ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন
শ্রীভূমি সিলেট এখন শহর থেকে নগর হয়েছে। সুরমার পাড়ের সেই পুরোনো শহর আজ আর আগের মতো নেই। থাকার কথাও নয়। শহর বড় হবে, দালান উঠবে, রাস্তা বদলাবে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক।
তবু পুরোনো সিলেট একেবারে হারিয়ে যায়নি। শহরের কোনো পুরোনো ভবনের সামনে দাঁড়ালে, কোনো পুরোনো রাজপথ ধরে হাঁটলে, কিংবা খুব ভোরে অথবা গভীর রাতে শহরে বের হলে হঠাৎ তাকে দেখা যায়। উঁচু উঁচু দালানের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই পুরোনো শহরটা তখন একটু মাথা তোলে। মনে হয়, এই তো আমার চেনা সিলেট।
এবার সিলেটে ছিলাম এক সপ্তাহেরও কম সময়। এই অল্প সময়ে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আবার দেখা হয়নি আরও অনেকের সঙ্গে—আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, পুরোনো পরিচিতজন। দেখা না হওয়ারও কারণ আছে। আর সেই কারণগুলোর মধ্যে কিছু এতটাই সিলেটি যে, তা নিয়ে একটু না হাসলে অন্যায় হবে।
সিলেটে কাউকে দেখতে গেলে প্রথমেই আপনাকে সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। সকাল দশটার আগে সিলেট শহর মোটামুটি ঘুমের রাজ্যে থাকে। কাজের বিশেষ তাড়া না থাকলে অনেকেরই সকাল শুরু হয় বেশ আরাম করে। আপনি সাতটায় ফোন করবেন—ফোন বাজবে। আটটায় করবেন—আবার বাজবে। নয়টায় করবেন—এবার হয়তো ফোন ধরবেন, কিন্তু ওপাশ থেকে এমন একটা কণ্ঠ শুনবেন, যেন আপনি তাকে ঘুম থেকে তুলে কোনো জাতীয় দায়িত্ব দিয়ে ফেলেছেন।
সিলেটের সকালটা তাই অন্যরকম। এখানে সকাল মানে অনেকের কাছে সকাল নয়, সকালের পরের অংশ।
তারপর যখন মানুষ ঘুম থেকে ওঠেন, তখন নামাজের সময় এসে যায়। শুক্রবার হলে তো কথাই নেই। নামাজ, দেখা-সাক্ষাৎ, দুপুরের খাবার—সব মিলিয়ে দুপুর বেশ সম্মানের সঙ্গে হাজির হয়। দুপুরের খাবারের পর আবার একটু বিশ্রাম। দিবানিদ্রা সিলেটি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বলেই মনে হলো। এই সময়ে কারও দরজায় কড়া নাড়া সামাজিকভাবে খুব একটা উৎসাহিত করা হয় না।
আপনি যদি কোনোভাবে ঠিক করেও ফেলেন যে, দুপুরের ঘুম শেষ হওয়ার পর যাবেন, ততক্ষণে আসরের সময়।
আসর শেষ হতে না হতেই মাগরিব। মাগরিবের পর এশা।
তারপর?
তারপর রাত। অর্থাৎ একজন মানুষকে দেখতে চাইলে সিলেটে আপনার হাতে সময় আছে—কিন্তু সেই সময়টা খুঁজে বের করাটাই বড় কাজ।
ধর্মকর্ম নিয়ে অনেকের এই প্রশান্ত জীবন অবশ্য আমার ভালোই লেগেছে। পৃথিবীর নানা ব্যস্ততার মধ্যে মানুষ যদি নামাজ, পরিবার, আত্মীয়তা আর নিজের ঘরের শান্তিতে কিছুটা সময় কাটাতে পারে, তাতে আপত্তির কী আছে? সমস্যা শুধু আমার মতো অতিথিদের।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কারও বাসায় পৌঁছানোর পর দেখবেন, আপনি বসার আগেই বাড়ির মানুষ রান্নাঘরের দিকে দৌড় দিয়েছেন।
— কী খাবেন?
আপনি যতই বলেন, “কিছুই খাব না”, ততই বিপদ।
আপনার ‘কিছুই খাব না’ কথাটিকে তাঁরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করবেন না।
চা খাবেন না?
কফি?
ফল?
মিষ্টি?
একটু ভাত?
না, ভাত না হলে অন্তত কিছু একটা?
আপনি যত বেশি না করবেন, আতিথেয়তার আয়োজন তত বাড়বে। সিলেটের আতিথেয়তা তাই শুধু খাবার নয়, এক ধরনের সামাজিক পরীক্ষা। আপনি অতিথি হয়ে গিয়ে নিজের ক্ষুধার ওপরও নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন।
তবে এবার সিলেটে আমার আরেকটি বড় সমস্যা হয়েছে—মানুষের সঙ্গে দেখা করার জন্য মানুষকে ঘর থেকে বের করানো। অনেকেই বাইরে আসতে চান না। কারণও আছে।
শহরের ট্রাফিক। রাস্তায় হাঁটার জায়গা নেই। কোথাও ফুটপাত থাকলেও সেটি পথচারীর জন্য কতটা আর হকারের জন্য কতটা—তা নিয়ে নতুন করে গবেষণা করার প্রয়োজন আছে।
ফুটপাত আমাদের শ্রমজীবী মানুষের দখলে। এ কথা বলে তাঁদের দোষ দেওয়ারও সুযোগ নেই। তাঁদের জীবিকার জায়গা কোথায়? শহর কি তাঁদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করেছে?
ফুটপাত থেকে হকার উঠে গেলে তাঁরা যাবেন কোথায়? কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থাকে—পথচারী যাবেন কোথায়?
এই দুই প্রশ্নের মাঝখানেই আটকে আছে সিলেটের নাগরিক জীবন।
এখন শুধু ফুটপাত নয়, হকারি বাণিজ্যও অনেক জায়গায় সড়কের দিকে নেমে এসেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বন্দরবাজার, হাসান মার্কেটসহ ব্যস্ত এলাকাগুলোতে হাঁটাচলা অনেক সময় প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
আপনি যদি একটু ধীরে হাঁটতে চান, শহর আপনাকে হাঁটতে দেবে না। আপনি যদি গাড়িতে যেতে চান, শহর আপনাকে যেতে দেবে না। আপনি যদি কোথাও বসে একটু আড্ডা দিতে চান, শহর আপনাকে বসার জায়গাও খুব একটা দেবে না। সিলেট তখন আপনাকে একটাই পরামর্শ দেয়— বাড়িতে থাকুন।
সরকার বদলায়। নতুন সরকার আসে। প্রশাসক আসেন। নতুন পরিকল্পনা হয়। সভা হয়। উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু শহরের নাগরিক সৌন্দর্য যেন কোথাও গিয়ে দাঁড়াতে পারছে না।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি পীড়া দিয়েছে।
সিলেটের মতো একটি ঐতিহাসিক শহরের মানুষের নির্মল আনন্দে হাঁটার জায়গা থাকবে না—এটা কেমন কথা?
নাগরিক আড্ডার জায়গা নেই।
পরিবার নিয়ে বসার মতো পর্যাপ্ত পার্ক নেই।
শিশুদের জন্য উন্মুক্ত বিনোদনের জায়গা কম।
বয়স্ক মানুষ হাঁটবেন কোথায়?
তরুণরা বসবে কোথায়?
মানুষ শুধু রেস্টুরেন্টে যাবে কেন?
শহর কি শুধু খাওয়া আর কেনাকাটার জন্য?
এখন অবশ্য রেস্টুরেন্টের কোনো অভাব নেই। বরং রেস্টুরেন্টের এত বিস্তার দেখে মনে হয়, সিলেটবাসী হয়তো শহরের সব সমস্যার সমাধান খাবারের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন। এখানে নতুন নতুন খাবারের দোকান উঠছে। কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাগরিক অবকাঠামো বাড়ছে না।
একটি শহরের সৌন্দর্য শুধু দালানের উচ্চতায় নয়। শহরের সৌন্দর্য ফুটপাতে। শহরের সৌন্দর্য গাছের ছায়ায়।
শহরের সৌন্দর্য একটি পরিচ্ছন্ন পার্কে। শহরের সৌন্দর্য নদীর পাড়ে বসে থাকা মানুষের মধ্যে। শহরের সৌন্দর্য হলো—একজন বৃদ্ধ মানুষ যেন বিকেলে নিশ্চিন্তে হাঁটতে পারেন, একজন মা যেন সন্তানকে নিয়ে একটু বসতে পারেন, কয়েকজন বন্ধু যেন কোনো দোকানে না গিয়ে গাছের নিচে বসে গল্প করতে পারেন। এই সহজ আনন্দগুলোও নাগরিক জীবনের অংশ।
সিলেট সিটির সরকার-নিযুক্ত প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁর ব্যস্ততা ও চেষ্টা চোখে পড়ার মতো। সীমিত ক্ষমতা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি দিন-রাত কাজ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একজন প্রশাসক একা একটি শহরকে বদলে দিতে পারেন না।
একটি শহর শুধু প্রশাসনের হাতে তৈরি হয় না। শহর তৈরি করে প্রশাসন, ব্যবসায়ী, হকার, নাগরিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম—সবাই মিলে। আর সবচেয়ে বেশি তৈরি করে নাগরিকের আচরণ। আমরা নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখি। কিন্তু বাড়ির দরজার বাইরে ময়লা ফেলতে দ্বিধা করি না। দোকানের ভেতর ঝকঝকে রাখি। দোকানের সামনে আবর্জনা রেখে দিই। নিজের গাড়ি নিরাপদে রাখতে চাই। কিন্তু ফুটপাত দখল করে অন্যের হাঁটার পথ বন্ধ করে দিই। তারপর শহর নোংরা কেন—এই প্রশ্ন করি।
শহর আসলে আমাদেরই আয়না। সিলেটকে আমি এবার একটু অন্য চোখে দেখেছি। শুধু জন্মভূমির আবেগ নিয়ে নয়, একজন নাগরিকের চোখেও। পুরোনো সিলেটকে খুঁজেছি। পেয়েছি কোথাও কোনো পুরোনো ভবনের ছায়ায়, কোনো ভোরের রাস্তায়, সুরমার বাতাসে, পরিচিত মানুষের কণ্ঠে। নতুন সিলেটকেও দেখেছি—উঁচু দালান, ব্যস্ত রাস্তা, রেস্টুরেন্ট, দোকান, যানজট, ফুটপাতের দখল আর নাগরিক অস্থিরতার মধ্যে।
দুটো সিলেট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একটি আমাদের স্মৃতির। অন্যটি আমাদের বাস্তবতার। শহর বড় হবে, দালান উঠবে—এটা থামানো যাবে না, থামানো উচিতও নয়।
উন্নয়ন মানে শুধু ওপরের দিকে ওঠা নয়। কখনো কখনো উন্নয়ন মানে একটু জায়গা ছেড়ে দেওয়া—মানুষের হাঁটার জন্য, গাছের জন্য, শিশুদের খেলার জন্য, বৃদ্ধের বসার জন্য, নদীর বাতাসের জন্য। আর সবচেয়ে বেশি—মানুষের জন্য।
সিলেট আমার শহর। এই শহরকে শুধু সুন্দর দেখতে চাই বলে নয়, ভালোবাসি বলেই তার অসুন্দর দিকগুলো চোখে পড়ে। যে শহরকে আমরা ভালোবাসি, তার প্রশংসা করা সহজ। তার ভুলগুলো নিয়ে কথা বলা একটু কঠিন। কিন্তু হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসা সেখানেই—যখন নিজের শহরকে শুধু স্মৃতিতে সুন্দর দেখতে চাই না, ভবিষ্যতেও সুন্দর দেখতে চাই।
সুরমার পাড়ের সেই পুরোনো সিলেট হয়তো আর ফিরে আসবে না। ফিরে আসার দরকারও নেই। আমাদের কাজ বরং এমন একটি নতুন সিলেট তৈরি করা, যেখানে পুরোনোর মায়া থাকবে, নতুনের গতি থাকবে—আর সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ থাকবে মানুষের মতো করে বাঁচার একটু জায়গা নিয়ে।
হয়তো সেদিন খুব ভোরে শহরের পথে হাঁটতে বের হয়ে দেখব—উঁচু দালানের নিচে চাপা পড়ে থাকা পুরোনো সিলেটটি আর লুকিয়ে নেই। সে নতুন সিলেটের হাত ধরে পাশাপাশি হাঁটছে।
