জীবন নেই, জীবিকাও নেই: বকেয়া বেতনের আশায় ফুটপাতে বসে থাকা সেই ক্লান্ত হাতগুলোই বানাতো বিশ্বমানের পোশাক এই কিছুদিন আগেও!
চট্টগ্রাম নগরীর নাসিরাবাদে শিল্প পুলিশের কার্যালয়ের সামনে বেলা বাড়ে। চা-ওয়ালার দোকানের ছায়ায় বসে থাকা পারভীন আক্তারের চোখে স্থির দৃষ্টি। ২১ বছরের চাকরি, ২০ মাসের বকেয়া বেতন। যে কারখানা একদিন তাঁর আশ্রয় ছিল, সেই কারখানার গেটে এখন তালা আর মালিকের ফোন নম্বরটা সুইচড অফ। এ দৃশ্য এখন চট্টগ্রামের প্রতিটি শিল্পাঞ্চলের গল্প। শিল্প পুলিশের তালিকায় কেবলই বাড়ছে মৃত্যুপথযাত্রী কারখানার সারি। দুই বছরে ১৯০টি কারখানা বন্ধ, বেকার ৩০ হাজার। ইউনুস সরকার বিদায় নেওয়ার পর যারা তথাকথিত “ত্রাতা” সেজে ক্ষমতার দখল নিলেন, সেই বিএনপি-জামাত জোটের শাসনে লাল সবুজের বাংলাদেশ শুধুই লাল কালিতে লেখা দুঃস্বপ্ন দেখছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতার হাল ধরার সময় নেতারা বলেছিলেন শিল্প বাঁচবে, কর্মসংস্থান ফিরবে। ছয় মাস পেরোতেই সেই মিথ্যে প্রতিশ্রুতির ভিত ধসে পড়ল এস আলমের ১১ কারখানা বন্ধের ঘোষণায়। এক দিনে বেকার সাড়ে দশ হাজার পরিবার। বন্দরনগরী এখন বেকারনগরী। ব্যাটারিচালিত রিকশার হ্যান্ডেলে অভ্যস্ত হাতগুলো একদিন সেলাই মেশিন চালাত, আজ তাদের ঠাঁই ফুটপাতের ঝুপড়ি দোকানে। যাদের বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে, তারা নীরবে ঘরে ফিরেছেন। ঘরে ফিরে হিসেব মেলান, ১৭ বছর পর আবার কেন সেই ২০০১-০৬ সালের বিভীষিকা ফিরে এলো!
কারখানাগুলো বলছে গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই, ব্যাংক ঋণ আটকে দিয়েছে, এলসি খোলার টাকা জোগাড় হয় না। কিন্তু যারা রাষ্ট্র চালানোর ভার নিলেন গত ফেব্রুয়ারিতে, তারা কি দেখছেন না এই শিল্পসঙ্কটকে? নাকি ২০০৬ সালের মতো এবারও দেশ ছাপিয়ে বিদেশে পাচার হচ্ছে মূলধন? নাসিরাবাদে বসে থাকা পারভীনের কাতর অনুরোধের উত্তর মালিকও দেননি, সরকারও দেয়নি। শুধু শিল্প পুলিশের অফিসার জানাচ্ছেন অভিযোগের ফাইল ঘরে রাখার জায়গা ফুরিয়েছে। চট্টগ্রামের আকাশে ধোঁয়া ওঠে না এখন আর কারখানার চিমনির, ওঠে নিঃস্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাস। যে দীর্ঘশ্বাস বিএনপি-জামাতের সুশাসনের কালো অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে ইতিহাসের খাতায়।
