আনোয়ার শাহজাহান
একটি মোবাইল ফোন, একটি ফেসবুক পেজ আর কয়েকটি অনিবন্ধিত অনলাইন পোর্টাল—এই সামান্য কিছু উপকরণ হাতে নিয়েই আজকাল কেউ কেউ নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এরপর শুরু হয় ব্যক্তি, ব্যবসায়ী কিংবা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে নানা প্রশ্ন, ভিডিও ধারণ, লাইভ এবং ‘নিউজ করে দেওয়ার’ ভয় দেখানো। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও এসব কর্মকাণ্ডের আড়ালে চলে অর্থ আদায়ের চেষ্টাও।
এটি শুধু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতার।
ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইট খুলে সংবাদ প্রকাশ করা সহজ হয়েছে। প্রযুক্তির এই সুযোগ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য ইতিবাচক। কিন্তু এই স্বাধীনতা কাউকে ভয় দেখানো, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, সম্মানহানি করা কিংবা অর্থ আদায়ের অধিকার দেয় না।
সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ বলে—‘টাকা না দিলে নিউজ হবে’, ‘ভিডিও ভাইরাল করে দেব’, ‘আরও নিউজ করব’—তাহলে সেটি সাংবাদিকতা নয়। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে এমন কর্মকাণ্ড চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, মানহানি বা প্রচলিত আইনের অন্যান্য অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।
সত্যিকারের সাংবাদিকতা কখনো অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত হয় না। কোনো সংবাদ সত্য ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে প্রকাশিত হলে টাকা নিয়ে সেটি প্রত্যাহার করার প্রশ্নই আসে না। সংবাদ প্রকাশ বা প্রত্যাহার যদি অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।
একজন প্রকৃত সাংবাদিককে মানুষের আস্থা অর্জন করতে বছরের পর বছর মাঠে কাজ করতে হয়। অথচ কেউ যদি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে, মানুষকে ভয় দেখায়, অর্থ দাবি করে কিংবা মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার করে, তাহলে সে শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না—পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করে।
এ ধরনের ভুয়া ও অপসাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সাংবাদিক সমাজের ঘৃণার পাত্র হওয়া উচিত। তাদের অপকর্মের দায় কোনোভাবেই সৎ ও পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর বর্তায় না।
কেউ সাংবাদিক পরিচয়ে অর্থ দাবি করলে, ভয়ভীতি দেখালে কিংবা মিথ্যা তথ্য প্রচার করে কারও সম্মান বা ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করলে প্রমাণ সংরক্ষণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করা উচিত। প্রয়োজন হলে জিডি, মামলা কিংবা আইন অনুযায়ী অন্যান্য প্রতিকার নেওয়া যেতে পারে।
ফেসবুকে কেউ সমালোচনা করলেই মামলা করতে হবে—এমন সংস্কৃতিও কাম্য নয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, ভয়ভীতি কিংবা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া নাগরিকের অধিকার।
সমালোচনার জবাব যুক্তি দিয়ে দিতে হবে, আর অপরাধের জবাব দিতে হবে আইনের মাধ্যমে।
আমরা এমন সাংবাদিকতা চাই, যেখানে সাংবাদিক কোনো প্রতিষ্ঠানে গেলে মানুষ আতঙ্কিত হবে না; বরং মনে করবে—তিনি সত্য জানার জন্য এসেছেন।
সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি বন্ধ হোক। ভুয়া সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত প্রতিরোধ গড়ে উঠুক। অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তার পরিচয় নয়—আইনই হোক শেষ কথা।
সৎ সাংবাদিকদের মর্যাদা ও গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় এখনই সময়—সাংবাদিকতার নামে ভয় দেখানোর সংস্কৃতি বন্ধ করার।
আনোয়ার শাহজাহান
সম্পাদক- আমাদের প্রতিদিন
