চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দুই তীরকে সংযুক্ত করার জন্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক করিডোরকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু টানেল।
নিচে এর মূল ব্যবহার এবং চারপাশের ইকোনমিক জোনের সাথে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. কর্ণফুলী টানেল মূলত কী কাজে ব্যবহার করা হয়?
টানেলটির মূল উদ্দেশ্য হলো চট্টগ্রাম শহরের সাথে নদীর অপর তীরের (আনোয়ারা উপজেলা) সরাসরি এবং দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করা। এর প্রধান ব্যবহারগুলো হলো:
’ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেল বাস্তবায়ন: চীনের সাংহাই শহরের আদলে চট্টগ্রাম শহরকে নদীর দুই পাড়ে সমান্তরালভাবে সম্প্রসারিত করা।
যানজট নিরসন: চট্টগ্রাম বন্দর ও নগরীর ভেতরের ভারী যানবাহনগুলোকে শহরের মূল কেন্দ্র এড়িয়ে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে কক্সবাজার বা মাতারবাড়ী রুটে চলাচলের বিকল্প পথ দেওয়া।
যোগাযোগের সময় ও খরচ কমানো: প্রথাগতভাবে নদী পার হতে বা কালুরঘাট/শাহ আমানত সেতু ঘুরে যেতে যে দীর্ঘ সময় লাগত, টানেলের মাধ্যমে তা মাত্র কয়েক মিনিটে নেমে এসেছে।
পর্যটন খাতের উন্নয়ন: ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার, বান্দরবান এবং পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যাতায়াত অনেক সহজ ও দ্রুত করা।
২. চারপাশের ইকোনমিক জোনের সাথে এর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও গুরুত্ব
কর্ণফুলী টানেল কেবল একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, এটি এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গেম-চেঞ্জার। বিশেষ করে চারপাশের ইকোনমিক জোন এবং শিল্পাঞ্চলগুলোর সাথে এর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর:
ক) আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সিইউএফএল এলাকা
টানেলের অপর প্রান্তটি সরাসরি আনোয়ারায় গিয়ে শেষ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৭৮১ একর জায়গার ওপর চাইনিজ ইকোনমিক জোন বা আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠছে।
সম্পর্ক: টানেলটি না থাকলে এই জোনে উৎপাদিত পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে আনা বা কাঁচামাল নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ হতো। টানেলের কারণে আনোয়ারা সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে যুক্ত হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের (FDI) ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করছে।
খ) মিরসরাই-ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চল (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর)
টানেলটি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত দেশের বৃহত্তম শিল্প নগরী ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর’-এর সাথে দক্ষিণাঞ্চলের একটি সংযোগ সেতু হিসেবে কাজ করছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে এই শিল্প নগরের পণ্যবাহী গাড়িগুলো শহরের যানজট এড়িয়ে টানেল ব্যবহার করে সহজেই দক্ষিণ চট্টগ্রামে চলে যেতে পারছে।
গ) মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর ও মহেশখালী এনার্জি হাব
কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মিত হচ্ছে।
সম্পর্ক: মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে দেশের ভেতরের ইকোনমিক জোনগুলোতে (যেমন আনোয়ারা বা মিরসরাই) দ্রুত পৌঁছানোর জন্য এই টানেলটি একটি ‘এক্সপ্রেস করিডোর’ হিসেবে কাজ করছে। এটি মূলত মাতারবাড়ী পোর্ট, আনোয়ারা ইকোনমিক জোন এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি সুতা সুতোয় গেঁথেছে।
ঘ) কোরিয়ান ইপিজেড (KEPZ) আনোয়ারায় অবস্থিত কোরিয়ান ইপিজেডে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন জুতো ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী তৈরি হয়। টানেল চালুর ফলে এই ইপিজেডের পণ্য পরিবহন খরচ ও লিড-টাইম (পণ্য তৈরি থেকে শিপমেন্টের মধ্যবর্তী সময়) অনেক কমে গেছে, যা বৈশ্বিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
