পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সর্বোচ্চ ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের বিলের স্ল্যাব একীভূত করা, বেসরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাণিজ্যিক বিলের আওতায় আনা এবং গণশুনানি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) জমা দেওয়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও কয়েকটি বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে দেশের প্রায় ৪ কোটি ৯৫ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়বেন।
সাধারণ মানুষ ও ভোক্তা সমাজের প্রশ্ন: জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার কি আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্ত মেটাতে গিয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের পকেটে হাত দিচ্ছে?
জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান লোকসানের কারণ দেখিয়ে পিডিবি পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো খুচরা পর্যায়ে ১৫ থেকে ২৯ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর আবেদন জমা দিয়েছে।
বিদ্যমান ট্যারিফ কাঠামোর কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিতরণ সংস্থাগুলোর সম্মিলিত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকায়।
সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, সমন্বয় না করা হলে ২০২৬ অর্থবছরে এই ঘাটতি ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এই লোকসানের দায় কি সাধারণ গ্রাহকের? যে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উৎপাদন না করেও কোটি কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে, সেই অপরিকল্পিত চুক্তির খেসারত কেন জনগণ দেবে?
নেটিজেনরা সরাসরি বলছেন, বিদেশি প্রভুদের খুশি করতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার।
পর্যালোচনা করা নথির বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রস্তাব কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে মাসে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর।
বর্তমানে আবাসিক গ্রাহকেরা কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন তার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে বিল নির্ধারিত হয়, যেখানে প্রথম ৭৫ ইউনিটের দাম সবচেয়ে কম।
পিডিবি এখন শূন্য থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত একটিমাত্র ধাপ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ৭৫ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীরা প্রথম ধাপের কম দামের সুবিধা হারাবেন।
হিসাব করলে দেখা যায়, বর্তমানে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী একজন গ্রাহক ধাপে ধাপে ১ হাজার ২৯৪ টাকা ৫০ পয়সা বিল দেন। প্রস্তাব অনুযায়ী শুধু ধাপ বদলের কারণেই এই বিল ১৪৫ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে ১ হাজার ৪৪০ টাকা হবে।
এর সঙ্গে পিডিবির প্রস্তাবিত নতুন দর কার্যকর হলে ওই গ্রাহকের বিল আরও বেড়ে ১ হাজার ৬৪০ টাকায় গিয়ে ঠেকবে — অর্থাৎ মোট বৃদ্ধি ৩৪৫ টাকা ৫০ পয়সা।
ভোক্তা সমাজ বলছে, স্ল্যাব একীভূত করার মাধ্যমে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ — যাদের বিদ্যুতের ব্যবহার খুবই সীমিত — তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের পার্থক্য ঘুচে যাবে। ফলে দরিদ্রশ্রেণির মানুষ চরমভাবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হবেন।
প্রস্তাবের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, পিডিবি চাইছে জ্বালানির দাম বাড়লে প্রতি ছয় মাস পরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করার ব্যবস্থা চালু হোক।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), ডেসকো ও নেসকোর প্রস্তাবে উল্লেখিত ‘পাস-থ্রু’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পাইকারি দাম বাড়লে তা সরাসরি গ্রাহকের খুচরা বিলে যুক্ত হয়ে যাবে।
এর মানে দাঁড়ায়, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে কোনো গণশুনানি বা জনমত যাচাই ছাড়াই বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাবে। ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে নাগরিকদের হাতে কার্যত আর কোনো সুরক্ষা থাকবে না।
আরও যা থাকছে প্রস্তাবে
অন্যান্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে: নতুন ভবন নির্মাণে বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রচলিত বাণিজ্যিক ট্যারিফের দ্বিগুণ হারে বিল আদায়; ইজিবাইক চার্জিং স্টেশনের আলাদা ট্যারিফ বাতিল করে সরাসরি বাণিজ্যিক রেট আরোপ; প্রিপেইড মিটারে রিচার্জে প্রচলিত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ছাড় বাতিল বা কমানো; এবং প্রিপেইড গ্রাহকদের জন্য নতুন করে জামানত বা সিকিউরিটি চার্জ আরোপ।
ডিপিডিসি বস্তি এলাকার জন্যও বিদ্যমান ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা তুলে দিয়ে ফ্ল্যাট ট্যারিফ চালুর প্রস্তাব দিয়েছে। অধিকাংশ সংস্থাই আগামী ১ জুন থেকে নতুন দাম কার্যকর করতে চাইছে।
এই প্রস্তাব সামনে আসার পর সাধারণ মানুষ ও নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
অনেকে মন্তব্য করছেন, অতীতেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে অনেক সংকট মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশ, কিন্তু এভাবে গ্রাহকদের ওপর একসঙ্গে এত বোঝা চাপানো হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিতরণ কোম্পানির অব্যবস্থাপনার দায় জনগণের কাঁধে না চাপিয়ে কাঠামোগত সংস্কারের পথে কেন যাচ্ছে না সরকার।
