বরিশালে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে মারধর করে রাতে খুঁটিতে বেঁধে রাখার পর সকালে তৈরি হলো এক আবেগঘন মুহূর্ত। খবর পেয়ে ছুটে আসে তাঁর ছোট্ট মেয়ে। ভিড়ের মধ্যেই এক কাপ চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে সে। বাবা-মেয়ের এমন একটি দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার একটি বাজারের। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে বাজারের একটি মুদিদোকানে চুরি করতে গিয়ে জনতার হাতে আটক হন ওই ব্যক্তি। পরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁকে মারধর করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখেন।
খবর পেয়ে আজ শনিবার সকাল আটটার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে ওই ব্যক্তির ৯ বছর বয়সী মেয়ে। বাবাকে আর মারধর না করার জন্য সে উপস্থিত লোকজনের কাছে আকুতি জানায়।
আজ সকালে বাজারে এসে আমরা এ ঘটনা দেখতে পাই। শিশুটি বাবার পাশে বসে কাঁদছিল। চায়ের কাপে রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছিল। বিষয়টি সবার মনে দাগ কাটে। পরে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের কাজ আর করবেন না। এরপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
মিরাজ হোসেন ফরাজী, স্থানীয় বাসিন্দা
এ ঘটনার একটি ভিডিও আজ সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একটি খুঁটির সঙ্গে ওই ব্যক্তির পা বেঁধে রাখা হয়েছে। তাঁর হাতে একটি চায়ের কাপ। মেয়েটি পাউরুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে চায়ে ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন বিভিন্ন কথা বলছেন। বাবার মুখে রুটি তুলে দিতে দিতে মেয়েটি অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল লোকজনের দিকে।
বামরাইল এলাকার বাসিন্দা মিরাজ হোসেন ফরাজী বলেন, ‘আজ সকালে বাজারে এসে আমরা এ ঘটনা দেখতে পাই। শিশুটি বাবার পাশে বসে কাঁদছিল। চায়ের কাপে রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিচ্ছিল। বিষয়টি সবার মনে দাগ কাটে। পরে ওই ব্যক্তির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়, ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের কাজ আর করবেন না। এরপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।’
ছাড়া পাওয়ার পর ওই ব্যক্তির মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না তাঁর পরিবারের কেউ। পরে আজ বিকেলে স্থানীয় এক ব্যক্তির মুঠোফোনের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। অভিযুক্ত ব্যক্তি বলেন, এ ঘটনার জন্য তিনি লজ্জিত। তাঁর দুই সন্তানের দিকে তাকিয়ে সামনের দিনগুলোতে নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করবেন।
উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম আজ দুপুরে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও দেখে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নেন। এ ঘটনায় কেউ থানায় অভিযোগ করেননি।
শৈশবে হরলাল রায় এর একটি বাংলা রচনা পড়েছিলাম। ” একটি চোরের আত্মকাহিনী”
বিষয়বস্তু ছিল কোথাও একজন চোর ধরা পড়েছে জনতার হাতে। জনতা তাকে ব্যাপক মারপিট করছে। উৎসুক মানুষ চারিপাশ ঘিরে আছে। উৎসুক দের মধ্যে একজন পিতার সাথে একটি শিশুও ছিল। সব দেখেশুনে শিশুটি কৌতুহলী হয়ে চোর দেখতে চাইল। পিতা ভির ঠেলে মেয়েকে চোর দেখালেন। মেয়েটি চোর দেখে বলে উঠল, ” চোর কোথায়, এ তো মানুষ”।
সেই রচনার শেষে চোরের অনুভূতি ছিল, জনতার মারপিটে তার চোখে অশ্রু না এলেও শিশুটির ঐ কথা শুনে তার চোখ জলে ভরে যায়।
ছবিতে ঘটনাটি একটু ভিন্ন ধরনের। এখানে চোরটির মেয়ে তার পিতার যত্ন করছে। দুটি ঘটনা কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির হলেও এর আবেদন কিন্তু প্রায় একই ধরনের। দুঃখজনক হলেও সত্য যে চাকরিজীবনে এমন অমানবিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি।
সামন্য ছিচকে চোর পেলে এখন মানুষ তার জীবন পর্যন্ত কেড়ে নিতে নিতেও অনেক সময় দ্বিধা বোধ করে না। অথচ কেউ ভাবতে চায় না যে সেও একজন মানুষ, তারও হয়তোবা এমন সন্তান-পরিবার আছে। আমরা এই মানুষই আবার সমাজের বড় চোরকে সর্বদা কুর্নিশ করে চলি।
বর্তমান সময়ের একজন বিখ্যাত পাঠকের কবিতা শুনেছি, যদিও তার নাম মনে নেই।
” মানুষ যখন মানুষ হয়, তখন সে আর মানুষ থাকে না”!!
