মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং হযরত হুসাইন আহমদ মাদানি কেন পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যপারে আশ্বস্ত ছিলেন না!
উত্তর ভারতের ফার্সি ও উর্দুভাষী অভিজাত এবং সাহিত্যিক শ্রেণী, যারা আশরাফিয়া বা কথিত বিদেশী পূর্বপুরুষদের বংশধর হিসেবে পরিচিত ছিল, মুঘল সাম্রাজ্য এবং নবাব-শাসিত দেশীয় রাজ্যগুলিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো।
তারা সামরিক কমান্ডার, উপদেষ্টা, ইসলামের রক্ষক, ইসলামী আইন ও শরিয়া বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় চাকরিতে নিযুক্ত ছিল।
১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর, মুঘল সাম্রাজ্য অপরিবর্তনীয় পতন ও অবক্ষয়ের কবলে পড়ে। অনিবার্যভাবে আশরাফিয়ারা ক্ষমতা হারায়, যা তাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে।
শত শত বছরের মুসলিম শাসন সত্ত্বেও ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী হিন্দুই থেকে গিয়েছিল, অন্যদিকে সাধারণ পরিবার থেকে আসা ধর্মান্তরিত মুসলিমদের আশরাফিয়ারা অবজ্ঞার চোখে দেখত।
ভারতে ব্রিটিশরা সর্বময় শক্তি হয়ে ওঠায় এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুরা উদীয়মান জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত হয়ে ওঠায়, আশরাফিয়াদের ভয় বেড়ে যায় যে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের আগমনের সাথে সাথে তাদের বিশেষাধিকারগুলি ক্রমশ অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।
এমন এক পরিস্থিতিতে, স্যার সৈয়দ আহমদ খান এই শঙ্কিত আশরাফিয়াদের ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সাথে জোট বাঁধার পরামর্শ দেন। অথচ, কংগ্রেস শুরু থেকেই একটি উন্মুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ দল ছিল, যা কেবল ১৯২০-এর দশকে এসে একটি গণ-আন্দোলনের রূপ নেয় এবং আরও প্রগতিশীল হয়ে ওঠে।
যারা স্যার সৈয়দ আহমদের এই কৌশলকে বেছে নিয়েছিলেন, তারাই পরবর্তীতে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের অগ্রভাগে চলে আসেন।
এই ধারাটিই ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে দ্রুত গতি পেয়ে ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য দেশভাগের আন্দোলনে রূপ নেয়।
মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে, সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠদের উলামারা (ধর্মীয় পণ্ডিতরা) উপ-উপদলে বিভক্ত ছিলেন। দেওবন্দিদের মধ্যে একটি বড় অংশ জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের ব্যানারে কংগ্রেসের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে নিজেদের যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।
তাদের যুক্তি ছিল, একটি ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে কংগ্রেস ভারত এবং মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবে। তবে তাদের একটি সংখ্যালঘু অংশ অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সাথে যোগ দেয়।
অন্যদিকে, সংখ্যার দিক থেকে অনেক বড় বেরলভি উলামারা শুরুতে রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও, পরবর্তীতে তারা ১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির পক্ষে প্রচারণার মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠেন। মুসলিম লীগের বিশাল নির্বাচনী বিজয়ে তাদের সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ধারণা ছিল, পাকিস্তান মানেই ইসলামি গৌরব ও ক্ষমতার পুনরুত্থান।
এই পটভূমিতে, আমরা ইসলামের দুই শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতের পাকিস্তান দাবির বিরোধিতার কারণগুলো দেখব। তারা দুজনেই নিশ্চিত ছিলেন যে, মুসলিম লীগ এমন সব মুসলমানদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যারা কখনোই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করেনি, এবং ব্রিটিশরা কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতা সংগ্রামকে রুখে দিতে মুসলিম লীগকে ব্যবহার করছে।
পাকিস্তান বিরোধিতার তাত্ত্বিক ইসলামি ভিত্তি তৈরি করেছিলেন কংগ্রেসের সবচেয়ে বিখ্যাত মুসলিম নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রধান ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি।
আমরা প্রথমে মাদানির দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎবাণী এবং তারপর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আজাদের দেওয়া বিস্তারিত তত্ত্ব আলোচনা করব।
মাদানি ‘ওয়াতানিয়াত’ (যৌথ স্বদেশ) এবং ‘মুত্তাহিদা কওমিয়াত’ (সংমিশ্রিত বা যৌথ জাতীয়তাবাদ)-এর তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন, যেখানে হিন্দু-মুসলিমসহ সব ভারতীয় সমান অংশীদার হবে। তার একমাত্র শর্ত ছিল, মুসলমানদের জন্য মুসলিম পার্সোনাল ল (ব্যক্তিগত আইন) কার্যকর থাকতে হবে। কংগ্রেস ১৯৩১ সালেই স্বাধীন ভারতে মুসলিম পার্সোনাল ল বজায় রাখার দাবি মেনে নিয়েছিল।
তিনি আরও একটি আকর্ষণীয় যুক্তি দিয়েছিলেন যে, মুসলমানরা যদি একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেও ফেলে, তবে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যকার তীব্র উপদলীয় ও মাযহাবী বিরোধের কারণে সেই রাষ্ট্রটি একটি স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে লক্ষ্য করেছিলেন যে, তীব্র মতাদর্শিক ও বিশ্বাসগত বিরোধের মাঝে একটি নিছক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে জোর করে ইসলাম চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে শক্তির প্রয়োজন হবে। এটি মুসলিমদের নিজেদের মধ্যেই সংঘাত ডেকে আনবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বৈরাচারী শাসনে রূপ নেবে। তাই মাদানি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের পক্ষ নেন, যা ভারতের এবং মুসলমানদের ঐক্য বজায় রাখবে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মাদানি এর ফলে আল্লামা ইকবালের তীব্র আক্রমণের শিকার হন। ইকবাল মাদানিকে একজন অজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে উপহাস করেন এবং দাবি করেন যে মাদানি আরবি ভাষা, ইসলামি ধর্মতত্ত্ব বা আইনের পণ্ডিত নন।
হুসাইন আহমদ মাদানির সাথে বিতর্কে ইকবালের এই আঞ্চলিক বা ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের তীব্র নিন্দা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। মাদানি যেখানে ‘ওয়াতানিয়াত’ বা যৌথ স্বদেশের ভিত্তিতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে হিন্দু ও মুসলমানরা ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে মুক্ত করতে সমান অংশীদার হতে পারে, ইকবালের কাছে সেই ধারণাটি ছিল পরিত্যাজ্য।
ইকবাল মনে করতেন ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ক্ষতিকর এবং একে তিনি কাদিয়ানিদের (আহমদিয়া) মির্জা গোলাম আহমদকে নবী মানার বিশ্বাসের সাথে তুলনা করেন।
মওলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন একজন কট্টর প্যান-ইসলামিস্ট (প্যান-ইসলামিজম বা মুসলিম বিশ্বঐক্যের সমর্থক) হিসেবে।
তিনি খিলাফত আন্দোলন এবং বিপর্যয়কর হিজরত আন্দোলনের অন্যতম তাত্ত্বিক গুরু ছিলেন, তবে খিলাফত আন্দোলনে তাঁর সমর্থনের মূল কারণ ছিল উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯২০ সালের অপমানজনক সেভ্রেস চুক্তির পর (যে চুক্তি ব্রিটিশরা বন্দি অটোমান সুলতান-খলিফার ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল এবং যার মাধ্যমে তুরস্কের বাকি অংশ পশ্চিমা দখলদারদের লিখে দেওয়া হয়েছিল) আবুল কালাম আজাদ মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের পক্ষে একটি ফতোয়া জারি করেন।
তিনি তুর্কিদের আহ্বান জানান তারা যেন আতাতুর্ককে সমর্থন করে, যিনি পশ্চিমা দখলদারিত্ব থেকে তুরস্কের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিলেন।
পরবর্তীতে আজাদ ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ভারতের অন্যান্য সব সম্প্রদায়ের সাথে মিলে ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়া মুসলমানদের সবচেয়ে অবিচল নেতা হয়ে ওঠেন।
ইসলামের একজন প্রগাঢ় পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও, তিনি মূলত আধুনিক গণশক্তি, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতার যুগের মানুষ ছিলেন। কংগ্রেসে মহাত্মা গান্ধীর সাথেই তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, অন্যদিকে নেহেরু ও প্যাটেলের সাথে অনেক বিষয়ে তাঁর মতপার্থক্য ছিল।
১৯৪০ সালের জুলাই মাসে কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে তিনি জিন্নাহকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি কংগ্রেস, মুসলিম লীগ এবং অন্যান্য দলগুলোকে নিয়ে একটি কোয়ালিশন (যৌথ) সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন, যা ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানাবে।
জিন্নাহ এর জবাবে তাঁকে ইসলামের একজন ‘বিশ্বাসঘাতক’ এবং ‘হিন্দু কংগ্রেসের পোস্টার বয়’ বলে কটূক্তি করেন। ১৯৪৫ সালের জুনে বড়লাট লর্ড ওয়াভেল যখন নির্বাচনের আগে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যায় কি না তা দেখার জন্য শিমলা সম্মেলন ডাকেন, তখন জিন্নাহ কংগ্রেস সভাপতি আজাদের সাথে হাত মেলাতেও অস্বীকার করেন। শুধু তাই নয়, মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে জিন্নাহ দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে মুসলিম প্রতিনিধি মনোনীত করার একচ্ছত্র অধিকার কেবল তাঁরই রয়েছে।
‘ডিফেন্স জার্নাল’-এর ২০১১ সালের ১৫ আগস্ট সংখ্যায় আজাদের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়, যা তিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক আঘা শোরিশ কাশ্মীরিকে দিয়েছিলেন এবং এটি ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে ‘চাট্টান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
আজাদ পাকিস্তান সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে।
তাঁদের যুক্তির মূল সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:
১. হিন্দু-মুসলিম সমস্যার কোনো সমাধান নয়: পাকিস্তান সৃষ্টি তথাকথিত হিন্দু-মুসলিম সমস্যার কোনো সমাধান বয়ে আনবে না। এটি ভারতের ৩৫ মিলিয়ন (সাড়ে ৩ কোটি) মুসলমানকে একটি নিরেট ৯০% হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে যাবে। একটি অখণ্ড ভারতে, যেখানে মুসলমানরা উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত এবং সশস্ত্র বাহিনীতে তাদের ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, সেখানে হিন্দু আধিপত্যের ভয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত।
২. ইসলামের সর্বজনীন বার্তার ক্ষতি: ইসলামের যে সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের বার্তা, তা তার আকর্ষণ হারাবে। ব্রিটিশ আমলে ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছিল, কিন্তু দেশভাগ হয়ে গেলে ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ধাক্কা খাবে। ভারতের মুসলমানরা একটি ক্ষমতাহীন, ক্ষুদ্র সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।
৩. ক্ষমতার লোভ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল: মুসলিম লীগের নেতারা ক্ষমতা পাওয়ার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করেছেন এবং যে উলামারা তাদের সমর্থন করছেন তারাও ক্ষমতার লোভী। মুসলমানদের মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও অভ্যন্তরীণ মাযহাবী এবং উপদলীয় কোন্দল বিদ্যমান রয়েছে।
৪. মুসলিম লীগের নেতারা ক্ষমতা পাওয়ার জন্য ইসলামকে ব্যবহার করেছেন এবং যে উলামারা তাদের সমর্থন করছেন তারাও ক্ষমতার লোভী। মুসলমানদের মধ্যে অত্যন্ত গভীর ও অভ্যন্তরীণ মাযহাবী এবং উপদলীয় কোন্দল বিদ্যমান রয়েছে। যখন তারা একে অপরের ওপর নিজেদের মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতা করবে, তখন এই কোন্দলগুলো আরও মারাত্মক আকার ধারণ করবে। পাকিস্তান হয়ে উঠবে এই মাযহাবী ও উপদলীয় বিরোধ ও সংঘাতের একটি উর্বর ক্ষেত্র।
৫. ভারত থেকে পাকিস্তানে হিজরত করা (অভিবাসী) মুসলমান এবং বিভিন্ন প্রদেশের স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্যভাবে দেখা দেবে। কারণ, কেবল ইসলামের নামে পাকিস্তানের দাবি তোলাই তাদের মধ্যকার মাযহাবী, জাতিগত এবং ভাষাগত বিভেদ দূর করার জন্য যথেষ্ট হবে না।
৬.মুসলিম লীগের ছড়ানো যে ঘৃণার ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তৈরি হচ্ছে, সেই রাষ্ট্রে হিন্দু এবং অন্যান্য অমুসলিমদের পক্ষে নিরাপদ বোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে অমুসলিমরা দলে দলে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হবে। আর এই ঘটনাটি পরবর্তীতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ককে চরমভাবে তিক্ত করে তুলবে।
৭.জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলী খানের পর, অযোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক একনায়কতন্ত্রের পথ সুগম করবে—ঠিক যেমনটা বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে ঘটেছে।শুরু থেকেই পাকিস্তান পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের একটি সহজ শিকারে পরিণত হবে, যারা দক্ষিণ এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য স্থানে তাদের নিজস্ব কুৎসিত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য পাকিস্তানকে ব্যবহার করবে।প্রতিবেশীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অভাব যুদ্ধের সম্ভাবনাকে অনেক বাড়িয়ে দেবে।
৮.পাকিস্তানের জাতীয় সম্পদ লুটে নেবে দেশটির নব্য-ধনী (neo-rich) শ্রেণী।তরুণ সমাজের কাছে ইসলামের নৈতিক আপিল বা আবেদন ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং এর পরিবর্তে ইসলাম একটি ধর্মান্ধ আদর্শে রূপ নেবে। আমি এখানে যোগ করতে পারি যে, ১৯৪৬ সালে যখন প্রো-মুসলিম লীগ ‘মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন’-এর নেতা সৈয়দ আহমেদ সাঈদ কিরমানি মওলানা আজাদের সাথে দেখা করেছিলেন, তখন আজাদ তাকে বলেছিলেন, “পাকিস্তানে ‘মুসলমান’ থাকবে, কিন্তু কোনো ইসলাম থাকবে না।” আমি আমার ‘দ্য পাঞ্জাব ব্লাডীড, পার্টিশন্ড অ্যান্ড ক্লিনজড’ বইটিতে এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছি।
আজাদ এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণটি করেছিলেন: “আমাদের মনে রাখতে হবে, ঘৃণার গর্ভে জন্ম নেওয়া কোনো সত্ত্বা কেবল ততদিনই টিকে থাকে, যতদিন সেই ঘৃণা বেঁচে থাকে।”
একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের (confessional ideology) ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র কী ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে মাদানি এবং আজাদ দুজনেই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বা ত্রিকালজ্ঞ প্রমাণিত হয়েছিলেন। আজাদ মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলমানদের মধ্যে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলোর কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং ভারতে ইসলামের ইতিহাসও মাযহাবী উত্তেজনা ও সংঘাতে পরিপূর্ণ ছিল।
তা সত্ত্বেও, স্যার সৈয়দের অনুসারীরা পাকিস্তানের পক্ষে এই লড়াইয়ে জিতে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বৃটিশদের কারনে।।
