২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে কোটা সংস্কারের মোড়কে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ সন্ত্রাসের প্রথম বলি হয় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দামপাড়াস্থ পুলিশ লাইনে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। আন্দোলনকারীরা এই জাদুঘরে হামলা চালায়, ভেঙে দেয় ওই বছরের ১৬ই জুলাই।
এরপর থেকে ক্রমশ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর, স্মৃতিচিহ্ন, ভাস্কর্য, স্মারক, ম্যুরাল থেকে শুরু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাসহ বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আর এসব ভাঙচুর, হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞে নেতৃত্ব দেয় বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ আন্দোলনকারী সকল পক্ষ। এসব ঘটনায় হতাহত হয়েছেন হাজারো মানুষ।
বিক্ষোভের নামে এসব স্থাপনা ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞে যারা অংশ নিয়েছেন, তাদের অনেকেই এখন সংসদ সদস্য হয়ে সংসদ ‘অলঙ্কৃত’ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনে কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ তো করা হয়ইনি, উল্টো তাদরে সকল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে দায়মুক্তি প্রদান করা হয়েছে।
তবে এই সযোগ থাকছে না জুলাই জাদুঘরের ক্ষেত্রে। জুলাই জাদুঘরের ক্ষতিসাধন ঠেকাতে আইন করা হয়েছে আলাদা করে, তাতে রাখা হয়েছে শাস্তির বিধানও।
কোনো ব্যক্তি জুলাই জাদুঘরের কোনো স্থাবর নিদর্শনের ক্ষতিসাধন করলে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর জাদুঘরের কোনো অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার ও নষ্ট করলে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রণীত ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আইন-২০২৬’-এ বিধান রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দাঙ্গা-সংঘাতের ইতিহাস, নিদর্শন সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের জন্য জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২০২৬ সালের ১০ই এপ্রিল আইনটি প্রণীত হয়।
জুলাই চাদুঘর
এই আইনের আলোকে প্রতিষ্ঠিত দাঙ্গা-সংঘাতের নিদর্শন ধরে রাখার জন্য গড়ে তোলা জুলাই জাদুঘর গত ৫ই আগস্ট উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরদিন থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয় ঐতিহাসিক এই জাদুঘর।
এই আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, জাদুঘরের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকার গণভবনে। আর ২০০৯ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের শাসনামলে যেসব গোপন কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করার অধিকার জাদুঘরের থাকবে।
এ ক্ষেত্রে কোনো গোপন কারাগার যদি কোনো সংস্থার অধীন থাকে, সেই ক্ষেত্রে উক্ত সংস্থা তা যে অবস্থায় রয়েছে সেই অবস্থাতেই জাদুঘরের নিকট হস্তান্তর করতে বাধ্য থাকবে এবং মানবতাবিরোধী কারাগারসমূহ জাদুঘরের শাখা জাদুঘর হিসেবে পরিগণিত ও পরিচালিত হবে।
আইনের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, এই জাদুঘরের কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে— সরকারের পতন সংশ্লিষ্ট ‘ঐতিহাসিক’ নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন, পূর্ববঙ্গের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট নিদর্শন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী কার্যক্রম ও ফ্যাসিবাদের উত্থান সংক্রান্ত স্মৃতিচিহ্ন, প্রামাণ্য দলিল, সংশ্লিষ্ট বস্তু ও নিদর্শন অনুসন্ধান, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শন।
আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, জাদুঘর, পর্ষদের সুপারিশ ও সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে প্রদর্শন ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর বা অন্য কোনো জাদুঘর বা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে জুলাইর নিদর্শন স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বিনিময় করতে এবং উপহার প্রদান বা গ্রহণ করতে পারবে। তবে এরূপ স্থায়ী বা অস্থায়ী বিনিময়, উপহার প্রদান বা গ্রহণ করতে হলে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে।
আইনের ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, জুলাই সংশ্লিষ্ট কোনো নিদর্শন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট রয়েছে মর্মে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকলে মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী উক্ত স্থান পরিদর্শন করতে পারবে এবং এই আইন বা তদধীন প্রণীত বিধি বা প্রবিধান অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
জাদুঘরে প্রবেশাধিকার বিষয়ে আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, পর্ষদ কর্তৃক নির্ধারিত প্রবেশ মূল্যের বিনিময়ে জনগণের জাদুঘরে প্রবেশাধিকার থাকবে।
আইনের ২২ ধারায় স্থাবর নিদর্শন ধ্বংস বা বিনষ্ট করলে দণ্ডের বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জাদুঘরের কোনো স্থাবর নিদর্শন বা উহার অংশবিশেষ ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধন করলে তা হবে অপরাধ এবং সে জন্য তিনি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি জাদুঘরের কোনো অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার, ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধন করলে তা অপরাধ হবে এবং সে জন্য তিনি অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
অন্যদিকে ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জাদুঘরের সংগৃহীত বা নিবন্ধিত কোনো নিদর্শনের ওপর খোদাইকরণ, লিখন, লিপি উৎকীর্ণ বা স্বাক্ষর করলে তা হবে অপরাধ এবং সে জন্য তিনি অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এদিকে আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, জাদুঘরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী উল্লেখিত ধারায় অপরাধসমূহের দায়ে অভিযুক্ত হলে প্রচলিত দণ্ডের পাশাপাশি শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে আদালতে মামলা চলমান থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।(আওয়ামীলীগ পেইজ)
