কবির য়াহমদ
বিশ্বচ্যাম্পিয়নের অপ্রাতিষ্ঠানিক তকমাটি আবারও এসে জুটল। দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মতো এবারও এটা আশাজাগানিয়া খবর হয়ে নয়, এসেছে পরম লজ্জার বার্তা নিয়ে; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আর্থিক স্থিতিশীলতা সূচকসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে খেলাপি ঋণে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এখন বাংলাদেশ!
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়। এটি ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা; অর্থাৎ পরবর্তী তিন মাসেই বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় উঠেছিল। এই হিসাবের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইউক্রেনকে পেছনে ফেলে খেলাপি ঋণের বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ঠিক পরপরই রয়েছে চাদ, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, আলজেরিয়া ও ঘানা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করলে এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। ২০২৪ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অথচ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়াল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, বাড়ার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা! মাত্র দুই বছরে এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে নানা ছাড়, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং হিসাবগত কৌশলে সমস্যাগ্রস্ত যে বিপুল পরিমাণ ঋণকে ‘নিয়মিত’ হিসেবে আড়াল করে রাখা হয়েছিল, তা এখন খেলাপির খাতায় যুক্ত হচ্ছে। বিগত দেড় দশকে ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা ঢাকতে দফায় দফায় নীতি শিথিলতার যে খেলা চলেছে, এখন তার থলের বিড়াল বের হয়ে আসছে বলা হচ্ছে। এটাকে যেভাবে স্বাভাবিক পরিণতি বলে সরলীকরণের চেষ্টা চলছে, তা প্রচলিত ঋণ ব্যবস্থাপনার ধারণার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। কারণ অনাদায়ী ঋণকে আদায়ের পথে ফিরিয়ে আনাই ঋণ ব্যবস্থাপনার বিশ্বস্বীকৃত রীতি, নিছক তাকে খেলাপির খাতায় তুলে দেওয়া নয়।
বিষয়টিকে শুধু রাজনৈতিক ‘ন্যারেটিভ’ হিসেবে না দেখে ব্যবসায়ের বাস্তব পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং একই সঙ্গে আমাদের নেতা ও নেতৃত্বের মধ্যে ঋণখেলাপির সংখ্যা কেমন, এটাও বিবেচনায় আনা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের নীতিমালার বাইরে ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে কি? মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান তারেক রহমানের সরকার, ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক স্থিতিশীল পরিবেশ কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছে? ৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত গত তিন বছরে দেশে অন্তত ৪০২টি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সংসদ সদস্য রুহুল আমিনের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বিজিএমইএ-র রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে জানান, বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে ২৮২টি বিজিএমইএ এবং ১২০টি বিকেএমইএর সদস্য। বিশ্বজুড়ে করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক মন্দা, দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থপাচারের কারণে ব্যাংকে তীব্র তারল্য সংকট এবং ইউরোপীয় বাজারে ভিয়েতনাম ও ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধাপ্রাপ্তির ফলে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
এগুলোই কি প্রকৃত সংকট, নাকি এর শেকড় অন্য জায়গায়? যারা ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছেন না, তাদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও বিশেষ ছাড়ের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব এক প্রতিষ্ঠিত সত্য। এর পাশাপাশি চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক ব্যবসায়ী মামলা, গ্রেপ্তার ও ‘মব জাস্টিসে’র আশঙ্কায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অথবা আড়ালে চলে গেছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সচল না থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর বাইরে দীর্ঘদিনের ‘স্বভাব-খেলাপি’দের দাপট তো রয়েছেই।
আমাদের দেশে ঋণ বিতরণ ও খেলাপি নির্ধারণের পুরো ব্যবস্থাটাই যেন রাজনীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এ বছরের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। সিআইবি রিপোর্টে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও আদালতে রিট করে বা স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেক ঋণখেলাপি নেতা নির্বাচনে লড়েছেন এবং বিজয়ী হয়ে সংসদেও এসেছেন। ঋণখেলাপি হয়েও সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন ত্রিশের বেশি প্রার্থী। অনেকেই বাদ পড়েছেন অবশ্য, আর সারোয়ার আলমগীর ও আসলাম চৌধুরী নামের দুই বিএনপি নেতাকে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে বিলম্ব হয়েছে, এর কারণ ওই অনাদায়ী ঋণ।
বড় দল হিসেবে শুধু বিএনপিই নয়, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, এমনকি জুলাই আন্দোলনকারীদের দল এনসিপির প্রাথমিক তালিকার প্রার্থীও ছিলেন ঋণখেলাপি। ভাবা যায়, নির্বাচনের সময়ে দল গঠনের বছর দিনও যাদের হয়নি, তারাও এই চক্রে জড়িয়ে গেছে। স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে চাওয়া অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে ঋণখেলাপি থাকার কারণে। এর বাইরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ ৫৯.৪১ শতাংশ প্রার্থী ছিলেন ঋণগ্রস্ত। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এ হার ছিল ৩২.৭৯ শতাংশ এবং জাতীয় পার্টির ২৬.৯৭ শতাংশ। টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রাক-নির্বাচনী প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮,৮৬৮ কোটি টাকা, যার ১৭,৪৭১ কোটি টাকাই ব্যাংক ঋণ! নির্বাচন-পরবর্তী টিআইবির অপর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায়, নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্যের মধ্যে অর্ধেকেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় রয়েছে, যার পরিমাণ ১১,৩৫৬ কোটি টাকা, যা গত চারটি সংসদের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। বিজয়ী সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিএনপিতে ঋণগ্রস্তের হার ৬২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীতে ১৬ শতাংশ। এখানে অবশ্য উল্লেখের দাবি রাখে যে, ঋণগ্রস্ত হওয়া মানেই ঋণখেলাপি হয়ে যাওয়া নয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, নির্বাচনের প্রায় দুইহাজার প্রার্থীর বিপরীতে সংসদে আসন মাত্র ৩০০টি। এই ক্ষুদ্র সংখ্যা দেশের সামগ্রিক ঋণগ্রহীতার তুলনায় নগণ্য হলেও এটি উল্লেখ করা জরুরি, কারণ জাতীয় সংসদের আইনপ্রণেতাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশই আবার ঋণখেলাপি, যাদের কেউ কেউ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে আইনি ফাঁক কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং জয়ীও হয়েছেন। যে সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান দেশের আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণসহ দেশের সকল আইন প্রণয়ন করে, সেই প্রতিষ্ঠানেরই একটা অংশ যদি খেলাপি ঋণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন, তাহলে সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরবে কীভাবে?
সংসদে সবাই যেতে পারে না। সংসদকে নিয়ে এই তুলনাকে অনেকেই ভাবতে পারেন অন্যায্য, কিন্তু ঋণখেলাপির কারণে যখন কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে আইনি লড়াই করতে হয়, সংসদ সদস্য হতে চাওয়া লোকদের যখন ঋণখেলাপির তকমা থেকে মুক্ত হতে আইনি লড়াইয়ে নামতে হয়, তখন ক্ষুদ্র একটা অংশ হলেও তাদের বাদ দিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদদের এই বিশাল অঙ্কের ব্যাংক ঋণ এবং প্রাক-নির্বাচনী ছাড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে ‘বিশ্বরেকর্ড’ গড়া ৬ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা স্রেফ কাকতালীয় ভাবার অবকাশ নেই। বিষয়টিকে তাই কেবল মুখরোচক দোষারোপের রাজনীতির ছকে ফেলার সুযোগও সীমিত। ক্ষমতায় থাকলে কেউ ফেরেশতা হয়ে যায় না, বরং ক্ষমতা অপব্যবহারের প্রবণতা মাথা চাড়া দেয়। বলছি না, এখানে সবাই ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন, তবে জাতীয় এ সংকটকে একবাক্যে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরির উপকরণ হিসেবে না দেখে আয়নাও দেখা উচিত।
