়োজনে ১লা বৈশাখে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি, গান ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১লা বৈশাখ মঙ্গলবার ১৪ এপ্রিল পূর্ব লন্ডনের জুবিলি স্ট্রিটে কবিকণ্ঠ-র অফিসে সন্ধ্যা ৬টায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন কবি আবৃত্তিকার সংস্কৃতিজন।
বাঙালির প্রিয় মিষ্টি জিলাপী বিতরণ ও কেক কেটে অনুষ্ঠানের সুচনা হয়। কেক কাটেন আবৃত্তিশিল্পী মুনিরা পারভীন,সংস্কৃতিজন ড. হাসনাইন চৌধুরী, সৈয়দ এনামুল ইসলাম ও ড. আনসার আহমদ উল্লাহ।

প্রথমেই শুরু হয় আবৃত্তি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী মুনিরা পারভীন।গুরুদেবের অমর কবিতা ‘১৪০০ সাল’ আজি হতে শত বর্ষ পরে/কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতা খানি’এবং ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ কবিতা ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের পর’ আবৃত্তি করেন মুনিরা পারভীন। দরদমাখা প্রাণবন্ত আবৃত্তি মুগ্ধকরা পরিবেশে উপস্থিত সকলে ডুবে যান।
এরপর স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন কবি ছড়াকার সৈয়দ হিলাল সাইফ। তিনি বলেন, মুনিরা পারভীনের কবিতা আবৃত্তির পর আমার কণ্ঠ কী আর মানায়। এরকম হাস্যরস সৃষ্টি করে তিনি পড়ে শোনান স্বরচিত কবিতা।

তারপর একে একেপয়লা বৈশাখ নিবেদিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তিতে অংশ নেন কবি ফয়জুর রহমান ফয়েজ, কবি হামিদ মোহাম্মদ, কবি ও আবৃত্তিকার নজরুল ইসলাম অকিব, হাসনাইন চৌধুরী। কবি ফয়জুর রহমান ফয়েজ নির্বাচিত স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। রেশ কাটতে না কাটতেই কবি হামিদ মোহাম্মদ ‘প্রেমের কবিতা’ গ্রন্থ থেকে বৈশাখনিবেদিত কবিতা ‘এই দিনে আমি ঘরে আসি’ কবিতা পড়ে শোনান। দীর্ঘ এই কবিতায় উঠে এসেছে আত্মপরিচয়ের দ্যোতনা।

একটু দেরীতে এসে উপস্থিত হন কবি ও আবৃত্তিকার নজরুল ইসলাম অকিব। সাথে ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী জয়নুল ইসলাম। নজরুল ইসলাম অকিব স্বরচিত কবিতা একের পর এক তার ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি করেন। কবি হামিদ মোহাম্মদ এই মুগ্ধকরা আবৃত্তির পর স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন বেশ কয়েকটি। প্রতিটি কবিতা প্রেম ও স্মৃতিজাগানিয়া। মুগ্ধ হয়ে শোনেন উপস্থিত সকলে।
অনুষ্ঠানচলাকালে এসে উপস্থিত হন সংস্কৃতিকর্মী অনিক নাথ সুমন, বৃষ্টি গোমেজ, অমিত রুদ্র।

এই তিনজন আসতেই অনুষ্ঠানস্থল যেন ঝলমল করে ওঠে বৈশাখী আনন্দে। এসেই বলেন, আমরা গান গাইতে চাই। আবৃত্তি ও স্বরচিত কবিতাপাঠের পরই প্রথমে তারা ‘এসো হে বৈশাখ’ গান কণ্ঠে তোলেন। তাদের সাথে কণ্ঠ মেলান সকলেই। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘ধনে ধানে পুষ্পেভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ ‘ সূর্যোদয়েও তুমি সূর্যাস্তেও তুমি’ দেশাত্মকবোধক গানগুলো গেয়ে মাতিয়ে তুলেন।

সবশেষে সৈয়দ এনামুল ইসলাম ও ড. আনসার আহমদ উল্লাহ বিলাতে বৈশাখীমেলার ইতিহাস নিয়ে কথা বলেন।তারা বলেন, বৈশাখিমেলা লন্ডনের নটিংহাম কার্নিভালের পরেই সবচেয়ে বৃহত মেলা হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে এক সময়। আনসার আহমদ উল্লাহ বলেন, মেলা হিসাবে প্রথমে ‘দেশবিকাশ’ নামে একটি সংগঠন ‘বাংলাদেশমেলা’ নামে ব্রিকলেনে আয়োজন করেন মাসব্যাপী মেলার। সময় আশির দশকের শেষার্ধে। পরে বৈশাখিমেলা নামে বৃহত আকারে মেলা পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্ক ও ব্রিকলেন এলাকায় কয়েকবার আয়োজন করে ব্রিকলেন বিজনেস এসোসিয়েশন, উদীচী ও স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় কিছুদিন পর টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ও বৈশাখিমেলা ট্রাস্ট উইভারফিল্ড, ভিক্টোরয়া পার্কসহ বিভিন্ন বড় পরিসরে বৈশাখিমেলার আয়োজন চলতে থাকে। বর্তমানে বিভিন্ন বৈরী কারণে বন্ধ রয়েছে। সৈয়দ এনাম বলেন, এছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন হলে বৈশাখি আয়োজন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়মিত করে আসছে। ‘নারীচেতনা’ নামে একটি সংগঠন ও উদীচী শিল্পী যুক্তরাজ্য সংসদ বেশ কিছুদিন মানসম্মত বৈশাখি আয়োজন করে, যা মনের রাখার মতো। তারা বলেন, যখনই দেশে বৈরী অবস্থা বিরাজ করছে, তখনই বিলাতের বাঙালিরা আরো দ্বিগুণ বেগে অসাম্প্রদায়িক চেতনাবাহী বৈশাখি আয়োজন নিয়ে মেতেছে।

অনুষ্ঠানে একটি সারপ্রাইজ ছিল ‘কবিকণ্ঠ‘র মিডিয়া অফিস যাত্রার ঘোষণা। ১লা বৈশাখ ১৪৩৩ সালে যাত্রা শুরু করলো কবি হামিদ মোহাম্মদের পরিচালনায় ‘কবিকণ্ঠ’ মিডিয়া। এরআগে কবিকণ্ঠ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্লাটফরম হিসাবে ২০১৫ সাল থেকে শুধুমাত্র সক্রিয় ছিল। আজ থেকে নতুন সংযোজন ঘটলো এই প্রতিষ্ঠানের। এই কার্যক্রমে যুক্ত হলো প্রিন্টিংসহ গ্রাফিক ডিজাইনের বিভিন্ন কাজ ও সেবা।
বৈশাখের অসাম্প্রদায়িক নানা অনুষঙ্গ নিয়ে আলোচনা ও প্রাণকাড়া আবৃত্তি গানের পর অনুষ্ঠান শেষ হতে রাত ৯টা বেজে যায়। একটি প্রাণজ আবেদন নিয়ে সবাই বাড়ি ফেরেন।
উল্লেখ্য, লন্ডনে এবার পয়লাবৈশাখ ১৪ এপ্রিল একমাত্র কবিকণ্ঠই অনুষ্ঠান করেছে।
