ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত ৫ জুন শুক্রবার একটি যুগান্তকারী রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের একাধিক অভিবাসন নীতি সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছে। রোড আইল্যান্ডের প্রোভিডেন্স শহরে অবস্থিত ফেডারেল আদালতের প্রধান বিচারক জন ম্যাককনেল ১৩৫ পৃষ্ঠার এই বিশাল রায়ে রায় দেন যে, মার্কিন সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস বা ইউএসসিআইএস আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ৩৯টি দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে একের পর এক অবৈধ নীতি চাপিয়ে দিয়েছে।
গত বছরের থ্যাংকসগিভিং সপ্তাহে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুজন ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে গুলি করার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকা আরও বিস্তৃত করে। সন্দেহভাজন হামলাকারী একজন আফগান নাগরিক, যিনি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে আশ্রয় পান। সেই হামলায় একজন সেনাসদস্য নিহত এবং আরেকজন গুরুতর আহত হন।
ট্রাম্প প্রশাসন এই ঘটনার জের ধরে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকা আগের ১৯টি দেশ থেকে বাড়িয়ে ৩৯টি দেশে সম্প্রসারিত করে। নতুন করে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয় লাওস, সিয়েরা লিওন, বুরকিনা ফাসো, মালি, নাইজার, দক্ষিণ সুদান এবং সিরিয়াকে। একই সাথে আরও ১৫টি দেশের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, সেনেগাল, তানজানিয়া, গাম্বিয়া, মরিতানিয়া, অ্যাঙ্গোলা, গ্যাবন, জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়েসহ মূলত আফ্রিকার দেশগুলো।
হোয়াইট হাউস বলেছিল, তালিকাভুক্ত দেশগুলো নিরাপত্তা যাচাই ও তথ্য আদান-প্রদানে মারাত্মক ঘাটতি প্রদর্শন করেছে। এই নিষেধাজ্ঞায় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের জারি করা ভ্রমণ দলিলধারীদের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
ইউএসসিআইএস এই ৩৯টি দেশের নাগরিকদের আশ্রয়, কাজের অনুমতিপত্র, গ্রিন কার্ড এবং নাগরিকত্বসহ যাবতীয় অভিবাসন সুবিধার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। এর বাইরেও বিশ্বের যেকোনো দেশের নাগরিকের আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয় এবং বাইডেন আমলে এই ৩৯টি দেশের নাগরিকদের দেওয়া সমস্ত অভিবাসন সুবিধা পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেওয়া হয়। হাজার হাজার অভিবাসীর নাগরিকত্বের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হঠাৎ করে বাতিল করে দেওয়া হয়, যার ফলে যারা বছরের পর বছর ধরে আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলে নাগরিকত্বের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, তারা হঠাৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন।
এই নীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে অভিবাসী সেবা সংগঠন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের একটি জোট গত মার্চ মাসে মামলা দায়ের করে। মামলায় অভিযোগ আনা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন কোনো আইনগত ভিত্তি ছাড়াই প্রশাসনিক আদেশবলে এমন নীতি চাপিয়ে দিয়েছে, যা সংসদ প্রণীত অভিবাসন আইনকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। দীর্ঘ শুনানির পর বিচারক ম্যাককনেল রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেন।
বিচারক ম্যাককনেল, যিনি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কর্তৃক নিযুক্ত হয়েছিলেন, রায়ে বলেন যে এই নীতিগুলো অগণিত অভিবাসীর জীবনকে অনির্দিষ্টকালীন আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তিনি আরও লেখেন যে এই স্থগিতাদেশ আক্রান্ত ব্যক্তিরা কোনো ভুল না করেও শুধুমাত্র জন্মস্থানের কারণে মাসের পর মাস অপেক্ষায় আটকে রয়েছেন।
রায়ে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে অভিবাসন বিষয়ক আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়, যারা আমেরিকায় আসতে চান তারা যেন আইন মেনে “সঠিক পথে” আসেন। বিচারক বলেন, এই মামলার বাদীরা ঠিক তাই-ই করেছিলেন — কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্থাই আইন মেনে চলেনি। তিনি লেখেন, “আইনের শাসন সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে স্পষ্ট যে ইউএসসিআইএস নিজেই আইন অনুসরণ করেনি বা সঠিক পথে কাজ করেনি। বরং সংস্থাটি সেই অভিবাসন আইনই লঙ্ঘন করেছে, যা কংগ্রেস তাদের পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল।”
এই রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনকে এখন অবিলম্বে ৩৯টি দেশের নাগরিকদের গ্রিন কার্ড, আশ্রয়, কর্মসংস্থান অনুমতি এবং নাগরিকত্বের আবেদন পুনরায় প্রক্রিয়াকরণ শুরু করতে হবে। যেসব অভিবাসী সময়-সীমাবদ্ধ ভিসায় বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন, এই স্থগিতাদেশ তাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। এই রায় অভিবাসী ও তাদের সমর্থকদের জন্য একটি বড় বিজয়। পাশাপাশি হাজার হাজার অভিবাসীর জন্য বাতিল হয়ে যাওয়া নাগরিকত্বের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানও আবার আয়োজন করতে হবে।
রায়ের পর অভিবাসন সমর্থকরা প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করেননি। যুক্তরাষ্ট্রে আফগান শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন #AfghanEvac-এর প্রেসিডেন্ট শন ভ্যানডাইভার বলেন, মাসের পর মাস তারা এমন আফগান মিত্রদের কথা শুনেছেন যাদের নাগরিকত্বের অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেছে, কর্ম-অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অথচ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থেকে থেকে গ্রিন কার্ডের আবেদন এগোয়নি এক চুলও — যদিও তারা প্রতিটি শর্ত পুরোপুরি মেনে চলেছিলেন। তিনি এই রায়কে আইনের শাসন এবং সঠিক পথে চলা হাজার হাজার আফগান ও অন্যান্য অভিবাসীর জন্য বড় একটি জয় হিসেবে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প প্রশাসন এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে বলে আইন বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এখন পর্যন্ত এই রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন কঠোরীকরণ নীতির বিরুদ্ধে আদালতে বারবার ধাক্কা খাওয়ার এই ধারা প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে অভিবাসন ও নিরাপত্তা এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়কে এক করে দেখার বিপদ রয়েছে, কারণ পরিসংখ্যান বারবার দেখিয়েছে যে অভিবাসীদের মধ্যে অপরাধ ও কারাবাসের হার মার্কিন জন্মগ্রহণকারীদের তুলনায় কম।
