সাত জেলায় সেনা, পাঁচ জেলায় বিজিবি, সারাদেশে পুলিশ মোতায়েন; অথচ যে দল “নেই”, সেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ কেন?
২২ জুন ২০২৬। পুরো বাংলাদেশজুড়ে চলছে এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠা। সরকার বলছে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, তাদের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জনসমক্ষে ঘোষণা দিচ্ছেন, “আওয়ামী লীগ নামে কোনো সংগঠন নেই।” একই দিনে, এই “বিলুপ্ত” সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলো। যশোর সেনানিবাস থেকে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের সেনাসদস্যরা ছুটে গেল গোপালগঞ্জে। কিছুক্ষণ পর আরেক আদেশ, কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর ও মৌলভীবাজারসহ আরও পাঁচ জেলায় নামলো বিজিবি। দেশের বাকি জেলাগুলোতে বিজিবি সদস্যদের স্ট্যান্ডবাই রাখা হলো, অর্থাৎ যেকোনো মুহূর্তে নামার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। এই পুরো তৎপরতা যদি একটিমাত্র প্রশ্নের জন্ম না দেয়, তাহলে রাজনৈতিক বোধশক্তির চূড়ান্ত দেউলিয়াত্ব ছাড়া কিছু নয়। একটি রাজনৈতিক দল যদি সত্যিই নিশ্চিহ্ন, নিষ্ক্রিয় ও অতীত হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে তার একটি জন্মদিনকে ঘিরে এ ধরনের সামরিক প্রস্তুতির দরকার কী?
এই দৃশ্যটা ক্ষমতাসীনদের নিজস্ব ভাষ্যকেই সবচেয়ে নিষ্ঠুরভাবে খণ্ডন করে। কেউ শূন্যতাকে ভয় পায় না। ছায়াকে ভয় পেতে পারে, যদি তার পেছনে বাস্তব কোনো শরীর থেকে থাকে। আওয়ামী লীগ নামের এই “ছায়াটি” যে এখনো সুবিশাল এক রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়, ২৩ জুনের এই আয়োজন তারই জীবন্ত প্রমাণ।
ক্ষমতার এই ভয়ের পেছনে মূল কারণটা কী? শুধু একটা পুরনো দলের প্রতি সীমাহীন ভয় নয় নয়, বরং ২০২৪ সালের জুলাই দাঙ্গার পর থেকে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতায় বসা শক্তিগুলোর মৌলিক বৈধতা সংকট। বিদেশী রাষ্ট্রের অর্থায়ন, ইসলামিক জঙ্গি সংগঠনের মদদ এবং সামরিক বাহিনীর একটি অংশের সমর্থনে যে পটপরিবর্তন ঘটেছিল, তার পুরো প্রক্রিয়াটা ছিল নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, কোনো গণঅভ্যুত্থান নয়। সেই ক্যু শেষে ইউনুসের নেতৃত্বাধীন যে প্রশাসন ক্ষমতায় বসে, তার পুরো মেয়াদজুড়েই চলেছে একটি সুসংহত প্রকল্প, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে স্থায়ীভাবে নির্মূল করা। সেই লক্ষ্যে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফেরার সব পথ বন্ধ থাকে।
কিন্তু নিষিদ্ধ করাই শেষ কথা নয়। কারণ আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্য যেকোনো দলের তুলনায় ভিন্ন এক দলের নাম। এর জন্ম এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতার জন্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একে নিষিদ্ধ করার অর্থ স্বাধীনতার ইতিহাসের একটা অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবৈধ ঘোষণা করা। ফ্যাসিস্ট সরকারও জানে, কাগজে-কলমে নিষিদ্ধ করলেই জনমানস থেকে ওই ইতিহাস মুছে যায় না। তাই ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে যখন বিএনপি-জামায়াত গং সরাসরি ক্ষমতার রাশ টেনে নেয়, তখন থেকেই শুরু হয় উৎখাতের দ্বিতীয় অধ্যায়। শুরু হয় গণগ্রেপ্তার, গুম ও চিরাচরিত নির্যাতনের রাজনীতি।
মাসখানেক আগে থেকে পুলিশ, ডিবি, এসবির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের যেকোনো স্তরের নেতাকর্মীকে ধরে ধরে হয়রানি, গ্রেপ্তার, এমনকি গুম করার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা মূলত একটি বার্তা দিতে চায়: আওয়ামী লীগ নামক চিন্তাটিও যেন ভবিষ্যতে আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু আজকের এই সামরিক মোতায়েন বলে দিচ্ছে, তাদের সে পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত। ভয়ের কারণ কী, সেটা বোঝার জন্য গোপালগঞ্জের কথা ভাবাই যথেষ্ট। গোপালগঞ্জ কোনো সাধারণ জেলা নয়। এটা আওয়ামী লীগের জন্মভিটা, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত ভূমি। এই একটি জেলাকে ঘিরে এতটা সামরিক ত্রাস সৃষ্টি করা মানে এটা মেনে নেওয়া যে, সেখানকার মাটি আর মানুষের মধ্যে এখনো এমন একটা শক্তি সুপ্ত আছে, যা জাগ্রত হলে এই পুরো দখলদার কাঠামোটা ভেঙে পড়তে পারে।
এর বাইরে আরেকটা নির্মম রাজনৈতিক বাস্তবতা এখানে কাজ করে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী, যারা বিএনপি-জামায়াতের হাত ধরে ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য একটা বড় হুমকি প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। সেই হুমকিটা হলো গণমানুষের স্মৃতি। জিয়াউর রহমানের তৈরি সেনানিবাসকেন্দ্রিক রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে সখ্যতা আর দুর্নীতি-সন্ত্রাসের যে সংস্কৃতি তারা লালন করে, তার কোনো ধরনের জনসমর্থন পাওয়ার ভিত্তি নেই, যদি না সামনে কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ থাকে, যার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে নিজেদের জাস্টিফাই করা যায়। কিন্তু যখন সেই প্রতিপক্ষই রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ, তখন শত্রু শূন্য হয়ে যায়। আর শত্রুহীন শাসকের রাজনৈতিক বার্তা ফুরিয়ে যায়। এই ফুরিয়ে যাওয়া আটকাতেই তাদের প্রয়োজন হয় একটা অদৃশ্য শত্রুকে নিয়মিত ফুটিয়ে তোলার, যার উপস্থিতি তারা নিজেরাই অস্বীকার করে, কিন্তু আচরণে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে।
এই উভয়সংকট আজকের এই পাগলপারা অবস্থার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তারা বলছে আওয়ামী লীগ নেই, অন্যদিকে সামান্য জন্মদিন ঘিরে দেশের সাত জেলায় সেনা, পাঁচ জেলায় বিজিবি। তাদের এই দ্বিচারিতা কেবল ভয়ার্ত চিৎকার ছাড়া আর কিছু নয়। যাদের হাতে এদেশের জন্ম, যারা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীনতা এনেছে, সেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা মানে নিজেদের দেশপ্রেমের দাবিকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া। ক্ষমতাসীনরা জানে, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মানে কেবল একটা দলের জন্মদিন নয়, সেটা একটা জাতিরাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে যুক্ত আত্মপরিচয়ের অনুচ্চারিত প্রকাশ। সেই প্রকাশকে তারা সামরিক শক্তি দিয়ে চেপে রাখতে চায়, কারণ একবার মাথাচাড়া দিলে তাদের গোটা দখলদারত্বের দালান ধসে পড়তে সময় লাগবে না।
এটাই পরিষ্কার: আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন ঘোষণা করে যে সরকার আজ রাতারাতি দেশজুড়ে আধাসামরিক অবস্থা জারি করেছে, তারা নিজেরাই বিশ্বাস করে না যে আওয়ামী লীগ শেষ। বরং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ উচ্চকণ্ঠে স্বীকার করছে যে, আওয়ামী লীগ এক ভয়ংকর রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা মাটিতে টিকে আছে, মানুষের মধ্যে বেঁচে আছে। এই আতঙ্কিত হৃৎকম্পনই এই সরকারকে সবচেয়ে বেশি ছোট করে, দুর্বল করে এবং সর্বোপরি তাদের পুরো ক্ষমতার কাঠামোকে হাস্যকর এক ভয়ের দাসত্বে পর্যবসিত করে রেখেছে।
