বাংলা একাডেমির প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে ঠিকাদার নির্বাচন এবং আর্থিক অনিয়মসহ বহুমুখী দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুন রশীদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, তিনি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত আইন অমান্য করেছেন, বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক খরচ দেখিয়েছেন এবং কারিগরি সক্ষমতা ও প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একটি সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন।
প্রকল্পের ব্যয়ের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সর্বমোট ১ লাখ ৫০ হাজার পৃষ্ঠা স্ক্যান করার জন্য ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকার বিশাল বাজেট ধরা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু প্রতি পৃষ্ঠা স্ক্যানিংয়ের জন্য ১৫০ টাকা হারে খরচ ধরা হয়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা, আর ‘স্ক্যানিং ইমেজ রিটাচিং’ কাজের জন্য পৃষ্ঠা প্রতি ১১০ টাকা হিসেবে আরও ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এতে করে প্রতি পৃষ্ঠার মোট স্ক্যানিং ও রিটাচিং খরচ দাঁড়াচ্ছে ২৬০ টাকা।
ডিজিটাইজেশন খাতের একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সাধারণ কোনো বই বা কাগজপত্র ডিজিটাইজ করার বর্তমান বাজারদর পৃষ্ঠা প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
এই সাধারণ খরচের ভেতরেই স্ক্যানিং, ইমেজের মান উন্নতকরণ (রিটাচিং), তথ্য সুবিন্যস্ত করা (ডাটা ইনডেক্সিং) এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বই খোলা ও বাঁধাই করার বিষয়গুলো যুক্ত থাকে। ফলে এসব কাজের জন্য নতুন করে আলাদা বড় অংকের অর্থ বরাদ্দের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, নথি যদি বহু বছরের প্রাচীন, ভঙ্গুর কিংবা অস্বাভাবিক আকারের হয়, তবে কাজের জটিলতার ওপর ভিত্তি করে সর্বসাকুল্যে পৃষ্ঠা প্রতি খরচ ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই বাস্তবতায় স্ক্যানিংয়ের জন্য প্রতি পৃষ্ঠায় ২৬০ টাকা বরাদ্দ রাখা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্ক্যান করার পাশাপাশি পুঁথির মূল লেখা পাঠ ও অর্থ উদ্ধারের খাতটিতেও অস্বাভাবিক খরচের তথ্য মেলে। অভিযোগ উঠেছে, শুধুমাত্র এই কাজের জন্যই বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠার পাঠোদ্ধারে খরচ ধরা হয়েছে আনুমানিক ৪০০ টাকা।
পুঁথির প্রাচীনতা, ক্ষয়ক্ষতি, লিপি ও ভাষার জটিলতা যতই থাকুক না কেন, পৃষ্ঠা প্রতি ৪০০ টাকা খরচের এই হিসাব কিসের ভিত্তিতে তৈরি করা হলো—তা প্রকাশ্যে আনা উচিত।
অবশ্য এই অভিযোগের সত্যতা বিচারে সংশ্লিষ্ট কাজের ধরণ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের আইনি প্রক্রিয়া, সরাসরি ক্রয়ের বিধিমালা এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা আবশ্যক।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ২১শে মে ২০২৬ তারিখে ‘প্রো সয়েল ফাউন্ডেশন কনসালট্যান্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল আর্কাইভিং সংক্রান্ত কার্যাদেশ দেওয়া নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মূলত মৃত্তিকা গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান হওয়ায় পুঁথির লিপ্যন্তর, পাঠোদ্ধার কিংবা ডিজিটাল আর্কাইভিংয়ে তাদের বিন্দুমাত্র পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এতদসত্ত্বেও তাদেরকেই কাজ পাইয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি পুঁথি প্রকল্পের আরেকটি দরপত্র প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গুরুতর কারচুপির অভিযোগ এনেছে অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো।
তাদের অভিযোগ, মূল্যায়ন পর্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন (ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন), নির্দিষ্ট টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন এবং বিগত দিনের কাজের অভিজ্ঞতার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।
ইতিপূর্বেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উক্ত প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দকৃত প্রায় ৯৩ লাখ টাকা নিয়ে ব্যাপক কারচুপির তথ্য সামনে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থবছর শেষ হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কোনো প্রকার বাস্তব কাজ সম্পন্ন করা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে সমুদয় অর্থ খরচ দেখানো হয় এবং মন্ত্রণালয়ে খরচের ভুয়া হিসাব পাঠানো হয়। উক্ত অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে যথাযথ দরপত্র আহ্বান করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং বাস্তবিক অর্থে কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ারও ভিত্তি নেই।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্প পরিচালক ড. হারুন রশীদের বিরুদ্ধে অতীতেও নানা ধরণের দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে স্থান পেয়েছিল। তবে এত অভিযোগ সত্ত্বেও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রকমের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে এই প্রকল্প পরিচালকের ব্যক্তিগত সখ্যতা রয়েছে—এমন একটি গুঞ্জন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ছড়িয়ে থাকায় ভয়ে তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না। তবে এই গুঞ্জনের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত কোনো দালিলিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
স্ক্যানিং ও ইমেজ রিটাচিং থেকে শুরু করে পাঠ উদ্ধার, বই বাঁধাই-খোলা, পুঁথি ডিজিটাইজেশন, এমনকি সার্ভার ও কম্পিউটারের মতো দামি প্রযুক্তিপণ্য কেনাকাটা ও ঠিকাদার নিয়োগ—প্রকল্পের প্রতিটি পদক্ষেপে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সকলে।
