সেজুল হোসেন
বছরের পর বছর শুধু ঘটনা ঘটার পরে ফেসবুকে জনদাবির কারণেই বিচার হবে? রাষ্ট্রের এই বিষয়ে কোনো দায় নেই? আইন কী বলে? সংবিধান কী বলে? সরকারের দায়বদ্ধতা কী বলে? রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কী বলে?
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০— এগুলোর কথা খুব কাগজে-কলমে শোনা যায়। সংবিধানও যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ। সেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার নিয়ে কত কিছু বলা আছে। তবু জনগণকে মাঠে নামতে হয়, ফেসবুকে প্রতিবাদের মুখে সরকারের টনক নড়াতে হয়। না হলে বিচার এগোয় না, বিচার হয় না।
গত ১০ বছরের হিসাব দেখুন। শুধুমাত্র লিখিত অভিযোগের হিসেবমতে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে অন্তত ৫,৬৩২ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যাটা কেউ জানে না। ২০২৩ সালে ৫,১৯১টি এবং ২০২৪ সালে ৪,৩৯৪টি ধর্ষণ মামলা দায়ের হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ভুক্তভোগী ১৩ জন।
২০২৫ সালে শুধু প্রথম ৭ মাসেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৭৫%। এর মধ্যে ৪৯ জন ছিল মাত্র ০–৬ বছর বয়সী। এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ১২ বছরের নিচে ৫৬ জন মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ৬ বছরেরও কম।
একটু ঘেঁটে দেখলাম, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে এখন বিচারের অপেক্ষায় ১,৩২,১০৭টি মামলা। এর মধ্যে ৩০,৩৬৫টি মামলা ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলছে। শিশু-সংক্রান্ত মামলায় সাজার হার ০.৫২%, নারী-সংক্রান্ত মামলায় ২.৬১%। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় গত ৫ বছরে এই ধরনের মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র ২৪ জনের।
অন্যদিকে মসজিদ ও মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকারের ঘটনা কমছে না, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। কী পরিমাণ বাড়ছে, সেই পরিসংখ্যানও কেউ রাখছে না। রাষ্ট্র আসলে এসব গুনতে চায় না। গুনলেই সমস্যা।
পুরুষের এই বিকৃতি হঠাৎ বাড়েনি। এর পেছনে অবশ্যই কাঠামোগত কারণ আছে। যখন ধর্ষক জানে তার শাস্তি হবে না, তখন অপরাধ করতে তার ভয় করে না। দেখুন, সাজার হার ০.৫%। মানে ৯৯.৫% ধর্ষকই মুক্ত থেকে যাচ্ছে।
আর আমাদের সমাজ কতটা বর্বর! এখনও একটা শিশুর গায়ে কী পরেছিল, কতটা সেজেছিল, এসব প্রশ্ন করা হয়। সমাজের এই মানসিকতা অপরাধীকে ভিতরে ভিতরে সাহস দেয়, কারণ সে জানে তার বিরুদ্ধে বিচারের দাবি উঠলে কেউ না কেউ পোশাক আর সাজসজ্জার প্রসঙ্গ তুলে ঘটনাকে হালকা করার চেষ্টা করবে।
আবার দেখুন, বেশিরভাগ মামলা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না। পরিবার, সালিশ, গ্রাম্য মাতবর টাকার বিনিময়ে মীমাংসা করিয়ে দেয়, কিংবা বিয়ে পড়িয়ে দেয়।
আরেকটি বিষয় হলো অপ্রতিরোধ্য পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা। নিয়ন্ত্রণহীন পর্নোগ্রাফি এবং যৌনশিক্ষার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি একটি বিপজ্জনক সমীকরণ তৈরি করেছে।
যেসব মোল্লারা বলে “শয়তানের ধোঁকায় পড়ে” বলাৎকার করেছে, তাদের মোবাইল ঘেঁটে দেখুন, বাড়িতে ৩–৪টা বউ রেখে এসে মোবাইলে পর্ন দেখে শিশুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
মাদ্রাসার বোর্ডিং ও হোস্টেলগুলো, যেখানে শিশুরা থাকে, সেখানে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। শিশুগুলো সবচেয়ে অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এত ঘটনার পরও মানুষ কী বিশ্বাসে বাচ্চাদের এভাবে রেখে যায়, সেটা আমার মাথায় আসে না।
ধর্ষণের যে সংখ্যাগুলো বললাম, এই সংখ্যাগুলো শুধু স্ট্যাটিস্টিকস না, এগুলোর প্রতিটা একটি শিশু, একটি ভেঙে পড়া পরিবার, একটি রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।
আর রাষ্ট্রে বিচারহীনতা মানে অনুমতি। সহজ হিসাব, এই রাষ্ট্র প্রতিদিন নতুন ধর্ষকদের অনুমতি দিচ্ছে।
দয়া করে আপনার শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজে নিন। যৌনবিকৃত পুরুষ আশপাশেই ঘুরছে। এরপর আপনার রামিসা যে খবর হবে না, এই দেশে সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না।
লেখক- গীতিকার ও বিশ্লেষক।
