আফজাল হোসেন
আমরা যখন স্কুলে পড়ি তখন পাড়ার ফাংশানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ হতে দেখেছি। কি কারণে পক্ষ বিপক্ষ, তা বুঝতে চাওয়ার ইচ্ছা তখন হয়নি।
বড়দের ভাবনা, বিবাদ ছোটবেলায় মাথায় নিতে চাওয়ার কথা নয়। মার্বেল খেলা , ক্যরাম খেলা ভালো নয় বলে মনে করতেন বড়রা। কেনো ভালো নয়, কখনো কেউ বোঝায়নি আমরাও মাথা খাটিয়ে বোঝার চেষ্টা করিনি।
আমাদের মাথা তখন অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত। সাইকেল চালানো, ঘুড়ি ওড়ানো, বিলে নৌকা বাইতে যাওয়া, জঙ্গল গিয়ে শিয়াল তাড়িয়ে বেড়ানো, শালিক পাখির বাচ্চা খোঁজা, কোন উঁচু গাছে চালাক বকেরা বাসা বাঁধে, সেখানে ডিম বা বাচ্চা মিলবে কি না- ইত্যাদি নানা কিছু মাথার মধ্যে গিজগিজ করতো।
সে বয়সে পড়াশোনায় তেমন মন ছিল না। খুব ভালোবাসতাম ছবি আঁকতে। তা দোষের বলেনি কেউ কিন্তু অংক কষার খাতায়, দেয়ালে ইত্যাদি বেজায়গায় ছবি আঁকার কারণে প্রায়ই বকা খেতে হতো।
হাঁটবারে হাঁটের মাঝখানে জায়গা ফাঁকা করে দিয়ে মানুষজন গোল হয়ে দাঁড়াতো, খোকা এট্টা ছবি এঁইকে দেখাও তো। একটা লম্বা পাটখড়ি বাড়িয়ে দিয়েছে কেউ, নেও এইটা দে আঁকো।
মাটিতে মাত্র তিন চারটে দাগ কেটে এঁকে ফেলতে পারতাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। হাত তালি পড়েছে দর্শকদের। ভীড়ের মধ্য থেকে কেউ তখন বলেছে, চুল দাঁড়ি আছে তাই রবীন্দ্রনাথ আঁকা সহজ, তুমি কবি নজরুলরে এঁইকে দেখাও তো।
দেখাতাম এঁকে।
মাও সে তুঙ, লেনিন, সুকান্ত ভট্টাচার্য, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র, কায়েদ এ আজম, মহাত্মা গান্ধী, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, হিটলার এইরকম বহু বিখ্যাত মানুষের ছবি খুব সহজেই এঁকে ফেলতে পারতাম তখন। এতগুলো নামকরা মানুষকে সেই হ্যারিকেন জ্বলা গ্রামের মানুষেরা চিনতেন তখন। শুধু চেহারায় চেনা নয়, কে কি কারণে পৃথিবী বিখ্যাত, অল্পবিস্তর জানতেন সবাই।
পাড়ার খালা, চাচি, পিসিরা সাদা কাপড়ের টুকরা নিয়ে আসতেন, নজরুল বা রবীন্দ্রনাথের ছবি এঁকে তার নিচে তাঁদের রচিত বিখ্যাত, মূল্যবান কথা লিখে দেও।
এঁকে লিখে দিতাম “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেনো তারে তৃণসম দহে”। অনেকেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বাণী, উদ্ধৃতি অনুরোধ করে লিখিয়ে নিতেন “ হৃদয় প্রেমের অতিথিশালা নহে, হৃদয় প্রেমের জন্মভূমি”
যারা নজরুল চেয়েছেন, বিদ্রোহী কবির ছবি এঁকে লিখে দিয়েছি তাঁর কোনো বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি ছত্র। যেমন “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”
এসব যারা আঁকিয়ে ও লিখিয়ে নিয়েছেন তাঁরা অতি উৎসাহে, আনন্দে ও আবেগে রঙিন সুতা দিয়ে সূচিকর্ম করতেন। তারপর সেগুলো শোভা বৃদ্ধির জন্য ফ্রেমে বাঁধিয়ে ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো।
তা শুধু অসহায় সৌন্দর্য হয়ে ঝুলে থাকা বস্তু ছিল না, একজন মানুষের সেলাই কর্মের দক্ষতা পুরো পরিবারের শিক্ষা, রুচি ও আভিজাত্যের রকমকে প্রকাশ করে, করতে পারে, এমন বিশ্বাস, ধারণা ছিল।
বাড়িতে অতিথি এলে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা সুচিকর্ম, বালিশের ওয়াড়, টেবিল ক্লথ, দস্তরখান ইত্যাদিতে করে রাখা হাতের কাজ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ আলোচনা হতো।
কি হতো তখন, এ গল্প এখন করা কেনো? বয়স হয়েছে। যাদের বয়স বেশি হয়ে যায়, তারা নাকি স্মৃতিচারণ করা পছন্দ করে। অন্যকে সামনে বসিয়ে পুরানো দিনের কথা, কাহিনী বলে নাকি সুখ মেলে, আরাম লাগে। এ কথা সত্য, মিথ্যা কিংবা মনগড়া কি না, তা নিয়ে তর্ক থাক।
অস্থির বর্তমান মাঝেমাঝে গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে আসে। অস্বস্তি, অশান্তি হয়। সে যাতনা থেকে রেহাই পেতে ফেলে আসা কালের গায়ে লেগে থাকা মনি মানিক্যের আলো তুলে আনি। ভাবি, তাতে বর্তমানের দুঃখ খানিকটা হাল্কা হয়ে যাবে। হয় না।
দুঃখ বাড়ে, হতাশা বাড়ে। মনে তুলনা চলে আসে। সেকাল ভালো ছিল, না একাল? যে কাল ফেলে এসেছি, তার চেয়ে বর্তমান অনেক বেশি আলো ঝলমলে হওয়ার কথা। হয়েছে তার দু চারটে উদাহরণ মনের সামনে এসে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় না।
