ড. মামুনুর রশীদ
► প্রায় ১০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে
► আরও প্রায় ২ কোটি যোগ হবে যদি উৎপাদন ১০% কমে যায়
► ইউনূস-জামায়াত মিলে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে গত ১০ বছরের সফলতা ১৮ মাসে শেষ করে গেছে
ইউনূস-জামায়াতের দুঃশাসনের পর অনেকে প্রশ্ন করেন দেশে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে কিনা। যদিও এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই, তবে অতি সম্প্রতি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দুইটা পরিসংখান দাঁড় করতে পেরেছি। প্রথমটাতে বর্তমান কৃষি এবং শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়া এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের বাস্তবতায় প্রায় দশ (১০) কোটি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে আছে।
আর দ্বিতীয়টা অনুসারে, যদি উৎপাদন আর ১০% কমে, তাহলে প্রায় বারো (১২) কোটি মানুষ এই সীমার মধ্যে এসে যাবে। আসুন একটু বিস্তারিত জানি।
শেখ হাসিনার উন্নয়ন এবং ইউনূস-জামায়াতের শোষণ
সমন্বিত অর্থনৈতিক, সামাজিক অবকাঠামো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সকল শ্রেণীর মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে আসার সফল চেষ্টা করেছিলেন শেখ হাসিনা। তার সময়ে বাংলাদেশ ২০১০ সালের ১২.২% অতিদারিদ্র্য ২০২৩ সালে ৫% এ নেমে আসে। ২০২৫ সালে পিপিআরসি গৃহস্থালীর আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সমীক্ষায় প্রকাশ করে যে অতিদারিদ্র্য বেড়ে ৯.৩৫% হয়েছে এবং দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে আছে।
সোজা ভাষায়, ২০১০-২০২২ সালের মধ্যে শেখ হাসিনার ৩ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার বাইরে নিয়ে এসেছেন।
আমার আগের একটা লেখায় আমি দেখিয়েছি যে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার বছর দেশের অতিদারিদ্র্যের পরিমাণ ৫% নিচে চলে এসেছিলো। সে সময় ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্য ছিলো আমার মতে ১৮% এর মতো (৫% + ১৩%)।
ইউনূস এবং জামায়াতের ১৮ মাসের শোষণে এই দারিদ্র্যসীমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালের বিশ্বব্যাংকের তথ্য মোতাবেক প্রায় ৬ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে বসবাস করছিলো। তার মানে, মাত্র এক বছরে ইউনূস-জামায়াত রেজিম বাংলাদেশের দারিদ্র্য বাড়িয়ে গেছে ১৫% এর উপরে।
ইউনূস এবং জামায়াতের শোষণে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে প্রায় ১০ বছরের (২০১৬-২০২৫) সাফল্য বিসর্জন দিতে হয়েছে।
দুইটা এক্সপেরিমেন্ট
২.১) ইউনূসের শেষের ছয় মাস এবং তারেক রহমানের (আইএমএফ) সরকারের প্রথম তিন মাস
এই নয় মাসকে আমি তিনটা নতুন সংকট থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। এগুলো হচ্ছে:
ক) কৃষিখাতে সার, বীজ এবং সেচ সংকট,
খ) শিল্পখাতে উৎপাদন সংকট, এবং
গ) মধ্যপ্রাচ্য এবং জ্বালানি সংকটে দেশের নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয়-ব্যয় সংকট।
আসুন এগুলোর প্যারামিটারগুলো একটু বিস্তারিত দেখি।
কৃষির উৎপাদন ব্যাহত
বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানের ৪০% এখনও কৃষিখাতে কাজ করে। দেশীয় মোট উৎপাদনে কৃষির অবদান কমে ১১% এ নেমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে ইউনূস-জামায়াতের ১৮ মাসে বার্ষিক কৃষি প্রবৃদ্ধি ৩.২১% (২০২৩-২৪) থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে ১.৭৯% হয়েছে। একই সময়ে কৃষিতে ভর্তুকি কমেছে ৩২%।
সময়মত সার এবং সেচের অভাবের পাশে যোগ হয়েছে কৃষি পণ্যের দাম কমানোর নাম করে ইউনূস-জামায়াত রেজিমের সময়মত কৃষি পণ্য উপযুক্ত দামে না কেনা। এর প্রভাবে অতি সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা গেছে যেখানে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে ৪০-৬০ টাকা, সেখানে প্রতি মণ আলু বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে ২০৫০ সালের মধ্যে ধান উৎপাদনে ফলনের ক্ষতি হবে ১৪% এবং গম উৎপাদনে ক্ষতি হবে ৭৬%। এর মধ্যে একটি বড় দেশের সাথে কৃষি পণ্যের ক্রয়ের ব্যপারে একটা ডাকাতি চুক্তি করেছে ইউনূস-জামায়াত রেজিম। যার কারণে বাংলাদেশের কৃষি নিয়ে যে কোনো ধরনের আশা করা একই সাথে বিলাসিতা এবং মিথ্যাচার।
শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত
মব করে, আগুন জালিয়ে এবং ব্যাঙ্কিং খাতের অচলাবস্থার কারণে বন্ধ হয়েছে হাজারের উপর রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এর প্রভাব পড়েছে সরাসরি কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের উপর। বিবিএস দেখাচ্ছে যেখানে ২০২১-২২ সালে শিল্পখাতে প্রবৃদ্ধি ছিলো ৯.৮৬%, সেখানে ২৪ এর শেষে তা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৬৬% এ। ২০২৫ এ তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ০.৮৯%, যা ২০২৪ সালে ছিলো ৭.২৩%।
বিকেএমইএ বলছে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন কমেছে ২০-৩০%। এপ্রিল ২০২৫ নাগাদ, আইএমএফ এর শর্ত মানতে গিয়ে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় ৩৩%। জ্বালানি সমস্যার কারণে একই সময়ে স্টিল উৎপাদন কমেছে ২৫-৩০%, সিরামিক খাতে কমেছে ৫০% এবং টেক্সটাইল মিলগুলোতে উৎপাদন কমেছে ৩০-৪০%।
জ্বালানি রাজনীতি
শেখ হাসিনার সময় শিল্পখাতে জ্বালানি ৮০% আসতো প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, যা ২০২৫ সালে নেমে দাঁড়িয়েছে ৪০% এ। এতে আমদানীকৃত জ্বালানির উপর নির্ভরশীলতা ছড়িয়ে গেছে ৫৬%। শিল্পখাতে লোডশেডিং এর পরিমাণ উঠে এসেছে ২ ঘণ্টায় (১০ ঘণ্টার দৈনিক মোট শিফট)। যাতায়াত খাতে জ্বালানির খরচ বৃদ্ধির প্রভাবে খরচ বাড়ছে প্রায় ১৫-২৫%। ১৯% বা তার বেশি টেক্সটাইল মিল চলছে ৫০% বা তার কম সক্ষমতায়।
তেলের দাম ১০ ডলার বাড়লে বাৎসরিক জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত খরচ ১ বিলিয়ন ডলারের উপর। ব্যবহার না করেও বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ খরচ হয়েছে ১৭,১৯৩ কোটি টাকা। ২৫,৯৫১ মেগাওয়াট এর স্থাপিত সক্ষমতা থাকার পরেও রাজনৈতিক বিভাজনের খেলায় স্থাপিত ক্ষমতার অর্ধেকের বেশি অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের রপ্তানিতেও যা গত আট মাস যাবৎ কমছেই। তৈরি পোশাক উৎপাদন কমেছে ৫০% এর বেশি।
২.২) বর্তমান অবস্থা যদি আরও খারাপ হয়
যদিও কিছুটা অপ্রত্যাশিত, আমি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ১০% কমিয়ে দেখতে চেয়েছি (একযোগে এবং দ্বিমাত্রিক – সিমাল্টেনিয়াস এন্ড বিভারিয়েট) এর প্রভাব দারিদ্র্যসীমার উপর কতটুকু পড়ছে। এই ১০% প্রবৃদ্ধি পড়ে যাওয়ার সম্ভাব্যতা এসেছে “অপর্চুনিটি লস” থেকে। শেখ হাসিনার সময়ে গড়ে ৬.৫% হারে উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এখন গত দুই বছরে তা গড়ে নেমে এসেছে ৩.৫% এ। এ বছর এটা আরও কম হবে বলে আমি আগে হিসেব দিয়েছি। আমার মতে ২৫-২৬ এর গড় প্রবৃদ্ধি ঠেকবে ২.৫-২.৮% এর কাছাকাছি কোনো একটা হারে।
এখন টানা দুই-তিন বছর যদি গড় অপর্চুনিটি লস ৩% (৬.৫% – ৩.৫%) এর কাছাকাছি হয়, তাতে আমার মোট প্রবৃদ্ধির অবনমন হয়েছে প্রায় ৯%। এটাকে স্ট্যাটিক হিসেবে না দেখে আমি ডাইনামিক হিসেবে দেখেছি। যেমন ধরেন, উৎপাদন কমে গেলে অন্যান্য আরও অনেক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান খারাপ অবস্থা নির্দেশ করে। তার মানে একটা ডাইনামিক (এবং ডমিনো) এফেক্ট তৈরি হয়। সেগুলোকে মাথায় রেখে ১০% প্রবৃদ্ধির কমে যাওয়া অপ্রত্যাশিত হলেও অসম্ভব নয়।
আমার অনুসন্ধানে দারিদ্র্যসীমার পরিবর্তন
তাহলে দুইটা অবস্থার পার্থক্য কেমন হতে পারে? সংযুক্তি থেকে দেখতে পাচ্ছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কয়েকটি ভাগে দেখানো হয়েছে, যেমন চরম দরিদ্র, বহুমাত্রিক দরিদ্র। আমার অনুসন্ধানে বর্তমান সমস্যার আশু সমাধান না হলে প্রায় ১০ কোটির কাছাকাছি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্যসীমার মধ্যে প্রবেশ করবে। কিন্তু যদি উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ১০% কমে যায়, তাতে আরও ১.৫০ কোটি মানুষ এর সাথে যোগ হবে।
আমাদের কী করার আছে এখন?
ওটা নিয়ে অনেক লেখা আছে। আমারটা আপনাদের পছন্দ নাও হতে পারে। আমি আগে অনেকবার বলেছি, দেশকে ইউনূস-রাজাকার যে অবস্থায় রেখে গেছে, সেখান থেকে উত্তরণে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই। আমি আপনি দেশের বাইরে চলে যেতে পারবো। ৭০% মানুষ পারবে না। তাদের জীবন জীবিকা ধ্বংসের দায় নেবেন আপনি?
তথ্যসূত্র
Asian Development Bank (ADB). (2024). Bangladesh Poverty Fact Sheet. ADB Basic Statistics.
Bangladesh Bureau of Statistics (BBS). (2025). Provisional GDP Data FY2024-25. Government of Bangladesh.
Bangladesh Institute of Development Studies (BIDS). (2024). Small Area Estimate (SAE) of Poverty 2022: Trends and Disparities in Selected Districts. BIDS.
Centre for Policy Dialogue (CPD). (2025). Power and Energy Crisis in Bangladesh. CPD Policy Paper
Institute for Energy Economics and Financial Analysis (IEEFA). (2025). Heavy Import Reliance Fuels
Bangladesh’s Power Sector Woes. IEEFA
Ministry of Finance, Government of Bangladesh. (2024). Bangladesh Economic Review 2024. Finance Division
Power and Participation Research Centre (PPRC). (2025). Bangladesh Poverty Survey 2025. PPRC
United Nations Development Programme & Oxford Poverty and Human Development Initiative (OPHI). (2024)
Global Multidimensional Poverty Index 2024. UNDP/OPHI
World Bank. (2025). Bangladesh Poverty and Equity Assessment 2025. World Bank Group
World Bank. (2025). Bangladesh Development Update, April 2025. World Bank Group
লেখক পরিচিতি: অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক
