মনোয়ার জাহান চৌধুরী
২০০৬ সালের শেষ দিকে সুনামগঞ্জে গিয়েছিলাম একটা অন্যরকম গল্পের খোঁজে। মরমী সাধক হাসন রাজার রক্ত যাঁদের শিরায়, সেই ঘরে তখন রাজনীতির উত্তাপ।
শিরোনাম দিয়েছিলাম ‘হাসন রাজার ঘরে রাজনীতির আগুন’। দুই ভাইয়ের মুখোমুখি বসেছিলাম—সাবেক এমপি দেওয়ান শামসুল আবেদীন আর সাম্যের কবি সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মমিনুল মউজদীন।
আজ সেই আগুন নিভে গেছে। গত রোববার চলে গেলেন দেওয়ান শামসুল আবেদীন ভাই। আর মউজদীন ভাই তো ২০০৭ সালেই এক সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গিয়েছিলেন, অকালে।
দেওয়ান শামসুল আবেদীন : প্রজ্ঞার বটবৃক্ষ
আবেদীন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললে মনে হতো ইতিহাস কথা বলছে। হাসন রাজার প্রপৌত্র হয়েও তাঁর পায়ে ছিল মাটির স্পর্শ। রাজনীতি করতেন, কিন্তু গলায় সুর ছিল না দম্ভের। বরং ছিল দায়িত্বের ভার।
সেদিন ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, “হাসন রাজা গানে গানে মানুষকে জাগাতেন, আমরা মাঠে নেমে সেই মানুষের অধিকার আদায় করতে চাই।” তাঁর চোখে ছিল স্বপ্ন, কথায় ছিল যুক্তি। দল করতেন, কিন্তু অন্ধ ছিলেন না।
হাসন রাজার ‘লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার’ গানের মতোই তিনিও নিজের ঘর, নিজের অঞ্চলের না-পাওয়াগুলো নিয়ে অস্থির থাকতেন। গত রোববার সেই অস্থিরতাটা থেমে গেল চিরতরে।
মমিনুল মউজদীন : সুনামগঞ্জ পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান, সাম্যের ফেরিওয়ালা মউজদীন ভাই! তাঁকে দেখলেই নজরুলের কথা মনে পড়ত। তাই তো ‘সাম্যের কবি’ ডাকতাম। রাজনীতির মাঠে নেমেও কবিতা ছাড়েননি।
মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে যখন স্লোগান দিতেন, মনে হতো কোনো কবিতার পঙ্ক্তি আওড়াচ্ছেন।
বলতেন, “ক্ষমতা মানে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষকে ছাড়িয়ে যাওয়া না।” হাসন রাজার উত্তরসূরি হয়ে তিনিও জাত-পাত, ধনী-গরিব মানতেন না। গরিবের উঠানে বসে চা খেতেন, কৃষকের কাঁধে হাত রাখতেন।
২০০৭ সালের সেই অভিশপ্ত সড়ক তাঁর কণ্ঠটা কেড়ে নিল। সাম্যের গানটা অসমাপ্তই রয়ে গেল।
দুই ভাই, এক রক্ত, দুই রকম চলে যাওয়া।
একজন গেলেন বয়সের নিয়মে, ধীরে ধীরে নিভে। আরেকজন গেলেন ঝড়ের মতো, হঠাৎ। কিন্তু দু’জনের ভেতরেই একটা আগুন ছিল—হাসন রাজার ঘরের সেই রাজনীতির আগুন। সে আগুন দখলের জন্য নয়, আলো দেয়ার জন্য। মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ।
আজ সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী গ্রামে হাসন রাজার বাড়িটা আরও একটু নিঝুম হয়ে গেল। যে ঘরে একসময় মরমী গানের আসর বসত, পরে রাজনীতির তর্ক হতো, সেই ঘরের দুটো বাতিই নিভে গেল একে একে।
আমার সেই প্রতিবেদনের কাগজটা এখন স্মৃতি হয়ে আছে। আর স্মৃতিতে ভাসছে দুই ভাইয়ের হাসিমুখ। আবেদীন ভাইয়ের ধীর কথন, আর মউজদীন ভাইয়ের কবিতা-মাখা স্লোগান।
হাসন রাজা লিখেছিলেন, “মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়া রে, কান্দে হাসন রাজা মন মনিয়া রে”।
আজ মনে হয়, তাঁর দুই প্রপৌত্রও সেই মাটির পিঞ্জিরা ছেড়ে উড়ে গেলেন। রয়ে গেল শুধু তাঁদের কাজ, তাঁদের স্বপ্ন, আর আমাদের দীর্ঘশ্বাস।
ওপারে ভালো থাকুন আবেদীন ভাই। ভালো থাকুন, সাম্যের কবি মউজদীন ভাই।
হাসন রাজার ঘরের আগুনটা হয়তো নিভল, কিন্তু আপনাদের রেখে যাওয়া আলোটা থেকে যাবে সুনামগঞ্জের বাতাসে। ( ফেইসবুক থেকে)
