এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ১৮টি নির্দেশনা জারি করে। এ নির্দেশনায় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের আদেশ মেনে চলার জন্য দেশবাসীর প্রতি অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। অন্যদিকে এদিন থেকেই কলকাতাস্থ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের হাই কমিশনে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে ও বাঙালিদের তরফ থেকে শরণার্থীদের জন্য প্রচুর কাপড় ও অর্থ সাহায্য আসতে থাকে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিখ্যাত সব সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে উঠে আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের চিত্র।
প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ১৮ নির্দেশনা
১. কোনো বাঙালি কর্মচারী শত্রুপক্ষের সাথে সহযোগিতা করবে না। প্রতিটি কর্মচারী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশ অনুসারে কাজ করবেন। শত্রু কবলিত এলাকায় অবস্থা বিশেষে বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করবেন।
২. সরকারি আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিফৌজকে সাহায্য করবেন।
৩. সকল কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য অবিলম্বে নিকটতম মুক্তিসেনা শিবিরে যোগ দেবেন। শত্রুর সাথে সহযোগিতা করবেন না।
৪. বাংলাদেশ সরকার ছাড়া অন্য কারো বাংলাদেশ থেকে কর, খাজনা ও শুল্ক আদায়ের অধিকার নেই।
৫. যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে নৌ চলাচল সংস্থার কর্মচারীরা কোন অবস্থায় শত্রুকে সাহায্য করবেন না।
৬. নিজ নিজ এলাকায় খাদ্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদার ওপর লক্ষ্য রাখবেন।
৭. চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারি, মজুতদারির ওপর কঠোর নজর রাখবেন।
৮. ধর্মের দোহাই দিয়ে ও অখণ্ডতার বুলি আউড়ে এক শ্রেণীর দেশদ্রোহী মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এদের চিহ্নিত করে রাখুন। এদের সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করুন। তাদের মুক্তিফৌজদের হাতে অর্পণ করুন।
৯. গ্রামে গ্রামে রক্ষীবাহিনী গড়ে তুলুন এবং রক্ষীবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকদের মুক্তিবাহিনীর নিকটতম ক্যাম্পে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।
১০. শত্রুপক্ষের গতিবিধির খবর সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে জানাবেন।
১১. মুক্তিবাহিনীর চলাচলের জন্য চাহিবামাত্র সরকারি যানবাহন হস্তান্তর করতে হবে।
১২. বাংলাদেশ সরকার বা মুক্তিবাহিনী ছাড়া জ্বালানী বিক্রি করা চলবে না।
১৩. কেউ পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অথবা তাদের এজেন্টদের সাহায্য করবে না। যে করবে তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
১৪. গুজবে কান দেবেন না। চূড়ান্ত সাফল্য সম্পর্কে নিরাশ হবেন না।
১৫. সকল সুস্থ ও সবল ব্যক্তিকে নিজ নিজ আগ্নেয়াস্ত্রসহ নিকটতম মুক্তিবাহিনী শিবিরে রিপোর্ট করতে হবে।
১৬. শত্রুবাহিনীর ধরা পড়া কিংবা আত্মসমর্পণকারী সৈন্যকে মুক্তিবাহিনীর কাছে সপর্দ করতে হবে।
১৭. পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সকল প্রকার যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা যাতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হতে পারে সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।
১৮. তথাকথিত পাকিস্তান বেতারের মিথ্যা প্রচারণা আদৌ বিশ্বাস করবেন না।
ঢাকার বাইরের যুদ্ধ ও গণহত্যা
১৯ এপ্রিল পাবনার সাঁথিয়ার পাইকরহাটি গ্রামের ডাববাগান এলাকায় নগরবাড়ি- বগুড়া মহাসড়কের পাশে অবস্থান নিয়ে গোটা উত্তরবঙ্গের চলাচলের রাস্তা রুখে দেয় মুক্তিবাহিনী। এদিকে ইপিআরের সুবেদার গাজী আলী আকবরের নেতৃত্বে ইপিআর, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, আনসার, পুলিশ ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র আক্রমণ গড়ে তোলে পাকিস্তানি হানাদারদের বিপক্ষে। প্রচণ্ড যুদ্ধে ৫০ জনের বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে হানাদারেরা নগরবাড়িতে পুনরায় ফিরে যায়। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর বেশ কজন শহীদ হয়েছিলেন।
পাকিস্তানি হানাদারেরা পিছু হটে নগরবাড়ি গিয়েই ক্ষান্ত দেয়নি। তারা আবার সেদিন রাতে অস্ত্র গোলাবারুদ ও বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে ফিরে আসে। এসময় পাকিস্তানি বহরের সামনে যুদ্ধে টিকতে না পেরে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পিছু হটে। এমন সময় হানাদারেরা প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে ডাববাগান সংলগ্ন বড়গ্রাম, কোড়িয়াল, রামভদ্রবাটি ও সাটিয়াকোলা গ্রামে ঢুকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিরীহ মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যায় শহীদ হয়েছিল শতাধিক মানুষ।
১৯ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সিলেটের বিমানঘাঁটির দখল নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। প্রথমে মুখোমুখি যুদ্ধে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি হানাদারেরা মুক্তিবাহিনীর উপর বিমান হামলা চালায়। তখন বাধ্য হয়ে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে।
১৯৭১ এর ১৮ ও ১৯ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহর দখল করে হানাদার বাহিনী, শান্তি কমিটি ও বিহারীরা শহরের দরগাহপট্টি থেকে ৭ জন নারী ও পুরুষ ধরে এনে প্রকাশ্যে রাস্তার উপর দাঁড় করিয়ে পিতা, পুত্র, স্বামী ও স্ত্রীকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
১৯ এপ্রিল রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শহর দখল করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি হানাদারেরা।
এইদিনে ইস্পাহানী জুটমিল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে নারী, শিশু, বৃদ্ধদের ধরে এনে পৈশাচিক কায়দায় গণহত্যা চালানো হয়। এরআগে ইস্পাহানী জুট মিলসের বহু অফিসার ও শ্রমিকেরা নিখোঁজ হন। তাদের লাশটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইস্পাহানী জুট মিলস ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় চালানো গণহত্যায় প্রায় এক হাজার মানুষ হতাহত হয়েছিলেন।
এদিন আগরতলা থেকে খবর পাওয়া যায় পাকিস্তানি হানাদারেরা আখাউড়া থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত রেল লাইন মেরামত করছে স্থানীয় মানুষদের বন্দুকের মুখে কাজ করতে বাধ্য করছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটির বরকলের কাপ্তাই লেকের আকাশ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের উপর বোমা হামলা চালাচ্ছে হানাদারেরা। অন্যদিকে কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে হানাদারেরা। তারা এর মধ্যে ছত্রীসেনা নামিয়েছে।
বিদেশি সংবাদপত্রের খবর ও প্রতিবেদন
সুইডেনের বিখ্যাত পত্রিকা এক্সপ্রেসেন ১৯ এপ্রিল তাদের এক উপ-সম্পাদকীয়তে প্রকাশ করে, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের দেয়া রায় মেনে নেয়ার মানসিকতা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নেই। তাই তারা সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে এদেশের নিরীহ মানুষের উপর গণহত্যা চালিয়েছে। এভাবে আর পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের পুনর্মিলন সম্ভব না। সেটা পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা জানলেও তাদের একগুঁয়েমির কারণে ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নিরীহ মানুষ।
১৯ এপ্রিল যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় প্রখ্যাত সাংবাদিক নিকোলাস টোমলিন লিখেছেন “ফার ফ্রম দ্য হলোকাস্ট” নামের একটি সম্পাদকীয়। যেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানে কী করে সামরিক বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা চালানো হচ্ছে এবং মানবিক বিপর্যয়ের খবর তিনি সম্পাদকীয়তে তুলে ধরেন।
পাকিস্তান: কুষ্টিয়ার যুদ্ধ – সোমবার, ১৯ এপ্রিল ১৯৭১ – টাইম ম্যাগাজিন
গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র লড়াই চলে, যেখানে বাঙালি শহরবাসী ও কৃষকরা ৮০,০০০ পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যের ‘দখলদার বাহিনী’কে প্রতিরোধ করে। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে প্রায় ২ লক্ষ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে ক্ষুব্ধ কৃষকদের হাতে সৈন্যরাও ব্যাপক হতাহতের শিকার হয়েছে। সেনাবাহিনী রাজধানী ঢাকা, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর চট্টগ্রাম ও খুলনা এবং আরও কয়েকটি শহর নিয়ন্ত্রণ করছিল। কিন্তু বাংলা দেশ মুক্তি ফৌজ নামে একটি অসংগঠিত প্রতিরোধ আন্দোলন ইতিমধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ, যার মধ্যে অনেক শহর ও নগরও রয়েছে, নিয়ন্ত্রণ করছিল বলে জানা গেছে। পশ্চিম পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তান থেকে সমস্ত বিদেশী সাংবাদিকদের বহিষ্কার করে যুদ্ধের প্রকৃত বিবরণ বহির্বিশ্বের কাছ থেকে আড়াল করতে প্রায় পুরোপুরি সফল হয়েছে। কিন্তু গত সপ্তাহে টাইম পত্রিকার সংবাদদাতা ড্যান কগিন্স ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করতে সক্ষম হন, যেখানে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত কুষ্টিয়া শহর (জনসংখ্যা ৩৫,০০০) পরিদর্শন করেন। শহরবাসী এবং বন্দী পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে ব্যাপক সাক্ষাৎকারের পর, কগিন্স গৃহযুদ্ধের প্রথম পাক্ষিকে কুষ্টিয়ায় ঘটে যাওয়া নৃশংসতা ও বীরত্বের একটি বিবরণ পুনর্গঠন করতে সক্ষম হন। তাঁর প্রতিবেদনটি হলো:
প্রশস্ত গঙ্গার কাছে ধান চাষের জেলা কুষ্টিয়া, ২৫শে মার্চের রাতে এক অস্থির ঘুমে তলিয়ে গেল। কোনো পূর্ব সংকেত ছাড়াই ১৩টি জিপ ও ট্রাক কুষ্টিয়ার থানার সামনে এসে থামল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সেই রাতে তখন রাত সাড়ে দশটা। ২৭তম বেলুচ রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানি ৬০ মাইল দক্ষিণে যশোর সেনানিবাস থেকে এসে পৌঁছেছিল। কোম্পানির ১৪৭ জন সৈন্য কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন না হয়েই দ্রুত প্রায় ৫০০ বাঙালি পুলিশকে নিরস্ত্র করে ফেলে এবং তারপর আরও চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়: জেলা পুলিশ সদর দপ্তর, সরকারি দপ্তর ভবন, ভিএইচপি রেডিও ট্রান্সমিটার এবং বালকদের জেলা বিদ্যালয়। ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ঘুমন্ত শহরবাসীর অধিকাংশই বুঝতে পারেনি কী ঘটেছে, যখন মাইক হাতে সৈন্যবোঝাই জিপগুলো জনশূন্য রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ঘোষণা করল যে ৩০ মিনিট পরেই সম্পূর্ণ কারফিউ শুরু হবে।
কারফিউ চলাকালীন ৪৮ ঘণ্টা কুষ্টিয়া শান্ত ছিল, যদিও রাস্তায় পাওয়া যাওয়ায় সাতজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের অধিকাংশই ছিলেন কৃষক, যারা কী ঘটেছে সে সম্পর্কে অবগত না হয়েই শহরে এসেছিলেন। ২৮শে মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নেওয়া হলে, শহরবাসী অবিলম্বে প্রতিরোধ সংগঠিত করতে শুরু করে।
সেই রাতে ৫৩ জন পূর্ব পাকিস্তানি পুলিশ সহজেই থানার মুষ্টিমেয় কয়েকজন সৈন্যকে পরাস্ত করে। এরপর, নিজেদের সাথে বহন করা সমস্ত .৩০৩ এনফিল্ড রাইফেল ও গোলাবারুদ নিয়ে আশেপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, পুলিশেরা বাংলাদেশের জন্য আগে থেকেই কর্মরত ১০০ জন কলেজ ছাত্রের সাথে জোট বাঁধে। ছাত্ররা স্থানীয় কৃষকদের গেরিলা যুদ্ধের প্রাথমিক কৌশল শেখাচ্ছিল, যাদের কাছে কেবল কুড়াল, চাষের সরঞ্জাম এবং বাঁশের লাঠি ছিল। দুই দিনের মধ্যেই, পুলিশ ও ছাত্ররা পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও মিলিশিয়াকে সংগঠিত করে এবং কুষ্টিয়ায় সেনাবাহিনীর পাঁচটি চৌকির ওপর একযোগে আক্রমণের পরিকল্পনা করে।
৩১শে মার্চ ভোর সাড়ে চারটায় প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক ও পুলিশের একটি বাহিনী কুষ্টিয়াকে মুক্ত করার জন্য অভিযান শুরু করে। হাজার হাজার শহরবাসী “জয় বাংলা!” স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে আসে। হাজার হাজার ক্রুদ্ধ বাঙালির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে সৈন্যরা দৃশ্যত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। ধরা পড়ার পর নায়েক সুবেদার (সিনিয়র সার্জেন্ট) মোহাম্মদ আইয়ুব আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা খুব অবাক হয়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম বাঙালি বাহিনী আমাদের মতো একটি কোম্পানির সমান হবে। আমরা জানতাম না যে সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ছিল।”
তাৎক্ষণিক মৃত্যু। বাঙালি যোদ্ধারা কুষ্টিয়ায় অন্য জায়গার মতো আত্মঘাতী, মানব-তরঙ্গ হামলা চালায়নি। কিন্তু শত শত রাইফেলের অবিরাম গোলাবর্ষণ ডেল্টা কোম্পানির সৈন্যদের ওপর এক নির্মম প্রভাব ফেলেছিল। দুপুর নাগাদ সরকারি ভবন ও জেলা সদর দপ্তর—সবই তাদের দখলে চলে যায়। পরদিন ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে, প্রায় ৭৫ জন সৈন্য তাদের জিপ ও ট্রাকের দিকে ছুটে যায় এবং গুলির বর্ষণের মধ্যে দিয়ে গর্জন করতে করতে পালিয়ে যায়। দুটি জিপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তেজিত জনতার চাপে থেমে যায়। পূর্ব পাকিস্তানিরা জিপগুলো থেকে এক ডজন সৈন্যকে নামিয়ে এনে ঘটনাস্থলেই নৃশংসভাবে হত্যা করে।
শহরের বাইরে পিচঢালা রাস্তার উপর গাছ কেটে ও চার ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে অন্যান্য যানবাহনগুলোকে আটকে দেওয়া হয়েছিল। সৈন্যরা প্রায় ৫০ জন বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু এরপর কৃষকরা তাদের পরাস্ত করে কুপিয়ে হত্যা করে। কয়েকজন সৈন্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও পরে ধরা পড়ে এবং তাদেরও হত্যা করা হয়।
পরদিন ভোর হওয়ার আগেই কুষ্টিয়ায় থাকা শেষ ১৩ জন সৈন্য রেডিও ভবন থেকে গোপনে বেরিয়ে আসে এবং পায়ে হেঁটে ১৪ মাইল পথ পাড়ি দেওয়ার পর দুজন বাঙালি মিলিশিয়া তাদের বন্দী করে কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। ডেল্টা কোম্পানির ১৪৭ জন সৈন্যের মধ্যে এই ১৩ জনই ছিলেন একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। নিহত পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে ছিলেন নাসিম ওয়াকার, ২৯ বছর বয়সী এক পাঞ্জাবি, যাকে গত জানুয়ারিতে কুষ্টিয়ায় সহকারী ডেপুটি কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এক ক্ষুব্ধ জনতা তার মৃতদেহ খুঁজে পেয়ে শহরের রাস্তা দিয়ে প্রায় আধা মাইল পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
সামান্যই অগ্রগতি হলো। পরদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী কুষ্টিয়ায় পাল্টা আক্রমণের জন্য যশোর থেকে আরেকটি পদাতিক কোম্পানি পাঠায়। কুষ্টিয়ার অর্ধেক পথ বিশাকালী গ্রামে নতুন কোম্পানিটি বাংলাদেশ বাহিনীর পাতা এক ফাঁদে পা দেয়। নয়টি গাড়ির সেনা কনভয়ের দুটি জিপ বাঁশ ও লতাপাতায় ঢাকা একটি গভীর গর্তে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তিয়াত্তর জন সৈন্য নিহত হন এবং আরও কয়েক ডজন সৈন্যকে ধাওয়া করে হত্যা করা হয়।
গত সপ্তাহজুড়ে কুষ্টিয়ায় ছাদ, ট্রাক, এমনকি রিকশাতেও বাংলাদেশের সবুজ, লাল ও সোনালি পতাকা উড়ছিল। স্থানীয় দলনেতা, ৫০ বছর বয়সী ডক্টর আশাবুল হকের নেতৃত্বে বাঙালি প্রশাসকেরা অঞ্চলটি চালাচ্ছিলেন। তিনি একজন প্রভাবশালী চিকিৎসক, যিনি একটি ওয়েলবি অ্যান্ড স্কট রিভলভার এবং একটি স্প্যানিশ গার্নিকা অটোমেটিক পিস্তল সঙ্গে রাখেন। সপ্তাহের শেষে, দুটি সেনা ব্যাটালিয়ন কুষ্টিয়া থেকে কয়েক মাইল দূরে একটি চৌকি স্থাপন করে। তবে, প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে তারা খুব একটা এগোতে পারছিল না বলে জানা গেছে। সৈন্যরা যদি কোনোভাবে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাতেও পারত, শহরের মানুষ আবারও লড়াই করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
গোপন স্থানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প ও ট্রেইনিং সেন্টার। ১৯ এপ্রিল ১৯৭১।
পূর্বাঞ্চলে হামলার জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করেছে পাকিস্তান।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-২০ এপ্রিল, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৩
করাচি, পাকিস্তান, ১৯ এপ্রিল — সরকার আজ অভিযোগ করেছে যে, ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে গোলন্দাজ বাহিনীর সমর্থনে “সশস্ত্র ভারতীয় নাগরিকরা” শুক্রবার পূর্ব পাকিস্তানের একটি সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ভারতীয় হাইকমিশনারের (যিনি রাষ্ট্রদূতের সমতুল্য) কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র হস্তান্তরের পর পাকিস্তানি রেডিওর মাধ্যমে অভিযোগটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।
আজ এখানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ভারতের বিরুদ্ধে আরও একটি অভিযোগ আনা হয়েছে যে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে শীঘ্রই বিচারের আওতায় আনা হবে।
সান্ধ্য পত্রিকা করাচি ডেইলি নিউজ জানিয়েছে যে, “ভারতের সঙ্গে যোগসাজশে দেশের পূর্বাঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের” অভিযোগে শেখ মুজিব ও তাঁর অজ্ঞাতনামা “সহযোগীদের” বিচার করা হবে।
এখানকার কর্মকর্তারা বলছেন যে, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে গ্রেপ্তার হওয়া শেখ মুজিব এখন পশ্চিম পাকিস্তানের কোথাও আটক আছেন। পূর্বে স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন দমনের জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ শুরু করলে তাঁকে আটক করা হয়।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাদের এই দাবির পক্ষে বিদেশে ক্রমবর্ধমান সহানুভূতি অর্জনের আশা করছে যে, ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করছে। সরকারের ভাষ্যমতে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে গোলযোগ সৃষ্টির জন্য অস্ত্র ও অনুপ্রবেশকারী পাঠাচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। [ভারত এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে।]
[গত বৃহস্পতিবার, ভারত একই সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে “বিনা উস্কানিতে ব্যাপক গোলাবর্ষণ এবং হুমকিমূলক আচরণ” করার অভিযোগ করেছে। পাকিস্তান সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।]
পাকিস্তানি রেডিও বলেছে যে, প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার পূর্বে কসবা থেকে তিন মাইল উত্তরে একটি সীমান্ত চৌকিতে শুক্রবারের হামলাটি ছিল “পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ।”
অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ
বিদেশি সহানুভূতি আদায়ের আবেদনে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভিযোগগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। রাওয়ালপিন্ডির সংবাদপত্র ‘দ্য পাকিস্তান টাইমস’-এর ভাষায় পাকিস্তানের “ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষার সংগ্রামে” অন্তত ১৭টি মুসলিম বা প্রধানত মুসলিম দেশ এই মুসলিম দেশটির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
অনেক রক্ষণশীল মুসলমানের কাছে প্রভাবশালী একটি কণ্ঠস্বর—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জেরুজালেমের প্রাক্তন মুফতি এবং বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি আরব নেতা হাজ আমিন আল হুসেইনির—আজকে যুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এবং লেবাননে বসবাসকারী হাজ আমিন, পাকিস্তানের একজন বিশিষ্ট মুসলিম নেতাকে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন, যেখানে তিনি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের নিন্দা করেছেন। তিনি পাকিস্তানি মুসলিমদের প্রতি “পাকিস্তানের সংহতি, অখণ্ডতা এবং ইসলামী মর্যাদা রক্ষার জন্য কোনো ত্যাগ স্বীকারে পিছপা না হওয়ার” আহ্বান জানিয়েছেন।
পূর্বাঞ্চলে লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে
নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২০ এপ্রিল, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৩
নয়াদিল্লি, ১৯ এপ্রিল (রয়টার্স)—পূর্ব পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি এলাকায় আজ তীব্র লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রদেশটির সীমান্ত অবরুদ্ধ করতে সর্বাত্মক আক্রমণ চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত রাতে জানা গেছে, প্রধান শহরগুলো দখলে থাকা সেনাবাহিনীটি প্রায় সমগ্র পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছে।
আজ প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে যে, প্রদেশের পশ্চিম খণ্ডে ভারতীয় সীমান্ত থেকে তিন মাইল দূরে মেহেরপুরে লড়াই চলছিল। এই প্রদেশটিকেই গত শনিবার স্বাধীন বাংলা দেশ প্রজাতন্ত্র বা বেঙ্গল নেশন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। মেহেরপুর বৈদ্যনাথলার কাছে অবস্থিত, যেখানে স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হয়েছিল।
পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির নেতৃত্বে আয়োজিত সমাবেশ
এদিকে ১৯ এপ্রিল পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জে.এ ভুট্টো করাচিতে এক বিক্ষোভ সমাবেশে বলেন, যারা পাকিস্তানকে ভাঙতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। এই সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যারা এসব বিশৃঙ্খলা করছে তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিতে হবে। তিনি বলেন ইয়াহিয়া খানের পক্ষে এখন দেশবাসির দাঁড়ানো উচিত।
পাকিস্তানের পক্ষের সাংবাদিক
কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী সাংবাদিক অত্যন্ত নগ্নভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপট এবং পাকিস্তানি বর্বরতার চিত্র এড়িয়ে গেছে। লন্ডন টাইমস প্রতিনিধি মাইকেল হর্নসবে পূর্ব-পাকিস্তানে গণহত্যা সম্পর্কের খবরকে ভারতের কাল্পনিক প্রচারণা বলে উল্লেখ করে। পাকিস্তানি বাহিনী ও দেশীয় ঘাতকদের ঢালাওভাবে সমর্থন দেয় মরক্কোর সংবাদপত্রসমূহ।
বিভিন্ন মুসলিম রাস্ট্র
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদম মালিক জানান, ইন্দোনেশিয়া ‘বাংলাদেশকে’ কখনই স্বীকৃতি দেবে না। ‘বাংলাদেশ’ আন্দোলনকে অস্বীকার এবং পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহবান জানায় ইরানের ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র।
মুজিব নগর সরকার এবিসি ফুটেজ ১৯ এপ্রিল, ১৯৭১
১৭ই এপ্রিল ১৯৭১। মেহেরপুর জেলার বৈদন্যতলা আম্রকাননে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে, যাতে উপস্থিত ছিল প্রচুর দেশী-বিদেশী সাংবাদিক। উক্ত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের খবর প্রচারিত হয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও। বৈদন্যতলার নাম তখন থেকেই জাতির জনক এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নামানুসারে মুজিবনগর।
১৯ এপ্রিল ১৯৭১ : উত্তরবঙ্গে শেষ প্রতিরোধ ও দুই অফিসারের পলায়ন
পাকিস্তানি বাহিনী পাঁচবিবির দিক থেকে হিলি আক্রমণ করে। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আমাদের চার ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সৈন্য নিহত হয়। আমাদের তীব্র আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সেদিন চরখাই থেকে দুটি কোম্পানিকে হিলিতে চলে আসার নির্দেশ দিই।
স্বাধীনতা সংগ্রামের এ পর্যায়ে ক্যাপ্টেন আশরাফ ও লেফটেন্যান্ট মোখলেস তাদের জওয়ানদের ফেলে পালিয়ে যায়।
১৯ এপ্রিল ১৯৭১ : স্বাধীনতা সংগ্রামে আগরতলা
ত্রিপুরা সিপিআই (এম) নেতা নৃপেন চক্রবর্তী এমপি, দশরথ দেব এমপি আগরতলা জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাৎ করে পূর্ব পাকিস্তানী শরণার্থীদের পাকিস্তানী ভারতীয় মুদ্রা বিনিময় সমস্যা, যানবাহন, আশ্রয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।
পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টি এক বিবৃতিতে কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র গুলো সহ পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার আহবান জানান। তারা মুক্তিবাহিনীকে অস্র সাহায্য দেয়ারও আহবান জানান। তারা বলেন আওয়ামী লীগ বিগত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে তাই তাদের সরকার বৈধ সরকার। তারা সকল প্রগতিশীল দলগুলোকে একটি যুক্তফ্রন্টে আনার জন্য নবগঠিত সরকারের প্রতিও আহবান জানান। ইয়াহিয়ার ফেসিস্ট আক্রমনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রাম যে কোন মুল্লেই জয়জুক্ত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। বিবৃতিটি বাংলাদেশের ভিতর থেকে প্রচারিত।
১৯ এপ্রিল ১৯৭১ : যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ আন্দোলন
শ্রমিক দলীয় এমপি ব্রুশ ডগলাসম্যান পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীদের অবস্থা দেখার জন্য কলকাতার উদ্দেশে লন্ডন ত্যাগ করেন। বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী ব্রিটিশ পার্লামেন্টে যেয়ে বাঙ্গালীদের প্রতি সহানুভূতিশীল এমপি পিটার শোর, ব্রুশ ডগলাস ম্যান, মাইকেল বার্নস, জন স্টোন হাউজের সাথে দেখা করেন। তারা বিচারপতি চৌধুরীকে সম্মিলিতভাবে আন্দোলন গড়ে তোলার তাগিদ দেন। মাইকেল বার্নস সহ ত্রিশ জন এমপি পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সফর বাতিলের একটি প্রস্তাব হাউজ অব কমন্স এ উপস্থাপন করেন।
১৯ এপ্রিল ১৯৭১ : কেনেথ কিটিং এর মন্তব্য বিকৃত করা হয়েছে- পাকিস্তান
বোম্বাইয়ে কেনেথ কিটিং এর মন্তব্য বিদেশী গণমাধ্যমে বিকৃত করে পরিবেশন করা হয়েছে বলে পাকিস্তান মিডিয়া দাবী করছে। কিটিং সেখানে বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটছে তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। পাকিস্তান গণমাধ্যম বলছে সে দেশের সরকারের অনুমতি ব্যতিত কিটিং কোন মন্তব্য করতে পারেন না।
রাজাকারের দিনলিপিঃ ১৯ এপ্রিল, ১৯৭১
১৯ এপ্রিল ১৯৭১ : শান্তি কমিটি অফিস ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে।
কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটি ঢাকা শহরের বিভিন্ন ইউনিট ও মহল্লায় শান্তিকমিটি গঠন এবং সেগুলোর আহবায়ক মনোনয়নের কথা ঘোষণা করে এদিন। কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে ইউনিট ও আঞ্চলিক কমিটির তৎপরতা সম্পর্কিত রিপোর্ট ঢাকার মগবাজার এলাকার ৫নং এলিফ্যান্ট লেনের কেন্দ্রীয় অফিসে পৌঁছে দিতে বলা হয়। কেন্দ্রীয় অফিস ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখে অফিস সেক্রেটারি হিসেবে মুসলিম লীগ নেতা অ্যাডভোকেট নূরুল হক মজুমদারকে সার্বক্ষণিকভাবে অফিসে মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন স্থানে শান্তিকমিটির ইউনিট গঠনের জন্যে জেলা মহকুমায় নেতা কর্মীদের পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, জনগণের অসুবিধাদি সম্পর্কে তথ্যাদি গ্রহণ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও আর্মি সেক্টরের সাহায্যে তার প্রতিকার করার জন্যে কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যেই লিয়াজোঁ অফিসাররা কাজ শুরু করেছে। ‘রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনতাকামীদের চিহ্নিত করে ক্যান্টনমেন্টে পাকী বাহিনীর কাছে তাদের নামের তালিকা পৌঁছে দেয়া ছিলো লিয়াজোঁ অফিসগুলোর মূল কাজ। আর্মি সেক্টরের সাহায্যে প্রতিকার করার নামে এরা প্রাণভয়ে লুুকিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের হত্যা করার জন্যে পাকী সেনাদের ডেকে আনে। ২৪ ঘণ্টা খুলে রেখে এসব লিয়াজোঁ অফিসগুলোকে দালালরা নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে।
বিভিন্ন এলাকার লিয়াজোঁ অফিসাররা হচ্ছে ____
কোতয়ালী থানার এআই আহমদ, সাখী সুলতান, এসএম হাবিবুল হক, ধানমন্ডি থানায় নোয়াব আলী অ্যাডভোকেট, তেজগাঁও থানায় ইকবাল ইদ্রিস, মাহবুবুর রহমান গুরহা, লালবাগ থানা ১) নাজির হোসেন, জগন্নাথ সাহা রোড ২) হাবিবুল হক ধানমণ্ডি ৩) এডভোকেট নোয়াব আলী সেন্ট্রাল রোড।
সুত্রাপুর থানা ১) সেরাজ উদ্দিন সাবেক এমপিএ, হৃষীকেশ দাস রোড ২) মাহতাব উদ্দিন খান, আরকে মিশন রোড ৩) তমিজ উদ্দিন, জরিয়াতলি লেন ৪) আব্দুর রশিদ হাটখোলা, ৫) ফজলুল হক,
তেজগাও থানা ১) ইকবাল ইদ্রিস ইন্দিরা রোড ২) মাহবুবুর রহমান ফোন ——-৩) এমএসএম হাবিবুল হক ধানমণ্ডি ৩) নোয়াব আলী হেডমাস্টার আইপিএইচ স্কুল মহাখালী, ৪) এডভোকেট নোয়াব আলী সেন্ট্রাল রোড।
মিরপুর থানায় লায়েক আহম্মদ সিদ্দিকী,
মোহাম্মদপুর থানা ১) এম এ বাকের মোহাম্মদপুর কলোনি ২) ডাঃ ওসমান ১ নং ব্লক ৩) এডভোকেট শফিকুর রহমান ঝিগাতলা ৪) সৈয়দ মোহাম্মদ ফারুক কায়েদে আজম রোড ৫) আব্দুর রহিম চৌধুরী ধানমণ্ডি।
রমনা থানা ১) এডভোকেট আতাউল হক খান মগবাজার ২) জিএ খান দিলু রোড ৩) অধ্যাপক এম এ হাসেম ——-৪) এডভোকেট জুলমত আলী খান পুরানা পল্টন ৫) ডাঃ আইউব আলী, চৌধুরীপাড়া খিলগাঁও ৬) এডভোকেট এ ওয়াদুদ মিয়া, শান্তি নগর।
এসব লিয়াজোঁ অফিসাররা পাকী সেনাদেরকে স্বাধীনতাকামীদের বাড়িতে বাড়িতে নিয়ে গেছে।
পাকী বাহিনীর দোসরদের অন্যতম সহযোগী এবং গণহত্যায় সাহায্য দানকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক মালিক মোহাম্মদ কাসিম এদিন গভর্নর হাউসে টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। ফজলুল কাদের চৌধুরী তার সহযোগীদের নিয়ে সর্বাত্মকভাবে সেনা বাহিনীর পাশে থেকে কাজ করার আশ্বাস দেয়।
রেডিওতে প্রচারিত টিক্কা খানের কুখ্যাত ভাষণের ভূয়সী প্রশংসা করে মৌলভী ফরিদ আহমদ বলে যে- গভর্নরের আশ্বাস থেকে এটা স্পষ্ট যে, সেনাবাহিনী দেশের অখন্ডতা রক্ষায় সদা তৎপর রয়েছে। সে জানায়, পূর্ব-পাকিস্তান থেকে বিশ্বাসঘাতক হিন্দুস্তানী দালাল ও দুষ্কৃতিকারীদের নির্মূল করা হয়েছে। তাই এখন ইসলাম ও পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী প্রতিটি মুসলমানের সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা কর্তব্য।
বিবৃতি প্রচারের মাধ্যমে এদিন পাকিস্তানের দুশমনদের চিরতরে উৎখাতের শপথ ঘোষণা করে মালানা নূরুজ্জামান, কৃষক শ্রমিক পার্টির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএমকে জয়নুল আবেদীন।
পাকী বাহিনীর কার্যকলাপের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন অব প্রিন্টিং এন্ড গ্রাফিক্স আর্টস ইন্ডাস্ট্রির কতিপয় কর্মকর্তা। সমিতির সহ-সভাপতি এমএ আশরাফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এরা সিদ্ধান্ত নেয় সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার।
সীমান্ত প্রদেশের জামাতের আমীর সরদার আলী খান মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করার পরিণাম সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দেয়। পাকিস্তানের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের নামার আহবান জানায় আজাদ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট সরদার আব্দুল কাইয়ুম খান।
তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, তিন, সাত ও আট;
বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদেরী;
দৈনিক পাকিস্তান, ২৯ এপ্রিল ১৯৭১
মুজিবনগর সরকার ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ/ মোহাম্মদ ফায়েকউজ্জামান
দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক সংগ্রাম ২০ ২১ এপ্রিল ১৯৭১।
একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়
দৈনিক পাকিস্তান, ২০ এপ্রিল, ১৯৭১
অমৃতবাজার পত্রিকা ২০ এপ্রিল ১৯৭১
বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম/ ড. মাহফুজুর রহমান।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-২০ এপ্রিল, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৩
দ্য টেলিগ্রাফ, ১৯ এপ্রিল ১৯৭১
টাইম ম্যাগাজিন, ১৯ এপ্রিল ১৯৭১
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্র তৃতীয় খণ্ড, সপ্তম খণ্ড ও ত্রয়োদশ খণ্ড।
প্রথম আলো, প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৯: ৩০
আহমাদ ইশতিয়াক, দি ডেইলী স্টার বাংলা, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ১১:২১ পূর্বাহ্ন, সর্বশেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৩৭ অপরাহ্ন
