আবদুল করিম কিম
আম্বরখানা। সিলেট নগরীর এক পরিচিত পয়েন্ট। সেখান থেকে সাপ্লাই রোডে ঢুকতেই রাস্তার বাঁ পাশে চোখে পড়ত একটি সাদা বাড়ি। মূল ফটকের খিলানে লেখা—‘জ্যোতি মঞ্জিল’। কৈশোরে কতবার যে বাড়িটির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়েছি, তার হিসাব নেই। গাছপালায় ঘেরা বাড়িটি যেন নগরের কোলাহলের মধ্যে এক টুকরো নীরব শিল্পকর্ম। বাগানবিলাসের রঙিন ঝাড় বাড়িটিকে দূর থেকেই আলাদা করে চিনিয়ে দিত।
পরে জেনেছিলাম, এটি মরহুম আমিনুর রশীদ চৌধুরীর বাড়ি। সিলেট তথা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র ‘যুগভেরী’র সম্পাদক-প্রকাশক, শিল্পোদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে সময়ের পরিক্রমায় পরিচয় হয়েছে তাঁর একমাত্র পুত্র হ্যারল্ড রশীদ চৌধুরীর সঙ্গে।
আজ তাঁর সত্তরতম জন্মদিনের প্রাক্কালে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার কাছে হ্যারল্ড ভাই কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি এক চলমান সময়ের সাক্ষ্য।
আমাদের পরিচয় খুব ঘনিষ্ঠতার নয়। বরং ইচ্ছে করেই একসময় দূরত্ব বজায় রেখেছিলাম। কারণ, নব্বইয়ের দশকে জ্যোতি মঞ্জিল ছিল শিল্পী, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের এক প্রাণকেন্দ্র। বন্ধুদের অনেকেই সেখানে নিয়মিত যেতেন। রাতভর চলত গান, আড্ডা, তর্ক, স্মৃতিচারণ। আমি জানতাম, একবার ওই আড্ডার জগতে ঢুকে পড়লে আর বের হওয়া কঠিন হবে। হ্যারল্ড ভাইয়ের বোহেমিয়ান ব্যক্তিত্ব ছিল অদ্ভুত আকর্ষণীয়। সেই আকর্ষণ থেকেই হয়তো সচেতন দূরত্ব।
তবু শেষ পর্যন্ত কাছে যাওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে। আড্ডার টানে নয়, একটি নাগরিক আহ্বান নিয়ে।
দেশ তখন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন দেশকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সেই সময়ে প্রতিবাদী তরুণদের উদ্যোগে ‘বিক্ষুব্ধ তারুণ্য’ ব্যানারে সিলেটে প্রথম মানববন্ধন আয়োজনের উদ্যোগ নিই। কর্মসূচির আমন্ত্রণ জানাতে প্রথমবার জ্যোতি মঞ্জিলে যাই। হ্যারল্ড ভাই ও শম্পা রেজা মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন এবং অংশগ্রহণের সম্মতি দিলেন।
১৯৯৬ সালের ২৪ মার্চ সিলেটের ইতিহাসের সেই প্রথম মানববন্ধনে তাঁদের উপস্থিতি শুধু কর্মসূচির শক্তিই বাড়ায়নি, নাগরিক প্রতিবাদের এক নতুন সংস্কৃতিরও সূচনা করেছিল।
এরপর দীর্ঘ সময়জুড়ে নানা নাগরিক ও সাংস্কৃতিক ইস্যুতে হ্যারল্ড ভাইকে পাশে পেয়েছি। কখনো সরাসরি অংশগ্রহণে, কখনো নৈতিক সমর্থনে, কখনো একটি স্বাক্ষরে, কখনো একটি ফোনালাপে।
জঙ্গিবাদ ও বোমা হামলার বিরুদ্ধে ‘মানববর্ম’, আবুসিনা ছাত্রাবাস রক্ষার আন্দোলন, এমসি কলেজের ধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদে ‘রঙ-তুলিতে দুষ্কাল’, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নকশাবহির্ভূত স্থাপনা অপসারণের দাবি কিংবা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিক প্রতিবাদ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন নাগরিক বিবেকের পক্ষে।
হ্যারল্ড ভাইয়ের আরেকটি বড় পরিচয় তাঁর জ্ঞানপিপাসা। তাঁর সঙ্গে আড্ডায় যেমন শিল্প ও সংগীতের কথা আসে, তেমনি আসে সুফিবাদ, ইতিহাস, লোকঐতিহ্য কিংবা সিলেটের বিস্মৃত স্মৃতি। তাঁর সংগ্রহে থাকা বহু প্রত্নবস্তু শুধু সংগ্রাহকের শখ নয়, ইতিহাসের প্রতি গভীর অনুরাগেরও পরিচয় বহন করে।
সাম্প্রতিক সময়েও তাঁকে দেখেছি একই রকম সক্রিয়। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি কিংবা নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট। বয়স তাঁকে ধীর করেছে, কিন্তু নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি।
ব্যক্তি হ্যারল্ড রশীদ চৌধুরীকে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, আলোচনা-সমালোচনাও থাকতে পারে। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই—তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন শিল্প, সংস্কৃতি, নাগরিক দায়িত্ববোধ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা একই সূত্রে গাঁথা ছিল।
আজ তাঁর সত্তরতম জন্মদিনে তাই মনে হয়, হ্যারল্ড ভাই শুধু একটি পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করছেন না; তিনি বহন করছেন সিলেটের এক সাংস্কৃতিক যুগের স্মৃতি, নাগরিক চেতনার ধারাবাহিকতা এবং সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসা এক বিরল মানবিক উত্তরাধিকার।
কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের পরিচয় কোনো পদবি, বংশমর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি নগরের স্মৃতি, একটি সাংস্কৃতিক ধারার চলমান প্রতীক। হ্যারল্ড রশীদ চৌধুরী তেমনই একজন মানুষ।
সে কাল পেরিয়ে এ কালেও তিনি আছেন সময়-সাক্ষী হয়ে। হয়তো এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
বর্ণাঢ্য জীবন বয়ে চলারও একটা মধুর ভার আছে। সেই ভারোত্তোলনের কৌতূহল ১লা বৈশাখ আর্ট স্কুলের বৈশাখ উদযাপনে দেখা হলে জানতে চেয়েছিলাম, ‘আপনার জন্মদিন কবে?’ বললেন, ‘৩০ জুন’।
‘এই ৩০ জুন বয়স কত হবে?’ জবাব এলো—‘৭০!’
বললাম, ‘সত্তরে হ্যারল্ড’। আপনার জন্মদিন উদযাপন করতে চাই।। লাজুক হাসি দিলেন।
একটু পর সে আলাপচারিতায় যোগ দিলেন শামসুল বাসিত শেরো, Nilanjan Das Tuku ও ইসমাইল গনি হিমন। তাদেরকে বললাম, হ্যারল্ড ভাইয়ের এই জুনে ৭০ পূর্ণ হবে। জন্মদিন উদযাপন করতে হবে। তিন জন একমত হলেন।
হিমন বললো, হ্যারল্ড ভাইয়ের আজ পর্যন্ত কোন চিত্র প্রদর্শনী হয়নি।
হ্যারল্ড ভাই বললেন, আগামী জানুয়ারিতে করা যাবে।
আমরা বললাম, জানুয়ারিতে নয়, আপনার জন্মদিন উদযাপনের অংশ হবে, একক চিত্র প্রদর্শনী। তাই হচ্ছে।
২৯ জুন থেকে সিলেটের Sylhet Art & Autistic School -এর শাহ আলম গ্যালারি অব ফাইন আর্টস, অরবিন্দ দাসগুপ্ত ভবন, টিবি গেইটে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী হ্যারল্ড রশীদের একক চিত্র প্রদর্শনী। উদ্বোধন করেছেন চিত্রশিল্পী অধ্যাপক আবুল বারাক আলভী, বিখ্যাত কার্টুনিস্ট অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য ও চিত্রশিল্পী অধ্যাপক নিসার হোসেন।
৩০ জুন বিকাল ৫টায় ‘সত্তরে হ্যারল্ড’ শীর্ষক জন্মদিন উদযাপনের অনুষ্ঠানে ছিল শিল্পী-আড্ডা, স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
